অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক টেস্ট জয়কে শুধু অঘটন হিসেবে দেখছে না দেশটির সংবাদমাধ্যম। নাজমুল হোসেন শান্তর দলের ধৈর্য, শৃঙ্খলা ও পরিকল্পনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ তারা। বিপরীতে ঘরের মাঠে পূর্ণ শক্তির অস্ট্রেলিয়ার ৯ উইকেটের পরাজয়কে বলা হচ্ছে ‘অপমানজনক’ ও ‘বিব্রতকর’।

ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার ওয়েবসাইটের শিরোনাম, ‘অস্ট্রেলিয়াকে ঐতিহাসিক টেস্ট ধোলাই উদ্‌যাপন বাংলাদেশের।’ তাদের প্রতিবেদনে ডারউনের এই জয়কে টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। লেখা হয়েছে, আগামী ১২ মাসে ২০ টেস্টের কঠিন যাত্রার শুরুতেই বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে অস্ট্রেলিয়া।

প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশের জয়কে স্বাগতিকদের ব্যর্থতার ফল হিসেবে দেখানো হয়নি। বরং হাসান মাহমুদের পেস, তানজিদ হাসান তামিমের শতক, মেহেদী হাসান মিরাজের অলরাউন্ড নৈপুণ্য এবং পুরো দলের ধৈর্যশীল ক্রিকেটের প্রশংসা করা হয়েছে। তাদের মতে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রায় ৪০ বছরের পথচলায় এটিই সম্ভবত সবচেয়ে বড় মুহূর্ত।

বাংলাদেশের ম্যাচসেরা হাসানের ৯ উইকেটের পারফরম্যান্সও আলাদা করে তুলে ধরেছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। তাদের হিসাবে, গত ১৫ বছরে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে জাসপ্রিত বুমরাহ ছাড়া কোনো সফরকারী বোলারের সেরা ম্যাচ বোলিং এটি।

নিউজ ডটকম অস্ট্রেলিয়া সরাসরি লিখেছে, ‘ডারউনে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ে অপমানিত অস্ট্রেলিয়া।’ তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যামেরন গ্রিনের শতক শুধু পরাজয় কিছুটা বিলম্বিত করেছে। ম্যাচের অধিকাংশ সময়ই কোনো জবাব খুঁজে পায়নি প্যাট কামিন্সের দল। এই হারের পর অস্ট্রেলিয়ার একাদশ, বিশেষ করে টপ অর্ডারে পরিবর্তনের দাবিও সামনে এসেছে।

‘বিব্রতকর’ শব্দটি ব্যবহার করেছে নাইন। তাদের শিরোনাম, ‘বিব্রতকর, ৯ উইকেটের অপমানজনক অঘটনের শিকার অস্ট্রেলিয়া।’ সংবাদমাধ্যমটি ডারউনের ফলকে অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম অপমানজনক পরাজয় হিসেবে বর্ণনা করেছে।

ফক্স স্পোর্টসের শিরোনামেও অস্ট্রেলিয়ার লজ্জার কথাই এসেছে। তারা লিখেছে, ‘অস্ট্রেলিয়াকে বিব্রত করে টেস্ট ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ।’ প্রতিবেদনে ক্যামেরন গ্রিনের শতকের প্রশংসা থাকলেও বলা হয়েছে, তার ইনিংস বাংলাদেশের দাপুটে জয় ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না।

ফক্স ক্রিকেটের ধারাভাষ্যে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ব্যাটার মার্ক ওয়াহ বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে আমার মনে পড়া সবচেয়ে বড় অঘটন সম্ভবত এটিই। কয়েক বছর আগে গ্যাবায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয়ও অঘটন ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের দুই সেরা বোলার খেলেনি, র‌্যাঙ্কিংয়ের ব্যবধান ছিল এবং অস্ট্রেলিয়া পূর্ণ শক্তির দল নিয়ে নেমেছিল। তাই এই জয় অনেক বড়।’

এবিসি নিউজ আরও গভীরে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট দলের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সামনে এনেছে। তাদের বিশ্লেষণের শিরোনাম, ‘বাংলাদেশের কাছে ধাক্কা দীর্ঘদিন উপেক্ষিত সমস্যার হিসাব চুকিয়ে দিল অস্ট্রেলিয়াকে।’

এবিসির ভাষায়, বিশ্বের নয় নম্বর দলটি তাদের দুই গুরুত্বপূর্ণ পেসারকে ছাড়াই পূর্ণ শক্তির এক নম্বর দলকে নিজেদের মাঠে হারিয়েছে। বাংলাদেশ কোনো জটিল কৌশল নয়, সহজ ও বুদ্ধিদীপ্ত টেস্ট ক্রিকেট খেলেই এই সাফল্য পেয়েছে। বোলিং ছিল নিখুঁত, ব্যাটিং ছিল ধৈর্যশীল ও শৃঙ্খলাবদ্ধ, আর দলের মানসিকতা ছিল অসাধারণ।

শান্তর অধিনায়কত্বও আলাদা করে প্রশংসা করেছে এবিসি। তাদের মতে, পুরো ম্যাচে একের পর এক সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়েও তার দল চাপের কাছে হার মানেনি।

অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং, ফিল্ডিং এবং মানসিকতার সমালোচনা করে সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, দলটির টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থান হয়তো কেবল ওপরের চাকচিক্য। ডারউনের পরাজয় তাদের ভেতরের ফাটলগুলো প্রকাশ করে দিয়েছে। এই ধাক্কাটি অস্ট্রেলিয়ার প্রয়োজন ছিল বলেও মত এবিসির।

অস্ট্রেলীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর মূল্যায়নে একটি জায়গায় মিল রয়েছে। বাংলাদেশকে কেউ জয় উপহার দেয়নি। হাসানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ বোলিং, তানজিদ-শান্তদের ধৈর্যশীল ব্যাটিং এবং মিরাজের অলরাউন্ড নৈপুণ্যেই পুরো ম্যাচে পিছিয়ে পড়েছে স্বাগতিকেরা।

প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেওয়ার পর বাংলাদেশ করেছিল ৪২৬। দ্বিতীয় ইনিংসে স্বাগতিকেরা ২৮৪ রানে থামলে ৫৭ রানের লক্ষ্য এক উইকেট হারিয়েই পেরিয়ে যায় শান্তর দল। আগামী ২২ আগস্ট ম্যাকেতে শুরু হবে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট।