তাঁর ব্যাটিংয়ের ধরন দেখে কখনো কখনো আপনার মনে হতে পারে, ‘সাদামাটা’। প্রায়ই তাঁর বোলিংও মনে হয় ধারহীন। কেন দলে আছেন—সে প্রশ্ন তো সাদা বলের ক্রিকেটে এখন শোনা যায় জোরেশোরেই, লাল বলের ক্রিকেটে আওয়াজটা একটু কম হলেও প্রায়ই বিদ্ধ হন সমালোচনার তিরে।
তবু মেহেদী হাসান মিরাজ কেন দলে থাকেন? কারণ, বিপদে লড়ে যেতে পারেন সবটুকু দিয়ে। কেমন বিপদ? ধরুন, ২৬ রানে ৬ উইকেট নেই। ম্যাচের প্রায় সব সম্ভাবনা শেষ। কিন্তু মিরাজ তা বিশ্বাস করেন না। ‘শেষ’ বলে তাঁর কাছে হয়তো নেই কিছুই।
.একটা ওভারের পাঁচটা বল হয়তো ঠিকঠাক ব্যাটে লাগাতে পারেননি, কিন্তু ষষ্ঠ বলটা খেলতেও দ্বিধাহীন। মিরাজ তাই লড়াই করতে চান, রাওয়ালপিন্ডিতে লিটন দাসের সঙ্গী হন; দুজন মিলে অবিশ্বাস্যভাবে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটা জিতিয়েও দেন।
এমন গল্প তাঁর আছে অনেকই। কিন্তু যদি লিটন দাসকেও না পাওয়া যায়, তবু? হ্যাঁ, অন্তত মিরাজের অসুবিধা নেই। ডারউইন টেস্টের কথাই ধরুন। তানজিদ হাসানের সেঞ্চুরি আর নাজমুল হোসেনের ব্যাটে দুর্দান্ত একটা শুরু বাংলাদেশ পেয়েছিল ঠিকই।
কিন্তু হুট করেই একটা বিপদ চলে এসেছিল। অস্ট্রেলিয়া নতুন বলটা নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নাজমুল হোসেন আউট হন, মুশফিকুর রহিম ও লিটন দাসও ওই পথ ধরেন তাঁর পিছু পিছু। ১১ রানের ভেতর ৩ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ ভীষণ বিপদে।
.বিপদ? মিরাজের খুব প্রিয় সময় তা। শুরুটা যতই ভালো হোক, লিডটা দুই শ পার না করলে বিপদ থেকেই যায়। ম্যাচ শেষে পেছনে ফিরে চিন্তা করলে হয়তো আরও স্পষ্ট বুঝতে পারবেন। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ১০০ রান কম করলে কিন্তু লক্ষ্যটা ১৫৬–এর ওপাশে চলে যেত।
তা যে হলো না, হাসান মাহমুদ–তাইজুল ইসলাম–তাসকিন আহমেদ কিংবা ইবাদত হোসেনকে ধন্যবাদ দিয়ে রাখতে পারেন। মিরাজের জন্য বোধ হয় তা আর আলাদা করে দরকার নেই, কারণ তিনি তো বাংলাদেশের সব সময়ের বিপদের বন্ধুই।
.ডারউইনে বাংলাদেশের ইতিহাস, চার দিনেই টেস্ট জয়.যখন টেল এন্ডারদের সঙ্গে লড়াইটা শুরু করেন, তখন বাংলাদেশের এগিয়ে ছিল ১০৬ রানে। পরে তাতে যোগ হয়েছে আরও ১২২ রান। মিরাজ নিজে ১৫৪ বল খেলে ৬৫ রান করেছেন ঠিক, কিন্তু এসব সংখ্যা কীভাবে বোঝাবে—লড়াইটা কত কঠিন ছিল তাঁর জন্য। এসব লড়াইয়ে অবশ্য অভ্যস্ত অনেক দিন ধরেই। তাঁর অভিষেকের পর থেকে ৭ কিংবা এর পরে নেমে কেউ মিরাজের চেয়ে বেশি রান করেননি টেস্টে।
শুধু কি ব্যাট হাতে? বিপদ তো বিপদই, যখন মনে হয়, চলে আসে তখনই। মিরাজ তখনো এসে সামনে দাঁড়ান প্রায়ই। স্বীকার করে নেওয়া ভালো, এশিয়ার বাইরে এত দিন তা খুব একটা পারেননি। দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ডে আগের ৮ টেস্টে ১৯ উইকেট নিয়েছিলেন ৬১.২ গড়ে।
.কিন্তু অস্ট্রেলিয়াতে এসে সেই ভাগ্যও বদলে দিলেন। প্রথম ইনিংসে বোলিংয়ের সময় তেমন কোনো পরীক্ষা আসেনি। তিন পেসারই ভাগাভাগি করে নেন সব উইকেট। কিন্তু এক ভুল তো অস্ট্রেলিয়া দুবার করবে না।
দ্বিতীয় ইনিংসে তাই বিপদ উঁকি দিল। স্টিভেন স্মিথ থিতু হতে থাকলেন উইকেট—তিনি তা হয়ে গেলে পরের গল্পটা কী হবে, তা আলাদা করে বলার দরকার হয় না কখনো। বাংলাদেশের বিপদ বুঝি আসন্ন!
.ডারউইন টেস্ট: অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস.বিপদ? মিরাজ এগিয়ে গেলেন আবার। টানা তাঁকে আটকে রাখলেন। রানের জন্য হাঁসফাঁস করতে থাকা স্মিথ একটু মনঃসংযোগ হারিয়ে বলটা হাওয়ায় ভাসিয়েই দিলেন। মিরাজ ঝাপিয়ে পড়ে ক্যাচটা ধরলেন নিজের বলেই। আরও একবার বিপদ কাটানো গেল!
তবু অনিশ্চয়তা নিয়ে শেষ হলো বাংলাদেশের তৃতীয় দিন। ক্যামেরন গ্রিন আর অ্যালেক্স ক্যারি মিলে জুটি বেঁধেছেন। লিডটা কোনো রকম দেড় শ পার করে বাংলাদেশকে ‘বিপদে’ ফেলা যায় কি না, তাঁদের লক্ষ্য হলো তা–ই।
.মিরাজ চতুর্থ দিনে বলটা যে হাতে নিলেন, আর ছাড়লেনই না। ২০ ওভারের দীর্ঘ একটা স্পেল করলেন। গ্রিন আর ক্যারির ৫৬ রানের জুটি ভাঙলেন। ওয়েবস্টারকে যে বলে বোল্ড করলেন—অফ স্পিনারদের জন্য স্বপ্ন। প্যাট কামিন্স তাঁর বলে ক্যাচ দিলেন।
শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে নাথান লায়নকে আউট করে পেলেন ৫ উইকেট। কাজটা কতটা কঠিন? দুটো সংখ্যার গল্প বললে বুঝতে কিছুটা সুবিধা হবে। ২০১৯ সালে কুলদ্বীপ যাদবের পর অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে আর কোনো স্পিনার পাঁচ উইকেট পাননি। অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে সর্বশেষ ৫ উইকেট পেয়েছিলেন রঙ্গনা হেরাথ, তাও ২০১২ সালে!
.এসব সংখ্যা ছাপিয়েও মিরাজের বল হাতের এই ইনিংসটা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে যেকোনো বোলারের জন্য ক্ল্যাসিক একটা উদাহরণ হয়ে থাকবে, হয়তো জায়গা পাবে স্পিনারদের সেরা পারফরম্যান্সের ছোট্ট তালিকাতেও।
এমনিতে টেস্টে নিজেকে একটা আলাদা উচ্চতায় মিরাজ নিয়ে গিয়েছিলেন আগেই। মিরাজের অভিষেকের পর থেকে বাংলাদেশ জিতেছে, এমন টেস্টে সবচেয়ে বেশি (৯৯) উইকেট তাঁর। সবচেয়ে বেশি রানের তালিকাতেও আছেন শীর্ষ পাঁচে।
.বাংলাদেশের টেস্ট জেতায় সবচেয়ে বেশি ‘অবদান’ রাখার এই স্বীকৃতি মিরাজ হয়তো পেয়ে যাবেন কখনো কখনো। তাঁকে সঙ্গে আরও একটা পুরস্কারও দেওয়া যেতে পারে— বাংলাদেশ ক্রিকেটের বিপদের বন্ধু। ডারউইনেও তো তিনি বাংলাদেশকে জেতালেন আরও একবার। আর অস্ট্র্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকেই হারানোর এই অর্জন কতটা বড়, তা না বললেও চলে।
চিরস্মরণীয়! বাংলাদেশ ক্রিকেটে মিরাজও হয়ে গেলেন ঠিক সেটাই। অস্ট্রেলিয়াও কি মনে রাখবে না?