বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বৈধতা, বিদেশে কর্মীর চাহিদাসহ বিভিন্ন তথ্য ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা আনা হবে। অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়া ঠেকাতে শুধুই সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; এ ক্ষেত্রে সমাজের প্রতিটি স্তরকে যুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।
‘নিরাপদ অভিবাসন ও বিদেশফেরতদের পুনঃএকত্রীকরণ: বাস্তবতা ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন আরিফুল হক চৌধুরী। আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মুক্তকণ্ঠ কার্যালয়ে এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। গোলটেবিল বৈঠকের যৌথ আয়োজক ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও মুক্তকণ্ঠ।
আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘অবৈধ পথে বিদেশ লোক পাঠানোর সঙ্গে জড়িত চক্র মানুষের জীবন নিয়ে চিন্তা না করে নিজ স্বার্থে কাজ করছে। এই চক্রের রুট চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ চলছে।’ তিনি আরও জানান, সুনামগঞ্জ–হবিগঞ্জ থেকে শুরু করে মাদারীপুরসহ কয়েকটি জেলায় আগামী এক মাস ব্যাপক প্রচার চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার ক্ষতি সম্পর্কে মানুষকে বোঝানোর ওপর গুরুত্ব দেন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী। তিনি বলেন, অনেকে জমিজমাসহ সম্পদ বিক্রি করে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে বিদেশে গিয়ে বিপদে পড়লে পরিবার-পরিজন নিঃস্ব হয়ে পড়ে এবং মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। এ কারণে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি মসজিদ, মন্দির ও গির্জাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রচার চালানোর কথা বলেন তিনি।
বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বিদেশে দক্ষ কর্মী পাঠানোর ওপরও জোর দেন আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, বিদেশি নিয়োগকর্তারা যে ধরনের কর্মীর চাহিদা দেন, অনেক ক্ষেত্রে সেই দক্ষতার কর্মী পাঠানো হয় না। প্লাম্বার বা ইলেকট্রিশিয়ানের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কাজ না জানা ব্যক্তিকে পাঠানোর ঘটনা ঘটায় কর্মী ও নিয়োগকর্তা উভয়ই সমস্যায় পড়েন।
সমস্যার সমাধানে নতুন পদ্ধতির কথা জানান প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী। তিনি বলেন, কোনো দেশ নির্দিষ্ট দক্ষতার কর্মী চাইলে সেই দেশের নিয়োগকর্তার প্রতিনিধি বা প্রশিক্ষক বাংলাদেশে এসে প্রশিক্ষণ যাচাই করবেন এবং প্রশিক্ষণে সন্তুষ্ট হওয়ার পর কর্মী নিয়োগ করবেন। বাংলাদেশ থেকে ছয় হাজার চালক সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেওয়ার ক্ষেত্রে এমন পদ্ধতি চালু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের সুযোগ কমবে।
দূতাবাসের সেবা সহজ করার প্রসঙ্গে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, প্রবাসীদের বিভিন্ন সরকারি সেবা নিতে দূরদূরান্ত থেকে দূতাবাস বা কনস্যুলেটে যেতে হয়, ফলে সময় ও অর্থ দুটিই ব্যয় হয়। সরকারি সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কিছু সেবা দেওয়ার বিষয়টি তারা বিবেচনা করছেন বলেও জানান তিনি। পাসপোর্টসহ বিভিন্ন নথি ডাক বা কুরিয়ার সেবার মাধ্যমে প্রবাসীদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা নিয়ে চিন্তাভাবনাও চলছে বলে জানান মন্ত্রী।
প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর সরকারি পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই কার্ড চালুর বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। এতে ভূমি, সাবরেজিস্ট্রি অফিসসহ বিভিন্ন সরকারি সেবায় প্রবাসীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে পারে। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। এ বিষয়ে দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।
প্রবাসীদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য ঋণের সীমা বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও জানান আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে এই ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
দক্ষ কর্মী তৈরিতে দেশের ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী। তাঁর মতে, শুধু ভবন থাকলেই হবে না; দক্ষ প্রশিক্ষক ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।
কিছু দেশের অর্থায়ন ও প্রশিক্ষক সহায়তা নেওয়ার উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। কাতার বাংলাদেশের কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে প্রশিক্ষক ও অর্থায়ন দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, আরবি ভাষায় অনেকটা এগিয়ে থাকা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অল্প সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের উপযোগী করে তোলা সম্ভব। তাঁর নির্বাচনী এলাকার তিনটি মাদ্রাসায় এমন উদ্যোগ নিয়ে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।
বিদেশে দক্ষ জনবল পাঠাতে দেশের বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করা, নতুন নতুন শ্রমবাজার খোঁজা, বিদেশফেরতদের পেশায় ফেরাতে সহায়তা, বিদেশে মারা যাওয়া প্রবাসীদের মরদেহ দেশে আনার পাশাপাশি পরিবারকে সহায়তার কথাও তুলে ধরেন আরিফুল হক চৌধুরী।
প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয় মাসে প্রবাসীদের জন্য অনেকগুলো কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, যার সব প্রচার পায়নি। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার সামনে রেখেই প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচিগুলো এগিয়ে নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা এবং বিদেশফেরত প্রবাসীদের পুনঃএকত্রীকরণ—দুই ক্ষেত্রেই সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, গণমাধ্যম ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
মুক্তকণ্ঠের সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরীর সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে নিবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল ইসলাম হাসান।