সম্প্রতি ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ২০২৬’ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। তবে যেহেতু নীতিগুলো বাস্তবায়নের আগেই বাতিল হয়েছে, তাই তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত হওয়ার কথা। তবু এই সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত—অতীতের অভিজ্ঞতা, ঘাটতি এবং বাস্তবতা ধরে নিয়ে আরও কার্যকর, বাস্তবসম্মত ও প্রমাণভিত্তিক কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে।

বাংলাদেশে ১৯৯৪ সাল থেকে ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের ক্ষেত্রে মূলত কস্ট-প্লাস প্রাইসিং ফর্মুলা অনুসরণ করা হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে কাঁচামাল ও প্যাকেজিং ব্যয়ের সঙ্গে একটি নির্ধারিত মার্কআপ যোগ করে ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। সমস্যা হলো, এই মূল্য নিয়মিতভাবে সমন্বয় করা হয়নি। ২০২২ সালের পর আর কোনো মূল্য সমন্বয় করা হয়নি। ফলে এসব ওষুধের অনেকগুলোর উৎপাদন এখন আর বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয়। যেসব কোম্পানি শুধু এসব ওষুধ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তাদের অনেকেই উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে; আবার কিছু কোম্পানি এখনো উৎপাদন করলেও সম্ভবত লোকসান দিয়ে তা করছে।

ওষুধ একটি বাণিজ্যিক পণ্যও। তাই কাঁচামাল, জ্বালানি, শ্রম, প্যাকেজিং, পরিবহন ও বিনিময় হারের মতো উৎপাদন ব্যয়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ওষুধের মূল্য সমন্বয় করা প্রয়োজন। মূল্য দীর্ঘদিন অপরিবর্তিত থাকলে নির্ধারিত মূল্য ও প্রকৃত উৎপাদন ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে এটি উৎপাদনকে নিরুৎসাহিত করে এবং বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। তাতে রোগীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হন, পাশাপাশি উৎপাদকদের জন্যও টেকসই ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি হয় না।

দীর্ঘদিন ধরে মূল্য সমন্বয় না হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক বাস্তবতাও কাজ করে। ওষুধের দাম বাড়লে জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে—এই আশঙ্কায় সরকার মূল্য সমন্বয়ে অনাগ্রহী হতে পারে। কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবতা উপেক্ষা করলে সমস্যা দূর হয় না। নিয়ন্ত্রিত মূল্য যদি প্রকৃত উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে উৎপাদকেরা ধীরে ধীরে কম দামের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদন থেকে সরে যেতে পারেন। ফলে এমন মূল্যনীতি, যা ওষুধশিল্পের স্থায়িত্বকে দুর্বল করে, দীর্ঘ মেয়াদে রোগীর স্বার্থও রক্ষা করতে পারে না।

তাই মূল নীতিগত ভারসাম্যটি স্পষ্ট হওয়া দরকার: ওষুধ রোগীর নাগালের মধ্যে থাকতে হবে, আবার উৎপাদককেও এমন মূল্য দিতে হবে, যাতে তাঁরা মানসম্মত ওষুধ টেকসইভাবে উৎপাদন করতে পারেন। রোগীর ক্রয়ক্ষমতা ও শিল্পের স্থায়িত্ব—দুই লক্ষ্যকে পরস্পরবিরোধী না ধরে, একই জনস্বাস্থ্যনীতির দুটি অপরিহার্য লক্ষ্য হিসেবে দেখাই যুক্তিযুক্ত।

সরকার যদি নতুন করে কোনো কমিটি বা টাস্কফোর্স গঠন করে, তবে দায়িত্ব কেবল আরেকটি নতুন তালিকা তৈরির মধ্যে সীমিত করা ঠিক হবে না। জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের অধীনে একটি শক্তিশালী বহুবিষয়ক কারিগরি টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। এই টাস্কফোর্সের কাজ হবে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ ও কারিগরি বিশ্লেষণ। আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদ ও সরকার। এতে একদিকে কারিগরি দক্ষতা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিও বজায় থাকবে।

প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে সরকার মূল্য নির্ধারণ করবে, নাকি বাজার মূল্য নির্ধারণ করবে। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, কীভাবে এমন একটি মূল্য নির্ধারণব্যবস্থা তৈরি করা যায়, যা একই সঙ্গে রোগীর ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করবে, ওষুধশিল্পের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করবে, সুস্থ বাজার প্রতিযোগিতা উৎসাহিত করবে এবং অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করবে।

নতুন অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘কোন ওষুধকে অত্যাবশ্যকীয় বলা হবে?’ কোনো ওষুধ বেশি বিক্রি হয় বা বেশি ব্যবহৃত হয় বলেই তাকে অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে তালিকাভুক্ত করা উচিত নয়। এখানে রোগের প্রকোপ, মৃত্যুঝুঁকি ও রোগজনিত অক্ষমতা, চিকিৎসায় ওষুধটির অপরিহার্যতা, কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার প্রমাণ, বিকল্প চিকিৎসার প্রাপ্যতা, কস্ট-ইফেক্টিভনেস এবং রোগীর আর্থিক বোঝা—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসা নির্দেশিকায় ওষুধটির অবস্থান এবং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এর কৌশলগত গুরুত্বও বিবেচনায় আনতে হবে।

‘অত্যাবশ্যকীয়’ আর ‘জনপ্রিয়’—এই দুটিকে আলাদা করে দেখা দরকার। কোনো ওষুধের বাজার বড় হতে পারে, কিন্তু সেটি অত্যাবশ্যকীয় নাও হতে পারে। আবার কোনো ওষুধের বাজার তুলনামূলক ছোট হলেও নির্দিষ্ট জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসায় সেটি অপরিহার্য হতে পারে। তাই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হতে হবে জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকার এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণভিত্তিক—বাজারচাহিদা বা অতীতের প্রচলনের ভিত্তিতে নয়।

তবে কেবল জেনেরিক নাম নির্ধারণ করাও যথেষ্ট নয়। কোন ফর্মুলেশন প্রয়োজন, কোন স্ট্রেংথ প্রয়োজন, শিশুদের জন্য কোন ডোজেজ ফর্ম প্রয়োজন এবং হাসপাতালে ব্যবহারের জন্য কোন ফরমুলেশন প্রয়োজন—এসব বিষয়ও নির্ধারণ করতে হবে। কারণ, একটি জেনেরিক নাম তালিকাভুক্ত থাকলেই রোগীর প্রয়োজনীয় ওষুধ বাস্তবে নিশ্চিত হয় না।

মূল্য নির্ধারণেও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি দরকার। ১৯৯৪ সালের কস্ট-প্লাস ফর্মুলা সে সময়ের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কার্যকর হতে পারে। কিন্তু বর্তমান বাজারব্যবস্থা অনেক বেশি জটিল। শুধু কাঁচামালের মূল্য ও একটি নির্দিষ্ট মার্কআপ যোগ করে ওষুধের মূল্য নির্ধারণ এখন আর যথেষ্ট নয়। উৎপাদন ব্যয়, বিনিময় হার, কাঁচামালের দাম এবং সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত মূল্য পর্যালোচনা করা জরুরি।

বাংলাদেশের প্রশাসনিক বাস্তবতায় সময়মতো মূল্য সমন্বয় করা কঠিন। যেহেতু সরকারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওষুধের মূল্য নির্ধারিত হয়, তাই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক বিবেচনার কারণে প্রয়োজনীয় মূল্য সমন্বয় বিলম্বিত হতে পারে। এর সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে ভারতের মডেলের আদলে একটি স্বাধীন ন্যাশনাল ড্রাগ প্রাইসিং অথরিটি বা জাতীয় ওষুধ মূল্য নির্ধারণ কর্তৃপক্ষ গঠনের কথা বলা যেতে পারে। একটি বিশেষায়িত ও পেশাদার কর্তৃপক্ষ সুস্পষ্ট নীতিমালা, উৎপাদন ব্যয়ের তথ্য এবং বাজার তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত মূল্য পর্যালোচনা করতে পারে। একটি সুস্পষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে যুক্তিসংগত মাত্রার কার্যকর স্বাধীনতা থাকলে মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপও কিছুটা কমতে পারে।

তবে এর বিপরীত যুক্তিও বিবেচনায় রাখা দরকার। নতুন একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন করলে ওষুধ কোম্পানিগুলোকে আরও একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এতে কোম্পানিগুলোর প্রশাসনিক ও কমপ্লায়েন্স ব্যয় বাড়তে পারে, যার একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ওষুধের দামের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই কেবল নতুন একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করলেই যে ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হবে—এমন ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির একটি অবস্থানও আছে। তাদের মতে, অন্যান্য বাণিজ্যিক পণ্যের মতো ওষুধের মূল্যও মূলত উৎপাদনকারীদের ওপর ছেড়ে দিয়ে বাজার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা যেতে পারে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে প্রতিষ্ঠানগুলোকে একদিকে ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা ও বাজারচাহিদা বিবেচনা করতে হবে, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় ও ব্যবসার স্থায়িত্বও নিশ্চিত করতে হবে। এতে প্রতিটি ওষুধের মূল্য নির্ধারণ বা মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি দায়িত্ব সরকারের ওপরও থাকবে না।

কিন্তু ওষুধ সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্য নয়। এটি একই সঙ্গে একটি অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্যপণ্য এবং অনেক ক্ষেত্রে জীবন রক্ষাকারী পণ্য। ফলে ওষুধের মূল্য পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে রোগীর ওপর অতিরিক্ত দামের চাপ তৈরির ঝুঁকি থাকে। আবার অতিরিক্ত মূল্য নিয়ন্ত্রণ উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারে। তাই মূল প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে সরকার মূল্য নির্ধারণ করবে, নাকি বাজার মূল্য নির্ধারণ করবে। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—কীভাবে এমন একটি মূল্য নির্ধারণব্যবস্থা তৈরি করা যায়, যা একই সঙ্গে রোগীর ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করবে, ওষুধশিল্পের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করবে, সুস্থ বাজার প্রতিযোগিতা উৎসাহিত করবে এবং অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করবে।

২০২৬ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণপদ্ধতি বাতিলের ঘটনা যেন আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী নীতিগত অনিশ্চয়তায় পরিণত না হয়। বরং এটিকে পুরো কাঠামোটি নতুন করে ভাবার সুযোগ হিসেবে নিতে হবে। বাংলাদেশকে একটি পুরোনো ও অকার্যকর ব্যবস্থার বাইরে এসে প্রমাণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে আধুনিক ওষুধনীতি গড়ে তুলতে হবে। নতুন কাঠামোতে একই সঙ্গে ওষুধের জনস্বাস্থ্যগত গুরুত্ব এবং ওষুধ উৎপাদনের অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিতে হবে।