মাত্র আট দিন আগেও ডারউইন বাংলাদেশকে উপহার দিয়েছিল ৫৪ রানের লজ্জা। ৮ আগস্ট ডিএক্সসি অ্যারেনায় ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে ওই রানেই গুটিয়ে গিয়েছিল টাইগাররা। ১৬ আগস্ট একই শহরের মারারা স্টেডিয়ামে দেখা গেল সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি। পূর্ণশক্তির অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে দেশটির মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ।

প্রস্তুতি ম্যাচ ও টেস্টের মাঠ অবশ্য এক নয়। প্রস্তুতি ম্যাচটি হয়েছিল ডিএক্সসি অ্যারেনায়, যেটি মারারা ক্রিকেট গ্রাউন্ড নামেও পরিচিত। আর টেস্ট হয়েছে মারারা স্টেডিয়ামে বা টিআইও স্টেডিয়ামে। দুটি মাঠই মারারা ক্রীড়া কমপ্লেক্সের মধ্যে, তবে খেলার মাঠ আলাদা। ভেন্যু ভিন্ন হলেও কয়েক দিনের ব্যবধানে একই শহরে বাংলাদেশের দুই বিপরীত চেহারাই এই জয়কে দিয়েছে অন্য রকম তাৎপর্য।

সফরের শুরুটা ছিল ভয়াবহ। প্রস্তুতি ম্যাচের প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ করেছিল ২৬৩ রান। জবাবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশ তোলে ৩৫৫। এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যাম্পবেল থম্পসনের বোলিংয়ে মাত্র ২২ ওভারে ৫৪ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ। ২৫ রানে ৮ উইকেট নিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার তরুণ পেসার। ম্যাচটি বাংলাদেশ হেরেছিল ইনিংস ও ৩৮ রানে।

সেই ধসের পর প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজলউড ও নাথান লায়নদের নিয়ে গড়া অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণের সামনে বাংলাদেশ কতটা টিকতে পারবে, তা নিয়েই ছিল সংশয়। তবে ব্যর্থতার মাঝেও প্রস্তুতি ম্যাচে দুটি আশার আলো দেখা গিয়েছিল। ব্যাট হাতে অপরাজিত ১০৯ রান করেছিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ, আর বল হাতে ৪২ রানে ৪ উইকেট নিয়েছিলেন হাসান মাহমুদ। টেস্টে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ের দুই প্রধান কারিগরও হলেন এই দুজন।

মারারা স্টেডিয়ামে টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কামিন্স। তার সেই সিদ্ধান্তকে ভুল প্রমাণ করতে খুব বেশি সময় নেননি বাংলাদেশের পেসাররা। হাসান মাহমুদের ক্যারিয়ারসেরা ৬ উইকেটে মাত্র ১৯৮ রানে গুটিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। স্টিভ স্মিথের ৭১ রানের ইনিংস ছাড়া স্বাগতিকদের আর কেউ বড় প্রতিরোধ গড়তে পারেননি। হাসানের সঙ্গে দুটি করে উইকেট নেন তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেন।

এরপর অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত বোলিং আক্রমণের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিদেশি ইনিংস গড়ে বাংলাদেশ। ক্যারিয়ারের মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নেমে ১০১ রান করেন তানজিদ হাসান তামিম। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট শতকও আসে তার ব্যাট থেকে। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত করেন ৮৪, মিরাজ ৬৫ ও মুমিনুল হক ৪৯ রান। জশ হ্যাজলউড ৬ উইকেট নিলেও বাংলাদেশকে ৪২৬ রানে পৌঁছানো থেকে আটকাতে পারেননি। প্রথম ইনিংসেই ২২৮ রানের বিশাল লিড পায় সফরকারীরা।

দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যামেরন গ্রিনের ১০৪ রানের ইনিংসে লড়াইয়ে ফেরার চেষ্টা করে অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু অন্য প্রান্ত থেকে নিয়মিত উইকেট তুলে স্বাগতিকদের চাপে রাখেন বাংলাদেশের বোলাররা। এবার পেসারদের সঙ্গে ধ্বংসযজ্ঞে যোগ দেন মিরাজ। ধৈর্য ধরে একই জায়গায় বল করে ৬৬ রানে নেন ৫ উইকেট। হাসান আরও ৩ উইকেট নিয়ে ম্যাচে নিজের শিকারসংখ্যা নিয়ে যান ৯-এ। শেষ পর্যন্ত ২৮৪ রানে অলআউট হয় অস্ট্রেলিয়া।

চতুর্থ দিনের মধ্যাহ্ন বিরতিতে মিরাজ বলেছিলেন, ‘এটা আমাদের জন্য বড় সুযোগ। অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে পারলে দেশ ও খেলোয়াড়দের জন্য দারুণ হবে।’ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই সুযোগকে ইতিহাসে পরিণত করে বাংলাদেশ।

জয়ের জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল মাত্র ৫৭ রান। তানজিদকে শূন্য রানে ফিরিয়ে কিছুটা আশা জাগিয়েছিলেন হ্যাজলউড। তবে আর কোনো সুযোগ দেননি মুমিনুল ও শাদমান ইসলাম। দুজনের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে ১৪ দশমিক ২ ওভারেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ। বিউ ওয়েবস্টারকে চার মেরে ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করেন মুমিনুল। তিনি অপরাজিত থাকেন ৩০ রানে, শাদমান করেন অপরাজিত ২৫।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় টেস্ট জয়। প্রথমটি এসেছিল ২০১৭ সালে মিরপুরে, ২০ রানে। তবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এমন সাফল্য এবারই প্রথম।

ডারউইনে বাংলাদেশের অধ্যায় তাই দুই বিপরীত সংখ্যা দিয়ে লেখা হলো। শুরুতে ৫৪ রানের ধস, শেষে ৯ উইকেটের ঐতিহাসিক জয়। মাঠ আলাদা হলেও শহর একই। আর আট দিনের ব্যবধানে লজ্জাকে গৌরবে বদলে দেওয়া দলটিও একই বাংলাদেশ।