পাঁচ বছর আগে বিজয়ীর বেশে কাবুলে প্রবেশ করেছিল তালেবান। এর প্রায় ২০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর পতন হয়েছিল তাদের প্রথম সরকারের। ২০২১ সালে যখন তালেবান পুনরায় ক্ষমতা দখল করে, তখন তড়িঘড়ি করে আফগানিস্তান ছাড়ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের সেনারা। সেই সময়ের চরম বিশৃঙ্খলার মাঝে বোমা হামলায় প্রায় ২০০ আফগান প্রাণ হারান।

তবে বর্তমান কাবুলের দৃশ্যপট অনেকটাই ভিন্ন। বোমা হামলা ঠেকাতে যে শক্ত দেয়াল, কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা আর অস্ত্রধারীদের যান চলাচলে বাধা দেওয়ার সংস্কৃতি ছিল, তা এখন আর আগের মতো নেই। শহরটি এখন অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন ও শান্ত; স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে কাবুল। তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পূর্তিতে তাই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন—তারা কী অর্জন করেছে, কোথায় ব্যর্থ হয়েছে এবং সামনে তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে।

তালেবানের প্রথম শাসনামলের অন্যতম বড় ব্যর্থতা ছিল পুরো আফগানিস্তান দখল করতে না পারা। যেসব প্রদেশ তাদের প্রতিরোধ করেছিল, পরবর্তীতে সেগুলোই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের তালেবানবিরোধী লড়াইয়ের ঘাঁটিতে পরিণত হয়। তবে এবার তারা সেই ভুল করেনি। পুরো দেশ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পাশাপাশি তুলনামূলক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে তারা। যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সরকারের শেষ বছরগুলোতে ইসলামিক স্টেট-খোরাসান প্রদেশের যে হুমকি ছিল, সেটিও তারা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করেছে।

বর্তমানে বড় কোনো বিদ্রোহী চ্যালেঞ্জ নেই। আফগান নাগরিকরা এখন দেশের এমন অনেক এলাকায় যাতায়াত করতে পারছেন, যেখানে আগে যাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। দীর্ঘ সংঘাতের ইতিহাসে এটিকে তালেবানের একটি বড় অর্জন হিসেবে গণ্য করা যায়।

অর্থনীতির চিত্রটি বেশ জটিল। ক্ষমতায় ফেরার আগের দুই দশকে আফগান অর্থনীতি আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল, পাশাপাশি দুর্নীতি ও নিরাপত্তাহীনতা একে দুর্বল করেছিল। ২০২১ সালে বিদেশি সহায়তা হঠাৎ কমে যাওয়ায় বড় ধাক্কা এলেও তালেবান অর্থনীতিকে সচল রাখতে পেরেছে। নিরাপত্তার উন্নতিতে ব্যবসা ও প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ বেড়েছে। দেশে ফেরা শরণার্থীরা পুঁজি নিয়ে এসেছেন এবং কেউ কেউ ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। কর ও শুল্ক আদায়ের পাশাপাশি বিদেশে থাকা আফগানরা প্রতিবছর কয়েক বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠাচ্ছেন।

প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উন্নত সম্পর্ক ও বাণিজ্যও সহায়ক হয়েছে। তালেবান বর্তমানে কোশ তেপা খাল, তুর্কমেনিস্তান-আফগানিস্তান-পাকিস্তান-ভারত গ্যাস পাইপলাইন এবং উজবেকিস্তানের সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের মতো বড় প্রকল্পে কাজ করছে। এছাড়া সড়ক ও অন্যান্য নির্মাণকাজ চলছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে। তবে সরকারি অর্থব্যবস্থায় স্বচ্ছতার অভাব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতে অনীহা রয়ে গেছে। ফলে জবাবদিহি ও দুর্নীতির মতো কাঠামোগত সমস্যা মোকাবিলায় সরকার দুর্বল।

তালেবানের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ধরা দিয়েছে সামাজিক নীতিতে। গত পাঁচ বছরে একের পর এক আদেশের মাধ্যমে নারী ও মেয়েদের অধিকার সীমিত করা হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের আধুনিক আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে আফগানিস্তান বিশ্বের সবচেয়ে চরম লিঙ্গবৈষম্যের উদাহরণগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। এর অর্থনৈতিক মূল্যও অনেক বেশি; নারী চিকিৎসক, শিক্ষক ও অন্যান্য পেশাজীবীর তীব্র ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। অথচ যে কাজগুলোতে নারীদের প্রয়োজন, সেই প্রশিক্ষণের সুযোগই তাঁদের দেওয়া হচ্ছে না।

সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যোগ্য শিক্ষক ধরে রাখার বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে বরং ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ানো হচ্ছে। ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব থাকলেও তা আধুনিক শিক্ষার বিকল্প হতে পারে না। এর পাশাপাশি বেড়েছে নৈতিক পুলিশিং। নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবনের অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে, যা সরকার ও জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করছে।

তালেবান সরকারকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতেও ব্যর্থ হতে হয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে সরিয়ে দিয়েছেন। দোহা চুক্তিতে আলোচনাকারী ও স্বাক্ষরকারীদের অনেকে গুরুত্বপূর্ণ পদ হারিয়েছেন। ফলে ক্ষমতা একজন নেতার হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, যা শাসনব্যবস্থাকে ধীর করে দিয়েছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অল্প কয়েকজনের দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি। প্রতিবেশী ও কিছু ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সম্পর্ক থাকলেও আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এখনো অধরা। নারীশিক্ষা ও অধিকারের ওপর বিধিনিষেধ বহাল থাকলে এই বিচ্ছিন্নতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

বর্তমানে তালেবানের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো সামরিক হুমকি নেই এবং রাজনৈতিক বিরোধীরা বিভক্ত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও সামরিকভাবে সরকার পরিবর্তনের আগ্রহ বা সামর্থ্য নেই। তাই তাৎক্ষণিক সামরিক হুমকির চেয়ে ধীরে ধীরে জমতে থাকা জনঅসন্তোষই হতে পারে তালেবানের জন্য বড় বিপদ। কোনো সরকার দীর্ঘকাল বিরোধিতার মধ্যেও টিকে থাকতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষ যখন সরকারের প্রতি এতটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যে তাকে দুর্বল করতে চাওয়া শক্তিগুলোর প্রতি আর উদ্বিগ্ন থাকে না, তখন সরকার ঝুঁকিতে পড়ে। সেই শক্তি বিদেশি রাষ্ট্র কিংবা অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহী গোষ্ঠী—যেকোনোটি হতে পারে।

পাঁচ বছর পর তালেবান আফগানিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলেও তারা এখনো মৌলিক প্রশ্নটির উত্তর দিতে পারেনি—তারা আসলে কী ধরনের রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায়। আন্তর্জাতিক ও জনবিচ্ছিন্নতা ভবিষ্যতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তালেবানের ভেতরে কেউ কেউ তা বুঝতে পারলেও, তারা কি ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পরিবর্তনের পথ খুলবেন? কোনো না কোনো জায়গায় পরিবর্তন আসতেই হবে।

— ওবাইদুল্লাহ বাহির, আফগানিস্তানের আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচার বিষয়ের শিক্ষক।