ডায়েরি ও বইয়ের পাতার ভেতর কেটে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল সোনার বার। একইভাবে সাবানের ভেতর সোনার রিং পাওয়া গেছে। কফির মিনি প্যাকেটের মধ্যেও মিশে ছিল দানাদার সোনা। এ ছাড়া ব্যাটারি, পানির ট্যাব, ছাতা এবং দরজার কবজার মতো দৈনন্দিন জিনিসের ভেতরেও লুকানোর কায়দা দেখা গেছে—এ ধরনের নানা পদ্ধতিতে দেশে আনা সোনা উদ্ধারকেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তুলে ধরেছে।
বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন রুটে অতীতে নানা কৌশলে দেশে অবৈধভাবে সোনা আনার ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। এনবিআরের রাজস্ব সম্মেলনে আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে স্থাপিত অস্থায়ী জাদুঘরে সোনা উদ্ধারের এসব অভিনব পদ্ধতি প্রদর্শন করা হয়। রাজস্ব সম্মেলনের প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অস্থায়ী জাদুঘর ঘুরে দেখেন।
জাদুঘরে বর্তমানে সময়ের উদ্ধারকৃত কিছু নমুনার পাশাপাশি স্থলবন্দর দিয়ে উদ্ধার হওয়া দুর্লভ কিছু মূর্তিও রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০০৯ সালে হিলি কাস্টমসের উদ্ধার করা কষ্টিপাথরের বিষ্ণুমূর্তি ও পিতলের কালীমূর্তি।
শুধু সাম্প্রতিক সময়ের চোরাচালানেই নয়, দূর অতীতে ব্যবহৃত কৌশলও জাদুঘরে স্থান পেয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, ১৯৬৭ সালে অক্সফোর্ড ব্র্যান্ডের উঁচু জুতার ভেতর দিয়ে করে চোরাই পণ্য আনা হতো। আবার ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম কাস্টমস আটক করেছিল বিশাল আকারের রেডিও; অর্থাৎ তখনকার সময়েও চোরাচালানের মাধ্যমে প্রযুক্তিপণ্য আনার ঘটনা ছিল।
এনবিআরের এই জাদুঘরে ঐতিহাসিক দলিলের অনুলিপিও প্রদর্শিত হয়। সেখানে ১৬০১ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে রানি এলিজাবেথের দেওয়া বাণিজ্য অনুমোদনের উল্লেখ রয়েছে। ভারতে ব্যবসা করার জন্য ৪০০ বছর আগে দেওয়া সেই অনুমতিপত্র সংরক্ষিত রয়েছে বলেও জানানো হয়।
এ ছাড়া ১৬১৫ সালে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর ইংরেজদের ভারতে ব্যবসা করতে যে অনুমতিপত্র দিয়েছিলেন, সেটির অনুলিপিও সেখানে রাখা আছে। ১৯৫৫ সালে চট্টগ্রামে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকে দেওয়া সনদের কথাও জাদুঘরে উল্লেখ করা হয়।
রাজস্ব সম্মেলনে আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট এবং শুল্ক—প্রতিটি বিভাগের আলাদা স্টল ছিল। সেখানে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো তাদের কার্যক্রম তুলে ধরে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্টল ঘুরে এসব বিভাগের কার্যক্রমের খোঁজখবর নেন।
রাজস্ব কর্মকর্তারা বলছেন, এই জাদুঘরের মাধ্যমে এনবিআরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়েছে।
রাজস্ব সম্মেলনে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব বলেন, গত পাঁচ দশকে দেশের রাজস্ব প্রায় আড়াই হাজার গুণ বেড়েছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে ১২ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আগের অর্থবছরে এ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির মন্থরতা কাটিয়ে এটি রাজস্ব আহরণে একটি সুস্পষ্ট পুনরুদ্ধার।
সম্মেলন আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক ও এনবিআরের সদস্য সৈয়দ মুসফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত যেমন কম, তেমনি কর আদায়ে বিনিয়োগের পরিমাণও আঞ্চলিক দেশগুলোর তুলনায় কম। প্রতি ১০০ টাকার রাজস্ব আদায়ে এনবিআর মাত্র ২১ পয়সা খরচ করে। রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রম উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যয়কে তিনি ‘ভালো বিনিয়োগ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে জাদুঘর ও স্টল বিকেল পর্যন্ত সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত ছিল।