সুশান্ত মজুমদারের ‘তাবিজ’ গল্পটি ১৯৯৮ সালের ৪ ডিসেম্বর মুক্তকণ্ঠের সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। এত দিন গল্পটি শুধু কাগজের পাতাজুড়েই ছিল, আজ অন্য আলো অনলাইনের পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হলো।

.

ছেলের ফ্যাকাশে কপালে হাত রাখতেই থরথর করে আঙুল কাঁপে কুদরত আলীর। শিরা ওঠা হাতের শলা আঙুলভর্তি ঠান্ডা গলে গলে পড়ে। ছেলে মোহাম্মদ আলীর শরীরের গরমে আজও কমতি নেই। কচি চোয়ালের বাতাস কমে হাড্ডি উঁচুতে উঠেছে, চোখের তলে কালির পোঁচ। কাঁথার নিচে আস্ত একটা মানুষের ছায়া যেন শুয়ে। কুদরত আলী ছেলের গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া বাবা খানজাহানের তাবিজটা ঝুঁকে মনোযোগ দিয়ে দেখে। দোচালা গোলপাতা ঘরে দিনের বেলাতেই অন্ধকার; এ অন্ধকার পুরোপুরি ভেঙে ফেলার মতো চোখে তেজ কই কুদরত আলীর; তাবিজে বদ হাওয়া হামলা করেছে কি না এখন কেমনে বোঝে! চব্বিশ বছর ধরে বাবা খানজাহানের তাবিজ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছে—একেকটা কপালে ঠেকিয়ে চুমু দিয়ে মানুষের হাতে ধরিয়ে সে হাদিয়া বাবদ যা অনিচ্ছাভাবে নিচ্ছে, তা খরচ করে বড্ড গোঁজামিল দিয়ে সংসার চলে। তাবিজকে মনপ্রাণ ঢেলে সে ভক্তি-শ্রদ্ধা করে, মাথায় ছোঁয়ায়। কোনো দিন এর গুণাগুণ বিচারে সন্দেহ করেনি। কেন করবে! খোদ বাবা খানজাহানই তো একরাতে তাঁর এই গরিব মুরিদকে স্বপ্ন দেখাল: ইয়া লম্বা-চওড়া ফরসা ধবধবে পুরুষ, শরীর কী, সাদা একটা পাহাড় ভাগ ভাগ করে কিছু সিনায় কিছু বাহুতে যেন লাগানো, চোখের নজরে ধার, ওই নজর থেকে আলো খাড়া হয়ে পড়ে, ওপর থেকে লম্বা একটা পুরু কাপড়ের নকশা করা আলখাল্লা নিচ পর্যন্ত পরা। কুদরত আলী উঁকি মারে—পা জোড়া দেখাই যায় না। পা না পেলে সে কেমনে কদমবুচি করে! এই দামি স্বপ্নটা সে কাউকে বলেনি, বউকেও না—হিতে যদি বিপরীত হয়। মনের মধ্যে পুষে রাখা স্বপ্নটা দিন দিন চাঙা হয়ে উঠলেই কুদরত আলী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। বাবা খানজাহানের নদী দিয়ে ভাসিয়ে আনা একটা বাড়তি পাথর গুঁড়া করে তাবিজে ভরে সে মানুষদের বিলি শুরু করে। পাথরটা সে খুঁজে পায় দরগার দক্ষিণে—ঝোপের মধ্যে বহু বছরের বুনো তেলতেলে শেওলা ধরা। এখন পাথরটা সে কেমনে নেয়। খাদেমরা নিজেদের হক মাল মনে করে চেহারা উল্টে দেয়—পাথরটা কিছুতেই দেবে না। তারা একই দরগা এলাকার মানুষ, একসঙ্গে ওঠাবসা, দেখো তাদের দুশমনি। বাবা খানজাহান কেবল বুঝি তাদের সম্পত্তি। এই খাদেমরাই তো তাকে মুরগির কাজে ভিড়িয়েছিল। দূরদূরান্তের নারী-পুরুষ আসে বাবা খানজাহানের নামে তাদের মানত পূরণ করতে, কেউ কেউ দিঘির কালা পাহাড় ধলা পাহাড় কুমিরের জন্য মুরগি সঙ্গে করে আনে। কুদরত আলী একা না, আরও কয়েকজন মুরগি নিয়ে ঢালু থেকে ঢালুতে পুকুরপাড়ে নেমে যায়। আওয়াজ এক থেকে দুই সমস্বরে ছড়িয়ে পড়ে—আয় আয় কালা, আয় আয় ধলা। কত ডাকাডাকি। পানি কমে আসা পুকুরে সবুজ হারানো পদ্ম-শাপলা পাতার ভেতর পানি নড়ে, কালা বা ধলার উঁচু কালো পিঠ দেখা যায়। কেউ কেউ দেখে, কেউ কেউ না দেখেই দলে মিশে কলরব করে—ওই যে ওই যে। বাপ-মার সঙ্গে আসা বাচ্চাকাচ্চারা ভয়ে বড়দের পেছনে গিয়ে লুকোয়। কালা-ধলা পাহাড়কে দেখা যায় না। এত বড় দিঘির কোথায় কোন নিচে ডুবে আছে, আলগা বোধে কি ধরা সম্ভব! সবই বাবা খানজাহানের কেরামতি। মানত করা মানুষগুলোর মুখ শুকিয়ে আসে, দৃষ্টি তবু পুকুরে ঘোরে, যদি আর একবার বাবার পানির মুরিদরা দেখা দেন। হাঁকডাক পুকুরপাড়ে ঝরে ঝরে পড়ে। মানতকারীদের মুখে এবার মেঘ—বাবা খানজাহান কি নাখোশ, ফিরিয়ে দিচ্ছেন? পুকুরঘাটে যারা পাক গোসলে নেমেছিল বা বোতল ভরে পানি নিয়ে দাঁড়িয়েছিল, তারা তড়িঘড়ি ওপরে উঠে আসে। সাদা চেক লুঙ্গি পরা এক বুড়ো নিজের দাড়ির ভেতর আঙুল চালাতে চালাতে বিড়বিড় করে আর আকাশে নজর পাঠায়। মুরগি আগেই চালান হয়ে গিয়েছিল কুদরতদের হাতে, তারা কুমির ডাকা বন্ধ করে মানতকারীদের বোঝায়—‘দুঃখ পাইয়েন না। মাল রাইখে যান, মাজার জেয়ারত করেন, কালা–ধলা আসলি দিয়ে দেবানে।’ উশখুশ করে মানতকারীরা, পরস্পর নিঃস্ব দৃষ্টি ফেলে। নিজের চোখে বাবা খানজাহানের পোষা কুমিরের মুরগি খাওয়া দেখবে বলে কদিন ধরে তারা স্বপ্ন তৈরি করে এনেছে। স্বপ্নটা মুচমুচ করে ভঙে পড়লে অনেক কিছু হারানোর মুখে দিঘির পানি তারা তছনছ করে। খাদেমরা আশপাশে পরহেজগারি মুখে ঘুরঘুর করে চোখ ইশারা পাঠিয়ে দেয়। খটাখট চোয়াল উঠে যায়—পাথুরে গাম্ভীর্য নেমে আসে মুখে, নাভির নিচ থেকে ওপরমুখে গলার খাদ ভেঙে বেরিয়ে আসে গায়েবি কিসিমের আওয়াজ। মানত করা মানুষগুলো পায়ে পায়ে ছড়িয়ে পড়ে। কুদরতের হাতে মুরগি আড়ালে হাওয়া। মুরগি কোথায় যায়, কুদরত নিজেও জানে না। জানাজানির এখতিয়ার তার নেই। গায়ে কালো আলখাল্লা, লাল কাপড় জড়ানো, দুই হাতে লোহার বালা পরা, চুলে ধোঁয়া দিয়ে দিয়ে জট বাঁধানোর অধিকার সে পায়নি। দূর দূর মুলুক থেকে মুরগি টেনে আনা বাজে ভোগান্তি, টাকা দিলে মাজারেই মেলে শুনে যারা মানতের দান খোঁজাখুঁজি করে, তাদের সামনে মুরগি আবার হাত ঘুরে এসে যায়। মুরগির কী আদর, মুরগির ঠোঁটে-চোখে চুমু দেয় কুদরত। চার-পাঁচটার ঠ্যাং হাতের মুঠোয় চেপে ঝুলিয়ে ধরে সে। মানতকারীরা বাছবিচার করে, টিপেটুপে দেখে—সাদা পাহাড় কালো পাহাড় বাবার সন্তান, কচি–শুঁটকো নয়, তরতাজা মুরগি চাই। কিন্তু দাম শুনে চোখ কপালে উঠে যায়। উপায় কী? মাজার থেকে শহর প্রায় তিন মাইল, ধুলা ওড়া রাস্তা ভেঙে যাওয়া-আসা, বাজার থেকে মুরগি কিনে ফেরা কি এতই সহজ! বেলা গড়িয়ে যাবে। তিন মুরগির দাম এক মুরগির মধ্যে ঢুকে যায়। পালক থেকে যে গরম ছড়ায়, তার তাপে মানত করা মানুষেরা ঘাবড়ে যায়। পকেটে হাত ঢুকানো লোকের সংখ্যা কম নয়। মাজারের মানুষগুলোর চোখে কী জাদু, চোখের ওপর চোখ ধরতেই ব্যস, গরম কমে আসে, গলে যেতে থাকে মানতকারীরা। আবার কালা পাহাড় ধলা পাহাড়ের নামে ডাকাডাকি। আওয়াজ এই পাড় থেকে উড়ে পুকুরের ওই পাড়ে কুমিরের গর্তে, গাছপালায় ধাক্কা খেয়ে জড়াজড়ি বাঁধিয়ে ফিরে এসে খাদেমদের জিকিরের মধ্যে খসে পড়ে। জিকির লাল কাপড়ে পড়ে সেই ঘুপঘুপ জটিল ভয়ংকর হয়ে যায়। জিকিরের বন্ধ চোখ দু-একবার ফাঁক হলে গাঁজার গন্ধ নিয়ে কড়া লাল নজর মাজারের দেয়ালে বিদ্ধ হয়। এই কড়া নজর, লোহার বালা, লাল কাপড়ের কাছে কোনো দয়া-মায়া-করুণা নেই। পুরোনো অর্ধেক মাটির মধ্যে গেঁথে থাকা বয়সী একটা পাথরের দখল পেতে কুদরতকে তাই খরচা করতে হয়। ছোট-বড় মাথা মিলিয়ে সাত-সাতজন খাদেমকে এক জুম্মাবারে ভরপেট দাওয়াত খাওয়ায় সে। আটশা কল্কি গাঁজা, সের পাঁচেক রসগোল্লা, নিজের ঘরের রান্না করা এক গামলা গরুর গোশত। ভাতে শরীরে রস—ঘোরতর অপছন্দ তাদের। ঢুলু ঢুলু চোখে খাদেমরা কুদরতকে দেখে আর দেখে। কুদরত আস্তে আস্তে ছায়া হয়ে আবার কায়ায় ফিরে ছায়ায় যায় কায়ায় আসে। ‘একটা পাথর বাবা খানজাহান, কটা পাথর’—মোনাজাত জমে জমে ফেটে পড়লে খাদেমদের কাঠ-পায়ের কাছে সে খুলে পড়ে।

.

দিঘির পাড় থেকে ভ্যানে পা ঝুলিয়ে, কখনো ষাটগম্বুজ স্টেশনে ধাক্কাধাক্কি করে ট্রেনের হ্যান্ডেল ধরে, কখনো হাতব্যাগটা নিয়ে পায়ে হেঁটে কুদরত আলী সপ্তাহে ছয় দিন যায় কোর্ট এলাকায়। দশ-এগারোটার মধ্যে গোটা কোর্টের মাঠে রাস্তায়-সিঁড়িতে-বারান্দায় গিজগিজ করে মানুষ। রামপাল, মোড়েলগঞ্জ, শরণখোলা থানার মানুষ কুড়িয়ে একতলা লঞ্চগুলো এসে ভেড়ে ঘাটে। লঞ্চ ছেড়ে মামলা-মোকদ্দমার মানুষের পা বাড়ালেই কোর্ট। দুটো লাল পাছার বুড়ো বানর ও একটি ডুগডুগি বেশ মজমা জমিয়েছে। লুঙ্গি পরা লম্বা-খাটো, কাবু-মোটা, ভাঙা-মচকানো চেহারার মানুষও ধীরে ধীরে গোল হয়ে দাঁড়ায়। এজলাস বসেনি—জজ ম্যাজিস্ট্রেট এখনো হাজিরই হননি। সুলতান মিয়া দড়িতে টান দিলেই ইঙ্গিত বুঝে বানর দুটি দুই পায়ের ওপর ধেই ধেই নাচে, ডুগডুগি বেজেই চলে, সুলতান মিয়ার ঠোঁটে ছড়া—খেল দেখাবিরে খেল দেখাবি। মজমায় পরের সুযোগে আসবে মেহ-প্রমেহ, গনোরিয়া, আশি প্রকার বাত শায়েস্তা করার মোক্ষম ও একমাত্র হেকিমি দাওয়াই সেলাজুত-হালুয়া বেচা আক্কাস পাঠান। নিজেকে সে পাঠান মুলুকের বংশধর বলে দাবি করলেও তার বাড়ি হলো গিয়ে রায়েন্দার কাশেমপুর গাঁয়ে। কই পাঠান মুলুক আর কই রায়েন্দা! ছোটখাটো শুকনো হালুয়া-সেলাজুতের উল্টো শরীরের এ মানুষটা গোপন অঙ্গের অসুখবিসুখ নিয়ে মজমায় সে রসালো বয়ান ভাসিয়ে দেয়, তা বাতাসে উড়ে বেড়ানো ঠোঙা কাগজও মজায় ফরফর করে। মজমায় কার পর কার সুযোগ আগেভাগে শলাপরামর্শ করে নিজেরা ঠিক করে রাখে। দুচোখ পুরো অন্ধ, পাঁচ আঙুলে বড় বড় পাথর বসানো আংটি, মাথায় সবুজ পাগড়ি, কালোর ওপর কালো চড়ানো মোটা মানুষটা থপথপ পায়ে এসে হাজির—‘পেয়ারে নবী মোস্তফায়, রাস্তা দিয়া হাইটা যায়, হরিণ একটা বান্ধা ছিল গাছের তলায়গো’ বলে তার বেসুরো মোটা গলা যখন গান ধরে মজমার মানুষ আস্তে আস্তে কমতে থাকে। সমস্যা হয় কুদরত আলীর। বাবা খানজাহানের তাবিজ বিতরণের জন্য পাতলা ভিড় পুরু করতে তাকে গল্প জুড়তে হয়। কথার সঙ্গে কথা গিঁট দিয়ে মানুষের মনের মধ্যে সুড়ুৎ করে ঢুকে সেখান থেকে বেরিয়ে আবার যাতায়াত চালু রাখা কি সহজ-সাধ্যি কাজ! কুদরত আলী নিজেই ধাঁধায় পড়ে যায়—একই গল্প বলতে বলতে আকার-প্রকারে একেক দিন একেক রকম হলে তার শুরু ও শেষের মাথামুণ্ডু সে খুঁজে পায় না। দুই জোড়া ঘোড়ার কানে কানে বাবা খানজাহান সুরা পড়ে দাবনায় থাবা দিতেই ঘোড়া বাতাস ভেঙে ছোটে—ঘোড়া ছুটছে-ছুটছে-ছুটছে...কিন্তু কুদরত আলীর অপটু ঠোঁট পাল্লা দিয়ে ছুটতে পারে না। লাগাম তাকে টেনে ধরতে হয়। বাবা খানজাহান, কী তাঁর কুদরত, নিজের নামও কুদরত ভেবে ভিজে হঠাৎ জোশ এসে পড়ে—তিনি বাতাসে চড়ে ঘোড়ার আগে, তাঁকে হারানোর মুরোদ কার? ঘোড়া খুরের ধার ক্ষয়ে দাঁড়িয়ে পড়লে বাবা খানজাহান শূন্যে হাত তুলে একটা কোদাল ধরে আনেন, ওই কোদালের কোপ পড়ে মাটিতে। ঘোড়দৌড়ের শুরু থেকে শেষ টানা সীমানা নিয়েই ঘোড়াদিঘি—বাবা খানজাহানের দিঘি। তাঁর ডাকে পাহাড় থেকে পাথর গড়িয়ে নামে, পাথর নদীর পানিতে শোলার মতো ভাসতে ভাসতে পৌঁছে যায় দরগায়। কোথায় যায়—দরগায়, কী ভাসে—পাথর। গল্পের ধারাবাহিকতার সঙ্গে কণ্ঠের ওঠানামা তাল মেলাতে না পারলে কট করে গল্প ছিঁড়ে যায়। জমে আসা নতুন ভিড়ের সামনে কোর্টের মধ্যখানে দাঁড়ানো বিরাট ও প্রাচীন বটগাছের ওপর দিয়ে নজর শূন্যে পাঠিয়ে কুদরত আলী খাবি খায়—এখানে সত্যি কি পাহাড় ছিল, পানিতে পাথর? তখনই নিজের মনের ওপর জোরালো ধমক দিয়ে সে তওবা করে নেয়—‘মাফ করে দাও বাবা খানজাহান, এ তোমার মুরিদের কথা নয়, শয়তানে আসর করছিল, মাফ করো বাবা।’ মাফ চাওয়াচাওয়ির মধ্যে ব্যাগ থেকে হাজার মুশকিল আসানের পবিত্র তাবিজ সে বের করে আনে। এক তাবিজে বালামুসিবত সব গায়েব। কুদরত আলী তাবিজের ক্ষমতা দেখিয়ে মজমার মানুষজনকে তাজ্জব করে দিতে ফুঁ দিয়ে ধুলা সরিয়ে মাটিতে একটি তাবিজ রাখে—‘তুলা রাশির মা-নু-ষ’। স্বর টেনে লম্বা করে সে বলে, ‘এই তাবিজ তুলা রাশিকে টেনে আনবে। বাবা খানজাহানের ক্ষমতা, পরীক্ষা কইরে দ্যাখেন।’ শেষের দিকে এসে রপ্ত করা ভদ্র ভাষা কুদরত আলী আর রক্ষা করতে পারে না। ‘আছেন কেউ তুলা রাশি, আছেন কোনো ভাইবেরাদর, থাকলে সাড়া দ্যান, বাবা খানজাহানের তাবিজ।’ গোল হয়ে দাঁড়ানো মজমা যেন উত্তেজনায় শ্বাস বন্ধ করে আছে।

.

ক্যানভাস করার হাতেখড়ির দিন সেই পয়লা শীতের দুপুরে কুদরত আলী তাবিজ রেখে তুলা রাশিকে টেনে আনা নিয়ে দারুণ মুসিবতে পড়ে। রীতিমতো তার শরীরে হাতপড়ার জোগাড়। নিজেকে তুলা রাশির জাতক বলে একজন মাটিতে ডান হাত পেতে দেয়, ‘দেহি বাপু, তোমার তাবিজে ক্যামনে হাত টানে।’ পাথরের গুঁড়াভর্তি মোম দিয়ে মুখ আটকানো সাদা তাবিজ ওই হাত কিছুতেই টেনে আনতে পারে না। হাত ধুলার মধ্যে পড়েই থাকে। মানুষটা সূক্ষ্ম নজরে কুদরত আলীকে দেখে খ্যাক খ্যাক করে হাসে। মজমার কোলাহল-হাসি-রূঢ়স্বরে ক্ষারে কাচা জামার মধ্যে অসহায় নির্বাক কুদরত আলী লজ্জা-ভয়ে কলকল ঘামতে থাকে। নিংড়ে মন-প্রাণ ঢেলে মনে মনে আকুল হয় সে—‘বাবা খানজাহান, তোমার এই অবুঝ মুরিদকে বাঁচাও, বাঁচাও বাবা।’ তার মোনাজাতে সাড়া দিয়ে বুঝি বাবা খানজাহান মজমায় লোক পাঠিয়ে দেন। ‘খাঁটি তুলা রাশি’ বলে এক জোরালো পুরুষ মাটিতে হাত পেতে দেয়। মুহূর্তে তার হাত ধুলাবালু ভাঙতে ভাঙতে তাবিজের কাছে এসে থেমে পড়ে। টেনেও তার হাত ওপরে তোলা যায় না। মানুষটার ঘাড় হেলে পড়ে। কুদরত আলী তাবিজ বিতরণ করবে কী, গা ছেড়ে দক্ষিণ মুখে বাবা খানজাহানের নামে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কাঁদে, ‘এ যাত্রায় তুমি বাঁচিয়ে দিলে বাবা।’ মজমার কেউ কেউ ওই কান্নায় সাড়া দিয়ে নিজেদের চোখ মোছে। প্রথম দিন তাবিজের হাদিয়া বাবদ মনে যা চায় তা–ই দেন, দরদাম নেই বলে আয় মন্দ হয় না। মজমা শেষে ডুগডুগি বাজানো সুলতান মিয়া এসে ঘাড়ে হাত তুলে দিয়ে—‘বাঁচাইয়া দেলাম। হেন এককাপ চাপ খাওয়ালে খুশি।’ কুদরত আলী অবুঝ মুখে নজর রাখলে সুলতান মিয়া হাসে—‘মিয়া ক্যানভাস আগে শ্যাখেন। সমিতিতে নাম ল্যাখান।’ হাদিয়া বাবদ পাওয়া অর্ধেক টাকা মোট ছজন ক্যানভাসারের জন্য চায়ের ছাপরায় বিস্কুট-চা-পুরির খরচে চলে যায়। তা যাক, পুরো টাকাটাই যাক, কুদরত আলী কিছুতেই বাবা খানজাহানের পাথর গুঁড়ার তাবিজ অবিশ্বাস করবে না। বাবা খানজাহানই তো তাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাঁর নেকনজর যদি না থাকত, তবে তার মতো উড়ন কিসিমের উল্টাপাল্টা মানুষ এখন কেমনে সংসার করে; আর বাবার নাম ডেকে ডেকে দোজাহানের নেকি হাসিলের চেষ্টা করছে কেমনে! জীবনের অনেকটা বছর আজেবাজে কাজে সে খরচা করেছে। দরগা লাগোয়া মানুষ, অথচ ধর্ম-কর্মে মনোযোগ নেই, ইবাদত-বন্দেগি নেই, বাবার শানে হন্যে দিয়ে ধনদৌলত না হোক ডাল-ভাতের উপায়ের জন্য কান্নাকাটি নেই, কী বখে যাওয়া জীবন! বাপ বেঁচে থাকতে পকেটের পয়সা সরিয়ে শহরে এসে এক শো সিনেমা দেখে আবার ভালো মুখ করে দরগায় গিয়ে শুয়ে থেকেছে। বাপ তমিজ আলী খুঁজতে খুঁজতে ছেলেকে অভুক্ত মাজারের পাথুরে ঠান্ডায় টান টান শুয়ে থাকা পেয়ে জড়িয়ে ধরে কাঁদে—‘বাবা এরে টানতিছ তুমি, টানতিছ, আমার এট্টা মাত্তর ছেইলে, দয়া করো, দয়া করো বাবা, ঘরে নি।’ কুদরত আলী মনে মনে হাসে। ওই সময়ে লাইট হলে আসা প্রতি সপ্তাহের নতুন নতুন ছবি, মোহাম্মদ আলী-নীলোর সিনেমা তাঁকে এমন প্রবলভাবে টানে যে তিন মাইল দূর উড়াল দিয়ে আসতে পারলে সে বেঁচে যায়। নীলোর নাচ-পায়েল কী ঝংকার। তবে মোহাম্মদ আলী খোদ পর্দা ছেড়ে কুদরত আলীর মনে ডুকে টগবগে জোয়ানি জমা দিলে সে কেমনে শুধু দেখনেঅলা থাকে! মোহাম্মদ আলীর কি ফাইট, ঘোড়া ছোটানো, তালোয়ার ঘোরানো। ‘ওয়াতন কঅ সিপাহি’ দেখে কুদরত আলী না হলে না ঘরে স্থির হতে পারে, সিপাহি হওয়ার দুর্দান্ত টানে সে থানার মাঠে লাইনে এসে দাঁড়ায়। শরীর টিপে, মাপ দিয়ে, চোহারা দেখে যে মেজর সাহেব লোক বাছাই করছিল, তাকে দেখে কুদরত আলীর শেরেগুলের কথা মনে পড়ে। শেরেগুল হলো গিয়ে কমেডিয়ান, সে নায়ক মোহাম্মদ আলীর কাবুলি জামা-প্রেম-গান-ফাইট কীভাবে বোঝে! কুদরত আলীর কপালে মোহাম্মদ আলীর ফোকাস পড়তে না পড়তেই খবর পেয়ে এসে বাপ তাঁকে চড়াতে চড়াতে ঘরে নিয়ে যায়। ওয়াতন কা সিপাহি প্রতিটি দৃশ্য খুলে আলাদা হয়ে তার সঙ্গে বড্ড বেইমানি করে। তবে জোয়ান মোহাম্মদ আলী বুঝি মগজের কোণে বহু বছর একা একা ঘাপটি মেরে বসে ছিল। নইলে দুই-দুটি ছেলের পর অনেক বিলম্বে এই শেষ সন্তান জন্ম নিলে তার নাম কেন মোহাম্মদ আলী রাখতে গেল! বড় ছেলে ইমান আলী নিজের ইমান বজায় রাখার নামে বিয়ের পরপরই বাপ-মাকে বাজে মনে করে আলাদা হয়ে গেছে। আজকাল ছেলে ট্রেনে কেটে গেলে, পুড়ে গেলে, ঘা হলে মহাশঙ্কর তেল লাগান বলে কালো রঙের ছোট ছোট শিশি বিক্রি করে। নিজের কবজির ওপরের মাংসে ছুরি টেনে রক্ত বের করে ওই কাটা অংশে মহাশঙ্কর তেল ঢেলে দিয়ে টেনে টেনে দেখায়—এক মিনিটে জোড়া, দামি জিনিস সস্তা দাম, নকল থেকে সাবধান। আহমদ আলী দেখতে না দেখতে লকলক করে বেড়ে উঠল, তার চেয়ে বেড়ে গেল তার কথার দাপট। বাবা খানজাহান নিয়ে হঠাৎ হঠাৎ ধারালো প্রশ্ন তুলে সব ভাওতা, বুজরুকি, মানুষ ঠকানো বলতে থাকলে মুখ বুজে সহ্য করে আসা কুদরত আলী নাস্তিক ছেলের আখেরাত ভেবে একরাতে কুড়াল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আহমদ আলী কুড়াল পরোয়া না করে তার চেয়ে দামি-শক্তিশালী অস্ত্রের সন্ধান পেয়ে গোপন দলের সঙ্গে ভিড়ে যায়। দুঃখ দেখো তার, প্রথম বয়সের গুনার শাস্তি থেকে আজও সে রেহাই পায়নি। বাবা খানজাহান পাথরের মাজারে শুয়ে যুগের পর যুগ তাকে পরীক্ষা করে যাচ্ছেন। বয়সের শেষ কালে এসে খুব হঠাৎ করে জন্ম নেওয়া মোহাম্মদ আলী ছবির মোহাম্মদ আলীর মতো ফাইট না পারুক অন্তত ছোটাছুটিটুকু পারুক, তা না, হাঁ করে হাঁটার সময় ছেলের কোমর ছেড়ে হাফপ্যান্ট নিচে নেমে এলে হুঁশ থাকে না। কী যন্ত্রণা! এগারো দিন আগে গা গরম নিয়ে মোহাম্মদ আলী সেই যে তক্তার খাটে এসে পড়ে তো আজও গরমে গরম ফেলে শুয়েই আছে। কুদরত আলী দিশা পায় না।

.

চারপাশ থেকে খারাপ হাওয়ার জোয়ার আসছে। অনেক রাতে আজকাল কুকুরের কান্না শোনা যায়। কলাগাছের পাতা যখন–তখন শব্দ ছড়িয়ে বুক ঠান্ডা করে দেয়। প্যাঁচা চেঁচিয়ে ওঠে, কাঁদে না ডাকে—বোঝা যায় না। বাবা খানজাহান যে মাটিতে শুয়ে, তাঁর কালা পাহাড় ধলা পাহাড় বংশ দিয়ে দিয়ে মানুষের মানত নিচ্ছে, সেই দরগার চারপাশ ঘেরাও করে এনেছে ঝোপজঙ্গল। খসে পড়ছে মাটি। শেওলা ধরে সিঁড়ি পিচ্ছিল। ঘেয়ো কুকুরগুলো মাজারের উদ্দেশে উঁচুতে উঠে যাওয়া খোয়া বেরোনো এবড়োখেবড়ো রাস্তায় শুয়ে রোজ রোগ ছড়াচ্ছে। রোগীর কথা আবার মনে আসতেই কুদরত আলী ঝুঁকে পড়ে প্রথম থেকে মোহাম্মদ আলীকে দেখতেই থাকে। কত কত এলাকার অচেনা–অজানা মানুষ তার হাত দিয়ে তাবিজ নিয়ে মুসিবতের সমাধান পাচ্ছে; আর তার নিজের ছেলে কিনা দিন দিন বিছানা আঁকড়ে একটু একটু করে ধসে যাচ্ছে। সত্যি কি বাবা খানজাহান চিরস্থায়ীভাবে তার ওপর নাখোশ? নাকি পাথরের গুঁড়া পরিমাণমতো তাবিজে পড়েনি? ‘হে বাবা এই গুনাগাররে তুমি মাফ কইরে দাও। তোমার কালা পাহাড় ধলা পাহাড়রে নিয়ে ছলচাতুরি, মুরগি নিয়ে চোরাচুরি, হো বাবা, খাদেমগো কাজ, ওডার শাস্তি একা আমারে ক্যানো?’ কুদরত আলীর চোখবোজা মোনাজাতের ভেতর খানিক রিনরিনে কষ্টমাখা স্বর, খানিক চাপা কান্না হঠাৎ ঢুকে পড়লে সব গোলমাল হয়ে যায়। তাকিয়ে দেখে কোলকুঁজো মোহাম্মদ আলীর মা ছেলের রোগে উদ্বেগে ছত্রখান। ঘোলা চোখের নজর স্বামীর ওপর ফেলে কাতর কণ্ঠে সে খুলে পড়ো পড়ো হয়—‘ছেলেডারে কি একবারের জন্য ডাকতার দেহানো যায় না?’ ডাক্তার? ঘরের বউও কি তবে তাবিজের ওপর আস্থা হারিয়েছে? বাবা খানজাহানের তাবিজ কি তবে মিথ্যে? মিথ্যে কোত্থেকে জোর পেয়ে কুদরত আলীর মাথার মধ্যে প্রবেশ করে দ্রুত খোঁড়াখুঁড়ি চালু করলে আর কোনো উপায় পায় না কুদরত আলী। খুব ঝুঁকে সত্য-মিথ্যা নিয়ে ছেলের গলার তাবিজটা সে চূড়ান্তভাবে পরখ করে চলে।