বিরিয়ানি বললেই অনেকের মনে প্রথমে আসে সুগন্ধি বাসমতী চাল, নরম মাংস আর ঝরঝরে ভাতের কথা। তবে কলকাতা স্টাইলের বিরিয়ানির গল্প একটু আলাদা। এখানে মসলার ঝাঁজ তুলনামূলক কম, কিন্তু ঘি, কেওড়া, জাফরান ও গোটা মসলার সুবাস থাকে বেশ স্পষ্ট। আর এই বিরিয়ানির সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্য হলো বড় আকারের আলু ও সেদ্ধ ডিম।
কলকাতা বিরিয়ানির শিকড় উনিশ শতকের কলকাতায়। আওধের নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ কলকাতায় নির্বাসিত হওয়ার পর তাঁর সঙ্গে আসা রাঁধুনিদের হাত ধরে কলকাতায় আওধি বিরিয়ানির একটি নিজস্ব ধারা গড়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে স্থানীয় উপকরণ ও বাঙালি স্বাদের প্রভাব পড়ে এই বিরিয়ানিতে। মাংসের পাশাপাশি আলু যোগ হওয়া সেই পরিবর্তনের অন্যতম পরিচিত উদাহরণ। আজ কলকাতা বিরিয়ানি শুধু কলকাতাতেই নয়, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় বেশ জনপ্রিয়।
পরিবেশন: ৫ থেকে ৬ জন
প্রস্তুতির সময়: ৩০ মিনিট
মেরিনেট করার সময়: ১ থেকে ২ ঘণ্টা
রান্নার সময়: ১ ঘণ্টা ১৫ মিনিট
উপকরণ তালিকা
মুরগির জন্য:
মুরগি ১ কেজি (বড় টুকরা), টক দই আধা কাপ, আদা বাটা ১ টেবিল চামচ, রসুন বাটা ১ টেবিল চামচ, লাল মরিচের গুঁড়া আধা চা চামচ, হলুদের গুঁড়া আধা চা চামচ, গরম মসলার গুঁড়া আধা চা চামচ, লবণ স্বাদমতো এবং লেবুর রস ১ টেবিল চামচ।
চালের জন্য:
বাসমতী বা লম্বা দানার সুগন্ধি চাল ৫০০ গ্রাম, পানি প্রয়োজনমতো, লবণ ১ টেবিল চামচ, তেজপাতা ২টি, দারুচিনি ২ টুকরা, এলাচ ৪টি, লবঙ্গ ৪টি, শাহি জিরা ১ চা চামচ এবং সামান্য ঘি।
আলু ও ডিমের জন্য:
বড় আলু ৪টি, ডিম ৪টি, হলুদের গুঁড়া সামান্য, লবণ সামান্য এবং ভাজার জন্য তেল।
বিরিয়ানির মসলার জন্য:
পেঁয়াজ ৩টি (পাতলা করে কাটা), ঘি ৪ টেবিল চামচ, সয়াবিন তেল ৩ টেবিল চামচ, শাহি জিরা আধা চা চামচ, গোলাপজল ১ চা চামচ, কেওড়া জল ১ চা চামচ, জাফরান সামান্য, জাফরান ভেজানোর জন্য ২ টেবিল চামচ গরম দুধ, চিনি আধা চা চামচ এবং লবণ প্রয়োজনমতো।
সাজানোর জন্য:
বেরেস্তা আধা কাপ, ধনেপাতা কুচি সামান্য, পুদিনাপাতা সামান্য এবং ইচ্ছা হলে আলুবোখারা ৪ থেকে ৫টি।
প্রস্তুত প্রণালী
প্রথমে মুরগির টুকরোগুলো ভালোভাবে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিন। একটি বড় বাটিতে মুরগির সঙ্গে টক দই, আদা বাটা, রসুন বাটা, হলুদ, মরিচের গুঁড়া, গরম মসলার গুঁড়া, লেবুর রস ও লবণ মিশিয়ে নিন। মাংস ভালোভাবে মাখিয়ে ঢেকে অন্তত ১ থেকে ২ ঘণ্টা ফ্রিজে রেখে দিন। সময় বেশি থাকলে ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত মেরিনেট করতে পারেন।
এরপর আলু খোসা ছাড়িয়ে বড় দুই ভাগে কাটুন। একটি প্যানে তেল গরম করে আলুতে সামান্য হলুদ ও লবণ মাখিয়ে হালকা সোনালি করে ভেজে নিন। আলু পুরোপুরি সেদ্ধ করার প্রয়োজন নেই। ডিম সেদ্ধ করে খোসা ছাড়িয়ে সামান্য হলুদ ও লবণ মাখিয়ে একই প্যানে হালকা করে ভেজে তুলে রাখুন।
পাতলা করে কাটা পেঁয়াজ তেলে মাঝারি আঁচে ভাজুন। পেঁয়াজ সোনালি ও মচমচে হয়ে গেলে তুলে টিস্যুর ওপর রাখুন। পেঁয়াজ বেশি কালো করবেন না, কারণ বেশি পুড়ে গেলে বিরিয়ানির স্বাদ তিতকুটে হতে পারে।
চাল ভালোভাবে ধুয়ে ২০ থেকে ৩০ মিনিট পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। একটি বড় হাঁড়িতে পর্যাপ্ত পানি ফুটিয়ে তাতে লবণ, তেজপাতা, দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ ও শাহি জিরা দিন। চাল দিয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ সেদ্ধ করুন। চালের দানা বাইরে নরম হলেও ভেতরে সামান্য শক্ত থাকবে। এই পর্যায়ে চাল নামিয়ে পানি ঝরিয়ে রাখুন।
একটি ভারী তলার হাঁড়িতে ঘি ও সামান্য তেল গরম করে দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ, তেজপাতা ও শাহি জিরা দিয়ে ফোড়ন দিন। এবার মেরিনেট করা মুরগি দিয়ে মাঝারি আঁচে ভালোভাবে কষিয়ে নিন। মুরগি থেকে পানি বের হলে ঢেকে ১৫ থেকে ২০ মিনিট রান্না করুন। মুরগি প্রায় সেদ্ধ হয়ে এলে ভাজা আলুগুলো দিয়ে দিন। প্রয়োজনে অল্প গরম পানি যোগ করুন। মুরগি ও আলু পুরোপুরি সেদ্ধ হয়ে গেলে চুলা বন্ধ করুন।
এবার দমের পালা। মুরগি ও আলুর ওপর অর্ধেক সেদ্ধ চালের একটি স্তর দিন। এর ওপর কিছু বেরেস্তা, ধনেপাতা ও পুদিনাপাতা ছড়িয়ে দিন। এরপর বাকি চাল দিয়ে আবার একটি স্তর তৈরি করুন। উপরে জাফরান মেশানো দুধ, ঘি, গোলাপজল, কেওড়া জল ও সামান্য চিনি ছড়িয়ে দিন। সবশেষে সেদ্ধ ডিম ও বাকি বেরেস্তা সাজিয়ে দিন।
হাঁড়ির মুখ শক্তভাবে ঢেকে দিন; চাইলে ঢাকনার নিচে পরিষ্কার কাপড় ব্যবহার করতে পারেন। প্রথমে ৫ মিনিট মাঝারি আঁচে এবং এরপর ২০ থেকে ২৫ মিনিট একেবারে কম আঁচে দম দিন। চুলা বন্ধ করার পর আরও ১০ মিনিট ঢাকনা খুলবেন না। এরপর নিচ থেকে আলতোভাবে ভাত ও মাংস মিশিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।
পারফেক্ট বিরিয়ানির কিছু টিপস
কলকাতা বিরিয়ানির আলু সাধারণত বড় টুকরার হয়, তাই আলু বড় করে কাটুন; ছোট করে কাটলে দমে ভেঙে যেতে পারে। দমের সময় চাল আরও সেদ্ধ হবে, তাই চাল ৭০ শতাংশের বেশি সেদ্ধ করা উচিত নয়। এই বিরিয়ানির স্বাদ ঝাল বা মসলাদার করার চেয়ে সুগন্ধি রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাই মসলা বেশি দেবেন না। কেওড়া জল অল্প ব্যবহার করুন, কারণ বেশি দিলে এর তীব্র ঘ্রাণ অন্য সব স্বাদ ঢেকে দিতে পারে। দমের সময় আঁচ খুব কম রাখুন, অন্যথায় নিচের অংশ পুড়ে যেতে পারে এবং ভাতের সুগন্ধ নষ্ট হতে পারে। চুলা বন্ধ করার পর অন্তত ১০ মিনিট রেখে দিলে ভাতের দানা আরও সুন্দর হয় এবং মাংসের সঙ্গে মসলার স্বাদ ভালোভাবে মিশে যায়।
পরিবেশন
শাহি কলকাতা চিকেন বিরিয়ানি আলু ও ডিমসহ গরম গরম পরিবেশন করাই সবচেয়ে ভালো। সঙ্গে শসা, পেঁয়াজ ও টমেটোর সালাদ রাখতে পারেন। আরও জমকালো আয়োজন করতে চাইলে সঙ্গে বোরহানি, রায়তা কিংবা হালকা টক-মিষ্টি চাটনি পরিবেশন করা যায়।