সারা দেশে গ্যাস-সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়েছে। ঢাকাতেই অবস্থার টানাপোড়েন তীব্র, আর ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি আরও সংকটময়। বাসাবাড়ি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়েছে গভীরভাবে, অনেক শিল্পকারখানায় উৎপাদনও বন্ধ হয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও বাস্তব অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়।

এই স্থবিরতার পেছনে সরকারের ভূমিকার কিছু ত্রুটি চিহ্নিত করা হয়েছে অন্তত পাঁচভাবে: এক. এলএনজি টার্মিনাল মেরামত এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহে বিদ্যমান কারিগরি দুর্বলতা মোকাবিলায় গুরুতর অদক্ষতা; দুই. ভোলা গ্যাসক্ষেত্র এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিদ্যুৎ নিয়ে ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ না করা; তিন. নিজেদের অদক্ষতা আর ব্যর্থতার দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো; চার. সংকটের সুযোগ নিয়ে দেশি-বিদেশি কিছু ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর এজেন্ডা পূরণে মহা সক্রিয়তা; এবং পাঁচ. অযৌক্তিক বাড়তি বিল চাপিয়ে মানুষের বোঝা আরও বাড়ানো।

মনে রাখা দরকার, একসময় আমাদের সীমিত গ্যাসসম্পদ মার্কিন তেল কোম্পানি ভারতে রপ্তানি করার জন্য চাপ তৈরি করা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রেও প্রশ্ন ওঠে—কারা তখন দেশে গ্যাস ব্যবহার না করে কোম্পানির স্বার্থে তা বিদেশে রপ্তানির পক্ষে উন্মাদনা তৈরি করেছিল।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট থেকে বের হওয়ার পথ কী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা কি বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট দূর করবে—এ ধরনের প্রশ্নও সামনে আসে। তাদেরই অনেকে উত্তরবঙ্গ বিনাশ করে দেশের কয়লা সম্পদও রপ্তানি করতে চেয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত, বিশ্বব্যাংক, এডিবি, বিশেষজ্ঞ নামের কিছু কোম্পানি লবিস্ট এবং কতিপয় মন্ত্রী-আমলা-ব্যবসায়ী-মিডিয়ার জোট—এমন একটি সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। এর বিরুদ্ধে জনপ্রতিরোধের তাগিদেই তখন গঠিত হয়েছিল ‘তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি’.

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্টও (বিল ক্লিনটন) এসে হাজির হয়েছিলেন কোম্পানির পক্ষে লবিং করতে। প্রবল আন্দোলনের মুখে তখন গ্যাস রপ্তানি থামানো হয়েছিল—না হলে আজ যতটুকু গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, সেটাও পাওয়া যেত না বলে মত দেওয়া হয়েছে। শিল্পকারখানা, ঘরবাড়ি সব জায়গায় কী ভয়াবহ অবস্থা হতো, সেটি নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। আমদানি করতে হতো বর্তমানের কয়েক গুণ তেল ও এলএনজি।

একদিকে গ্যাস-সংকটের অজুহাত দিয়ে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি, কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, অন্যদিকে গ্যাস রপ্তানির বিধান রেখে ওই পক্ষের সুবিধা বাড়িয়েই বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বারবার চুক্তি করার চেষ্টা হয়েছে। নিজেদের সক্ষমতা বিকাশের কোনো চেষ্টা করা হয়নি।

১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ‘জাতীয় কমিটি’ বরাবর তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল—বাংলাদেশের জাতীয় খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর জনগণের শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত করা, সম্পদ সীমিত হওয়ায় তা বিদেশে রপ্তানি নিষিদ্ধ রাখা এবং দেশের মানুষের কাজে দীর্ঘ সময় ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করা, এবং নিজস্ব তেল-গ্যাস অনুসন্ধান-উত্তোলন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। অভিযোগ করা হয়, সে সময় থেকে আজ পর্যন্ত কোনো সরকারই এই পথে অগ্রসর হয়নি; বরং উল্টো পথে গেছে। বিদেশি কোম্পানি, বিদেশি ঋণ ও আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধির কথাও বলা হয়, পাশাপাশি প্রাণপ্রকৃতি-বিনাশী নানা চুক্তি ও নীতি গ্রহণের প্রসঙ্গও এসেছে। হাসিনা সরকারের দেড় দশকে এই ধারার ‘চরম রূপ’ আমরা দেখেছি—এ দাবিও তুলে ধরা হয়েছে।

উঠে আসে আরেকটি মত—জনপ্রতিরোধের কারণে গ্যাস রপ্তানি বন্ধ হলেও জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত বহুজাতিক ও দেশি লুটেরাদের কবল থেকে বের হতে পারেনি। পাশাপাশি বলা হয়, ২০১০ সালে ‘দায়মুক্তি আইন’ করে এদের দাপট বাড়ানো হয়েছে। তাদের স্বার্থেই জাপানের জাইকার কনসালট্যান্টদের মাধ্যমে ২০৪১ পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপজ্জনক মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে—এ ধরনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বিপুল অর্থব্যয় ও পরিবেশবিনাশ সত্ত্বেও আজকের ‘মহাসংকট’ তৈরি হওয়ার কারণ হিসেবে এই পথকেই দায়ী করা হয়েছে।

সরকার বদলালেও পথের বদল হয়নি বলে দাবি করা হয়। বিভিন্ন সময় হালনাগাদ আর ব্যয়বহুল সলা–পরামর্শের কথা শোনা গেলেও ‘মহাপরিকল্পনা’র মূল বৈশিষ্ট্য একই আছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে: (১) এটি বিদেশি ঋণ-তহবিল, কনসালট্যান্ট এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংস্থার স্বার্থযুক্ত; (২) এতে বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি, জনঘনত্ব, সম্পদের প্রাপ্যতা, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং জনস্বার্থের প্রশ্ন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি; (৩) বিদেশি কোম্পানি, আমদানি ও ঋণনির্ভর, পরিবেশ বিধ্বংসী উচ্চ ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ প্রকল্পে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে; এই ধারাতেই সুন্দরবনসহ প্রাণবিনাশী বিভিন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, ভয়ানক ঝুঁকিপূর্ণ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, এবং এলএনজি আমদানির বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে; (৪) নিয়মিতভাবে গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে; (৫) সারা বিশ্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের গতি অভূতপূর্ব হারে বৃদ্ধি পেলেও এখানে তার অবস্থান প্রান্তিক; এবং (৬) এতে জাতীয় সক্ষমতার কোনো গুরুত্ব নেই।

এই ধারায় একদিকে গ্যাস-সংকটের অজুহাত দিয়ে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি, কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে; অন্যদিকে গ্যাস রপ্তানির বিধান রেখে ওই পক্ষের সুবিধা বাড়িয়েই বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বারবার চুক্তি করার চেষ্টা হয়েছে—এ কথাও পুনরুল্লেখ করা হয়েছে। নিজেদের সক্ষমতা বিকাশের কোনো চেষ্টা করা হয়নি বলেও উল্লেখ আছে।

এই প্রেক্ষাপটে কিছু মানুষের পকেট ভারী হওয়ার প্রসঙ্গও সামনে আনা হয়েছে, বিশেষ করে জ্বালানি সংকটের ধারাবাহিকতায়। লেখক বলেন, জ্বালানি-সংকট: যা কিছু জেনে আমাদের পরিকল্পনা সাজাতে হবে—এ ভাবনা থেকেই বিকল্প চিন্তা দরকার। দেশের, প্রবাসের ও বিদেশের বিভিন্ন স্বাধীন বিশেষজ্ঞ নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ২০১৭ সালের ২২ জুলাই ‘বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (২০১৭-২০৪১): জাতীয় কমিটি প্রস্তাবিত খসড়া রূপরেখা’ প্রকাশ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

এ রূপরেখায় দেখানো হয়েছে—বাংলাদেশের জন্য কয়লা ও পারমাণবিক দুই পথই খুব বিপজ্জনক, প্রাণবিনাশী এবং আর্থিক–সামাজিক দিক থেকেও বড় বোঝা। পাশাপাশি আমদানিমুখী, ঋণ ও বিদেশি কোম্পানিনির্ভরতা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ বলেও মত দেওয়া হয়েছে।

লেখকের মতে, সর্বোত্তম পথ হলো—নিজেদের গ্যাসসম্পদ উত্তোলনে জাতীয় সক্ষমতা তৈরি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিপুল সম্ভাবনা বাস্তবায়নে জোরদার নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্যে সংমিশ্রণ। এই পথে গুরুত্ব দিয়ে অগ্রসর হলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে আজকের মহাসংকটের পরিস্থিতি তৈরি হতো না বলে দাবি করা হয়। গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বারবার বাড়ানোর প্রয়োজনও পড়ত না বলেও মত দেওয়া হয়েছে; নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করেও দাম আরও কমানো সম্ভব—এ বক্তব্যও রয়েছে।

সরকার, বিশ্বব্যাংক, বৃহৎ কোম্পানি গোষ্ঠী ও তাদের পছন্দসই আমলা-কনসালট্যান্টরা আমদানি আর বিদেশি কোম্পানি ছাড়া অন্য পথে যেতে কোনোভাবেই রাজি নন—এ অভিযোগও তোলা হয়েছে। জাতীয় সক্ষমতার প্রশ্ন তাঁদের কাছে অপছন্দের বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই কারণে ২০ বছর ধরে সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বিদেশি কোম্পানি আনা হয়, কাজ হয় না—এ ধরনের বক্তব্যও আছে। আবার আনার জন্য সরকারের ছোটাছুটি চলতে থাকে, কোম্পানির চাপে বারবার সুবিধা বাড়ানো হয়, একের পর এক এলএনজি আমদানি চুক্তি হয়, বিষাক্ত কয়লা লবিও গলা বাড়ায়—এভাবেও বর্ণনা করা হয়েছে।

তবে কোনো সরকারকে নিজের ভিত্তি অর্থাৎ জাতীয় সক্ষমতার বিকাশ এবং তার ওপর ভিত্তি করে সামগ্রিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না বলে মত দেওয়া হয়েছে। যে বিপুল পরিমাণ টাকা এলএনজি আমদানি ও ক্যাপাসিটি চার্জে খরচ হয়েছে, তার একাংশ খরচ করে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিলে এত দিনে দেশে একটা স্বাধীন শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়ে যেত—এ যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।

জাতীয় সক্ষমতার কথা বললেই বলা হয়—‘আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা পারব না’। লেখক বলেন, দেশে এত এত বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও যদি বলা হয় আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়, তবে এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাভ কী। লেখকের ভাষায়, আসলে আমাদের প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সেই সুযোগই দেওয়া হচ্ছে না। ‘জাতীয় হীনম্মন্যতা’ তৈরি করে দেশি–বিদেশি করপোরেট লবিস্টরা দেশের আত্মনির্ভর শক্তিশালী বিকাশের পথ রুদ্ধ করে রেখেছে—এ দাবিও এসেছে।

প্রকৃতপক্ষে এই জাতীয় হীনম্মন্যতার দেয়াল ভাঙাই যেকোনো জনপন্থী সরকারের প্রধান দায়িত্ব বলেও উল্লেখ করা হয়। বর্তমান গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের সমাধানও সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। তবে লেখকের মতে, তার জন্য স্বল্প মেয়াদে পরিস্থিতি উত্তরণে, বর্তমান সরকারের ভূমিকার যেসব সমস্যার কথা আগে বলা হয়েছে, সেগুলোর আশু পরিবর্তন অত্যাবশ্যক।

মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে টেকসই ও সাশ্রয়ী ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সরকারের মূল কাজ হতে হবে—জনগণের শতভাগ মালিকানা ও জাতীয় সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে নতুন পথনকশা নিয়ে অগ্রসর হওয়া। কিন্তু বর্তমান সরকার যদি আগের ধারাতেই গলায় রশি বেঁধে বসে থাকে, তাহলে দেশি–বিদেশি কিছু গোষ্ঠীর পেট ফুলবে ঠিকই, তবে দেশের সংকট আরও বাড়তেই থাকবে—এ সতর্কতাও লেখক দিয়েছেন।

আনু মুহাম্মদ

শিক্ষক, লেখক এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথা র সম্পাদক

মতামত লেখকের নিজস্ব