ফেনী জেলার ৫৫৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩২৮টি প্রতিষ্ঠানেই নেই কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক। প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও পাঠদানের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত এই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দীর্ঘকাল শূন্য থাকায় জেলার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকদের একই সঙ্গে দাপ্তরিক কাজ এবং শ্রেণিকক্ষের পাঠদান সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার গুণগত মানের ওপর।
ফেনী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উপজেলা পর্যায়ে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদের হার সবচেয়ে বেশি সোনাগাজী ও ফেনী সদরে। সোনাগাজীর ১১০টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৭৫টিতেই প্রধান শিক্ষক নেই। ফেনী সদর উপজেলার ১৫১টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৭৬টি পদ শূন্য। এছাড়া ফুলগাজীর ৬৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪৫টি, ছাগলনাইয়ায় ৭৮টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৯টি, দাগনভূঞায় ১০২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫৯টি এবং পরশুরামের ৫১টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৪টি প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। ফলে পুরো জেলার অর্ধেকের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকদের মাধ্যমে বছরের পর বছর প্রতিষ্ঠান চালানো কোনো টেকসই সমাধান নয়, বরং এটি প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তিকে দুর্বল করছে। একজন সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ায় তিনি নির্ধারিত ক্লাসগুলো ঠিকমতো নিতে পারছেন না, যা অন্যান্য শিক্ষকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি নিয়মিত ক্লাস নিতে গিয়ে তারা হিমশিম খাচ্ছেন, যার ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়া প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষা এবং একাডেমিক তদারকি শিথিল হয়ে পড়েছে। দ্রুত স্থায়ী নিয়োগ বা পদোন্নতি না হলে এই স্থবিরতা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সিনিয়র সভাপতি এবং দাগনভূঞা উপজেলার এনায়েতনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রাজেশ মজুমদার মুক্তকণ্ঠকে জানান, "বিগত ২০০৯ সালের পর থেকেই প্রধান শিক্ষক পদে পদায়ন বন্ধ রয়েছে। এক্ষেত্রে অনেক জুনিয়র শিক্ষককে প্রধান শিক্ষক পদে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাদের কোনো প্রধান শিক্ষক পদের মৌলিক ট্রেনিং নেই। নিয়মিত শিক্ষককে প্রধান শিক্ষকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই স্কুলগুলো হিমশিম খাচ্ছে। আমরা আশা করব গ্রেডেশনের মাধ্যমে পদোন্নতির তালিকা তৈরি করে দ্রুত প্রধান শিক্ষক পদে জনবল নিয়োগ করা হোক।"
সরিষাদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি ফেনী সদর উপজেলা শাখার সভাপতি মনসুর মেহেদী হাসান মুক্তকণ্ঠকে জানান, "আসলে দীর্ঘদিন যাবৎ প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। যার কারণে স্কুলগুলো নানাভাবে সমস্যার সম্মুখীন। সরকারের কাছে আশা থাকবে স্কুলগুলোতে দ্রুত প্রধান শিক্ষক পদে জনবল নিয়োগ করে শূন্যতা পূরণ করা হোক।"
ফেনী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হৃষীকেশ শীল মুক্তকণ্ঠকে জানান, "জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের পদোন্নতি নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ একটি মামলা চলমান ছিল। যার কারণে প্রধান শিক্ষক পদে কোনো পদায়ন হয়নি। বর্তমানে মামলাটির নিষ্পত্তি হয়েছে বলে জানি। আশা করছি সহসাই এ বিষয়ে নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হবে। দ্রুত প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ সম্পন্ন হলে স্কুলগুলো গতি পাবে। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে জেলার শূন্য পদের তালিকা ও সার্বিক পরিস্থিতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।"