যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর প্রবাসী বন্ধু আমজাদ বারবারই বলেন, তিনি আমাকে কোনো একটি পাহাড়ে নিয়ে যাবেন। নাম জানতে চাইলে তাঁর কথা ছিল—সেটা পাহাড়ের মতো রহস্যময় থাক। কিছু জায়গা শুধু পরিচিত নামেই ধরা দেয় না। সেখানে যেতে হয়, বাতাসের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, আকাশের নিচে কিছুক্ষণ নীরব থাকতে হয়—তারপর অনুভব করতে হয়।
আমি ঠাট্টা করে বলেছিলাম, দার্শনিকতা ছাড়েন। এ রকম কত পাহাড়ের চূড়ায় উঠে চোখের সামনে সবুজের ঢেউ দেখে নীরব থেকেছি বহুবার। বান্দরবানের নীলাচল, চিম্বুক, কেওক্রাডং, তাজিংডং, খাগড়াছড়ির আলুটিলা, সাজেকের কংলাক—আর ভারতের মেঘালয়ের দিকে যেতে যেতে মেঘের স্তূপের বহু ওপরে উঠে গেছি। দার্জিলিংয়ের টাইগার হিল থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার ওপর সূর্যের মুক্তকণ্ঠ পড়ার দৃশ্যও দেখেছি। দেখেছি বরফঢাকা পর্বতশৃঙ্গের রং কীভাবে ধীরে ধীরে বদলে যায়। তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়—পাহাড় আর কত দেখব?
আমার কথার আপত্তি জানিয়ে আমজাদ বলেন, ‘প্রতিটি পাহাড়ের আলাদা আলাদা বিস্ময় আছে। পাহাড় যদি সব এক হতো, তাহলে আপনি এত পাহাড় কেন ঘুরলেন?’
নিজের কথায় নিজেই থেমে গেলাম। সব পাহাড় আপাতদৃষ্টিতে হয়তো একই রকম; তবু কোথাও না কোথাও প্রত্যেকটি পাহাড় তার নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।
আমজাদের সঙ্গে কথা শেষ পর্যন্ত মেলেনি। তাঁর সঙ্গে পাহাড়ে যাওয়া হলো না।
তবে ৭ আগস্ট অফিস থেকে কন্যা অনন্যা বাসায় ফিরে বলে, ‘বাবা, পাহাড়ে বেড়াতে যাব। এখান থেকে গাড়িতে দুই ঘণ্টার পথ, অ্যাশভিল। তুমি মুগ্ধ হবেই, অনেক কবিতা লিখতে পারবে। ওখানে দুটো দিন থাকব, ঘুরব, বেড়াব।’
সারা সপ্তাহ অফিস করে ছুটির দুটো দিন আমাকে বেড়াতে নিতে চাইছিল মেয়েটি। আমি ফোন করি আমজাদকে। বলি, আমরা অ্যাশভিল যাচ্ছি। আপনি কোথায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন?
ফোনের ওপার থেকে তিনি উচ্চ স্বরে হাসতে হাসতে জবাব দেন, ‘আমিও অ্যাশভিলে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। ওখানে আমি গিয়েছিলাম। ব্লু রিজ পর্বতমালার স্মৃতিটাকে ঝালিয়ে নিতে আপনার সঙ্গে আবার যেতে চেয়েছিলাম।’
ফোন রাখার আগে আমজাদ বলে দেন, যেতে যেতে গাড়িতে যেন জন ডেনভারের বিখ্যাত গান ‘টেক মি হোম, কান্ট্রি রোডস’ শোনা হয়।
৮ আগস্ট দুপুরে খাবার খেয়ে আমরা বেরিয়ে পড়ি অ্যাশভিলের দিকে। উত্তর ক্যারোলিনার শহরটি আগে শোনা থাকলেও কখনো যাওয়া হয়নি। অনন্যারা যেখানে থাকেন, সেই বেলমন্ট নিজেই পাহাড় আর হ্রদের জায়গা। বেলমন্ট থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা পাহাড়ি পথে দুপাশের নিবিড় বনের গাছপালাগুলোকে পেছনে ফেলে যখন অ্যাশভিল শহরে পৌঁছালাম, তখন বেলা প্রায় তিনটা।
ক্রমশ ওপরের দিকে উঠতে উঠতে আমরা পৌঁছালাম ২ হাজার ৯১৫ ফুট উচ্চতার ওয়ালনাট কোভ ওভারলুকে। তখন বেলা চারটা। নর্থ ক্যারোলিনার জন্য এটা বিকেল নয়, মধ্যাহ্নের মতো। কারণ, সন্ধ্যা হতে হতে আরও কমপক্ষে সাড়ে চার ঘণ্টা বাকি। কিন্তু চারপাশ অন্ধকার। অনন্যার বর শুভ সেখানে গাড়ি থামিয়ে বলল, বাবা, আমরা এখন মেঘের ভেতর।
অ্যাশভিলের বিল্টমোর এলাকার হ্যাম্পটন ইন বাই হিলটনে আমাদের আগে থেকেই বুকিং করা ছিল। অভ্যর্থনা ডেস্কে অনন্যা অনুরোধ করল, এমন একটি রুম দিতে যেখানে পাহাড় দেখা যায়। ছয়তলায় গিয়ে রুমে ঢুকতেই বোঝা গেল, অ্যাশভিল কেন সারা পৃথিবীর পর্যটকদের কাছে এত জনপ্রিয়। বড় জানালার পর্দা সরাতেই মনে হলো, আমরা আসলে সমতল থেকে কত ওপরে। বাইরে মেঘ ভাসছে। কাচের জানালা ভেদ করে মেঘগুলো রুমে ঢোকার চেষ্টা করছে—যেন একটু কাছে আসতে চায়। দূরে প্রশস্ত মহাসড়ক; তারপর নিবিড় গাছপালা; তার পর পাহাড়—আর আরও পাহাড়। শেষে থাকে শুধু মেঘ, মেঘ।
অজান্তেই উচ্চারণ করি বোদলেয়ারের সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তি—আমি ভালোবাসি মেঘ, ওই উঁচুতে আশ্চর্য মেঘদল। কিন্তু তখন মনে হচ্ছিল, মেঘ এখন আর উঁচুতে নেই; যেন আমার নিশ্বাসের ভেতর ঢুকে পড়ছে।
ব্যাগ আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রেখে আমরা বেরিয়ে পড়ি। অ্যাশভিল শহর থেকে ব্লু রিজ মাউন্টেনসের দিকে উঠতে শুরু করলে চারপাশের দৃশ্য ধীরে ধীরে বদলাতে লাগল। এই সড়কের নাম ব্লু রিজ পার্কওয়ে।
এটা কেবল সড়ক নয়; পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি এক সুবিশাল গ্যালারির মতো। সেখানে প্রকৃতির তৈরি অপূর্ব সব ছবি পালা করে চলছে। কোথাও রাস্তার পাশে গভীর খাদ, কোথাও গাছের ঘন অরণ্য। আবার কখনো হঠাৎ করে বন সরে গিয়ে চোখের সামনে খুলে যায় বিশাল পাহাড়ের দিগন্ত।
৪৬৯ মাইল দীর্ঘ এই পথটি ক্রমশ ওপরের দিকে উঠতে উঠতে মনে হয় মেঘের সীমানা ছাড়িয়ে চলে গেছে কোনো অজানা মহাশূন্যের দিকে। কোথাও সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ছয় হাজার ফুটেরও বেশি ওপরে উঠে গেছে, রিচল্যান্ড ব্যালসাম নামে একটা জায়গায় পার্কওয়ে সড়কটি ছয় হাজারের বেশি উচ্চতায় পৌঁছেছে।
আর এ পথেই রয়েছে দুই শতাধিক ওভারলুক (ওপর থেকে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার স্থান)। এসব ওভারলুক থেকে পর্যটকেরা গাড়ি থামিয়ে পাহাড়, উপত্যকা আর অরণ্যের দৃশ্য দেখার সুযোগ পান।
রাস্তা ওপরের দিকে উঠছে তো উঠছেই। দুপাশে ঘন সবুজ বন, আর তার ফাঁকে ফাঁকে পাহাড়ের শরীর—একটার পর একটা সারিবদ্ধভাবে সাজানো। ব্লু রিজ মাউন্টেনস অ্যাপালাচিয়ান পর্বতমালার একটি অংশ। অ্যাপালাচিয়ান পর্বতমালা পৃথিবীর প্রাচীনতম পর্বতশ্রেণিগুলোর একটি, আর ব্লু রিজ পার্কওয়ে অ্যাপালাচিয়ান পর্বতমালার বিভিন্ন পর্বতশ্রেণির মধ্য দিয়ে চলে গেছে। দূর থেকে পাহাড়গুলো নীলাভ দেখায় বলেই নাম ব্লু রিজ। কিন্তু সেদিন আমার চোখে সে নীল কিছু ধরা পড়েনি। বৃষ্টিপ্রবণ দিনটিতে মেঘের দাপট বেশি ছিল। প্রকৃতি সেদিন পাহাড়কে সাজিয়েছিল মেঘে মেঘে।
ক্রমশ ওপরের দিকে উঠতে উঠতে আমরা আবার পৌঁছালাম ২ হাজার ৯১৫ ফুট উচ্চতার ওয়ালনাট কোভ ওভারলুকে। তখন বেলা চারটা—নর্থ ক্যারোলিনার জন্য এটা বিকেল নয়, মধ্যাহ্নের মতো। সন্ধ্যা হতে হতে আরও কমপক্ষে সাড়ে চার ঘণ্টা বাকি ছিল; কিন্তু চারপাশ অন্ধকার। অনন্যার বর শুভ তখনও গাড়ি থামিয়ে বলল, বাবা, আমরা এখন মেঘের ভেতর।
আমরা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীটা যেন হঠাৎ খুব নীরব হয়ে গেছে। সেই নীরবতার মধ্যে কয়েক বছর আগের একটি স্মৃতি ফিরে এল—দার্জিলিং। দার্জিলিংয়ের পাহাড়েও এ রকম মেঘের মধ্যে হাঁটার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেখানে কখনো মেঘ এসে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করে, মানুষকে ছুঁয়ে চলে যায়, কখনো পাহাড়, বাড়িঘর, গাছপালা—সবকিছুকে এক মুহূর্তে অদৃশ্য করে দেয়।
আমরা গাড়ি থেকে নেমে পড়ি। মেঘের ভেতরে পাহাড়ের মাটিতে পা রাখি। মেঘগুলো শীতল ধোঁয়ার মতো আমাদের ঘিরে ধরে। একদিকে বিশাল কালো পাথরের শরীর নিয়ে পাহাড়—এতটা খাড়া যে ওপরের দিকে তাকানো যায় না। অন্য দিকে অতল খাদ; সেই খাদের ভেতর থেকে মাথা তুলে উঠেছে বৃক্ষরাজি। গাছগুলোর আকৃতি আর বিস্তার দেখেই বোঝা যায়, শত শত বছর ধরে এসব গাছপালা এখানে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।
শুভ বলে, ‘মেঘ সরে যাওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। মেঘ না থাকলে এখান থেকে দাঁড়িয়ে উপত্যকার বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যায়। এখান থেকে দূরের পাহাড়গুলো দেখে মনে হয় যেন কেউ পাহাড়গুলো ভাঁজ করে সাজিয়ে রেখেছে।’
আমি বলি, মেঘ সরে গেলে ভালো, না সরে গেলে আরও ভালো। মেঘে শরীর ভিজে যাচ্ছে যাক।
ছোটবেলা থেকে আকাশের দিকে কত সহস্রবার এই মেঘের দিকে তাকিয়েছি। কতবার স্বপ্নে দেখেছি, আমি মেঘের সঙ্গে ভাসছি। সেই অধরা মেঘের ভেতর—আমি যেন স্বপ্নেই আছি। মেঘগুলোকে থাকতে দাও; ওরা থাকুক।
এরই মধ্যে চলছিল ছবি তোলার প্রতিযোগিতা। আমার নাতনি নোরা সবচেয়ে বেশি মজা পাচ্ছিল। কখনো মনে হচ্ছিল, মেঘ পাহাড়ের নিচে নেমে যাচ্ছে; আবার কখনো মনে হচ্ছিল, পাহাড় উঠে গেছে মেঘের ভেতর। দূরের কোনো পাহাড় দেখা যাচ্ছে, পরক্ষণেই মেঘ এসে তাকে ঢেকে দিচ্ছে। আবার একটু পর মেঘ সরে গেলে পাহাড়ের কোনো একটি অংশ দৃশ্যমান হয়।
সেই নীরব, নিস্তব্ধ জায়গায় কেবল আমাদের ছয়জনের দলই ছিল না। আরও কয়েকটি গাড়ি ছিল। কেউ কেউ যার যার গাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে, কেউ বসে—মূর্তির মতো বোবা ও অনড় হয়ে প্রকৃতিকে উপভোগ করছিল।
আমাদের বাঙালিয়ানার মুখরতায় তারা একটু হতচকিত। অনন্যা আর শুভ আগাম সতর্ক করে দিচ্ছিল—আমাদের মুগ্ধতা আর উচ্ছ্বাস যেন খুব সরব না হয়ে ওঠে।
এমন সময় একটি ক্যারাভানও চোখে পড়ে। চলন্ত বাসাবাড়ির মতো যানটি নিয়ে কিছু মানুষ সারা রাত পাহাড়ের ভয়ানক নীরবতা আর সৌন্দর্যের ভেতর কাটাতে আসবে—এমনই মনে হচ্ছিল।
আমরা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীটা যেন হঠাৎ খুব নীরব হয়ে গেছে। সেই নীরবতার মধ্যেই কয়েক বছর আগের একটি স্মৃতি আবার ফিরে আসে—দার্জিলিং।
দার্জিলিংয়ের পাহাড়েও এ রকম মেঘের মধ্যে হাঁটার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেখানে কখনো মেঘ এসে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করে, মানুষকে ছুঁয়ে চলে যায়; কখনো পাহাড়, বাড়িঘর, গাছপালা—সবকিছুকে এক মুহূর্তে অদৃশ্য করে দেয়।
পথের প্রতি পথিকের প্রার্থনা—আমাকে ঘরে ফিরিয়ে নাও। এই গানের সুরের ভেতর ঘরে ফেরার স্মৃতি, আপন জায়গার টান, হারিয়ে যাওয়া দিনের ডাক। দূর দেশের একটি গান হঠাৎ যেন নিজের কথা বলল। পাহাড়ের কাছে গেলে পৃথিবীর সব মানুষের স্মৃতিই যেন এক জায়গায় এসে মিশে যায়—কেউ বাড়ি ফিরতে চায়, কেউ শৈশবে, কেউ কোনো পুরোনো প্রিয় মানুষের কাছে। আর আমি সেদিন মেঘের ভেতর দাঁড়িয়ে ফিরে যাচ্ছিলাম আমার নিজের বহু পুরোনো স্মৃতির কাছে।
ওয়ালনাট কোভ ওভারলুকে দাঁড়িয়ে আবার সেই অনুভূতিই ফিরে পেলাম। তবে জায়গা দুটি এক নয়। দার্জিলিং আর ব্লু রিজ মাউন্টেনসের মধ্যে হাজার হাজার মাইলের দূরত্ব। একটির ভূগোল ভারতের হিমালয়, অন্যটির ভূগোল আমেরিকার অ্যাপালাচিয়ান পর্বতমালা। তবু মেঘের কোনো দেশ নেই, কোনো সীমান্ত নেই। পাহাড়ের গায়ে মেঘ নামলে পৃথিবীর দুই প্রান্তের মানুষ একই বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে।
সেদিন আমার কাছে পাহাড়ের সৌন্দর্যের চেয়ে মেঘের সৌন্দর্যই বেশি বড় হয়ে উঠেছিল। রোদেলা দিনে পাহাড় দেখা যায়, উচ্চতা বোঝা যায়, বিস্তার মাপা যায়। কিন্তু যখন পাহাড় মেঘের ঘোমটা পরে, তখন তাকে দেখা যায় না—শুধু অনুভব করা যায়। দৃশ্যের অনুপস্থিতিতে কল্পনা সক্রিয় হয়। ভাবি, কী আছে মেঘের ওপারে—আরও পাহাড়? সুউচ্চ উপত্যকা, গভীর খাদ? নাকি অনন্ত নীলের আকাশ? উত্তর হয়তো জানি, হয়তো জানি না। প্রকৃতির কত কিছুই তো আমরা জানি না। আমাদের জ্ঞানের অতীতে কত রহস্য যে লুকিয়ে আছে! ব্লু রিজ মাউন্টেন যেন সেই রহস্যের সামনেই আমাকে দাঁড় করিয়ে দিল।
অ্যাশভিলের চারপাশের এই পাহাড়ি অঞ্চলে বন, ঝরনা, বহু বিচিত্র গাছপালা মিলে গড়ে উঠেছে অনন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। ঋতু বদলের সঙ্গে বদলে যায় এর রং। বসন্তে নতুন পাতার কোমল সবুজ, গ্রীষ্মে ঘন অরণ্য, শরতে লাল-হলুদ-কমলার বিস্ময়—আর কখনো এমন মেঘলা দিনে পাহাড়ের ওপর নেমে আসে রহস্যের সাদা চাদর।
কিছু সৌন্দর্য বহু বছর পরেও হঠাৎ কোনো কোনো মুহূর্তে ফিরে আসে। যেমন সেদিন ওভারলুকে দাঁড়িয়ে আমার কাছে ফিরে এসেছিল দার্জিলিং। বিশ্বজিৎ চৌধুরী, শুভ্রা বিশ্বাস, ডেইজি মউদুদ, কামরুল হাসান বাদল, সুস্মিতা চৌধুরী, রোখসানা বন্যাদের নিয়ে কী অসামান্য দিন কাটিয়েছিলাম—কত যে কবিতা এসেছিল বুকের গহিন থেকে। সেই ভ্রমণ নিয়ে ‘লাচুংয়ের রাত’ নামে একটি কবিতার বইও হয়ে গেল।
আরও মনে পড়ে গেল মুক্তকণ্ঠের চট্টগ্রাম অফিসের একটি দল নিয়ে পিকনিকে গিয়েছিলাম সাজেকে। সারা রাত পাহাড়ের নির্জনতাকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছিল আমাদের দলের কোরাস গান।
পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়, আমরা আসলে বেড়াতে আসি না। নিজের ভেতরের পুরোনো কোনো জানালা খুলে দিতেই আমরা বেড়াতে আসি।
দার্জিলিংয়ের সেই মেঘ বহু বছর ধরে আমার স্মৃতির কোথাও ছিল। ৮ আগস্ট অ্যাশভিলের ব্লু রিজের মেঘ এসে যেন সেটি জানালায় উঁকি দিল।
ফেরার পথে ইউটিউবে খুঁজে বাজিয়ে দিলাম জন ডেনভারের সেই গান, যেটির কথা আমজাদ বলেছিল—জন ডেনভারের ‘টেক মি হোম, কান্ট্রি রোডস।’ অর্ধশতাব্দীর বেশি পুরোনো এই গানে ব্লু রিজ মাউন্টেনসের কথা উল্লেখ আছে। এর কথাগুলোতে পাহাড় আর নদীর প্রাকৃতিক দৃশ্যকে ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে উঠেছে ঘরে ফেরার আকুতি। পথের প্রতি পথিকের প্রার্থনা—আমাকে ঘরে ফিরিয়ে নাও। এই গানের সুরের ভেতর ঘরে ফেরার স্মৃতি, আপন জায়গার টান, হারিয়ে যাওয়া দিনের ডাক। দূর দেশের একটি গান হঠাৎ যেন নিজের কথা বলল। পাহাড়ের কাছে গেলে পৃথিবীর সব মানুষের স্মৃতিই যেন এক জায়গায় এসে মিশে যায়—কেউ বাড়ি ফিরতে চায়, কেউ শৈশবে, কেউ কোনো পুরোনো প্রিয় মানুষের কাছে। আর আমি সেদিন মেঘের ভেতর দাঁড়িয়ে ফিরে যাচ্ছিলাম আমার নিজের বহু পুরোনো স্মৃতির কাছে।