বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনের কোনো তফসিল এখনো ঘোষণা করা হয়নি, ভোটের দিন-তারিখও অজানা। তবে মেয়র পদ ঘিরে নগরীর রাজনৈতিক অঙ্গনে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে আগাম লড়াই। কে হবেন দলীয় প্রার্থী, কার ওপর ভরসা রাখবে দল এবং শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠের সমীকরণ কার পক্ষে যাবে—এই প্রশ্নগুলো নিয়ে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতায় তফসিল ঘোষণার আগেই মনোনয়ন দৌড় জমে উঠেছে।

এই প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে বিএনপি। দলটির কেন্দ্রীয় নেতা এবং জেলা ও মহানগরের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা মেয়র পদে মনোনয়ন পেতে আগ্রহী। কেউ প্রকাশ্যে নিজের আগ্রহ প্রকাশ করছেন, আবার কেউ দলীয় সিদ্ধান্তের কথা বলে সম্ভাবনার পথ খোলা রাখছেন।

বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং বামপন্থী দলগুলোও সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে হিসাব কষছে। ফলে নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই বরিশাল নগরীতে শুরু হয়েছে জনসংযোগ ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।

বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন দলের বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন। তার অনুসারীরা তাকে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রচার করছেন। তবে বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত দল কাউকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়নি। ফলে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায় রয়েছেন জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবায়দুল হক চাঁন, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক, সদস্য সচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবুল কালাম শাহীন, মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মীর জাহিদুল কবির এবং মহানগর বিএনপির ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিন। এছাড়া বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।

দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবুল কালাম শাহীন বলেন, "সিটি নির্বাচনে দলের পক্ষ থেকে কাউকে চূড়ান্ত করা হয়েছে এমন কোনো তথ্য তিনি পাননি। তিনি নিজেও দলীয় মনোনয়ন চাইবেন।"

তিনি আরও বলেন, "ছাত্রদল থেকে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। দীর্ঘদিন দলের বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছি। সাধারণ নেতাকর্মীসহ তৃণমূলের সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে। দলীয় মনোনয়ন না পেলে কষ্ট থাকবে, কিন্তু বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।"

মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব জিয়াউদ্দিন সিকদারও নগরীতে জনসংযোগ চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, "দলীয় চেয়ারপারসনের নির্দেশনা অনুযায়ী জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কাজ করছেন। সাধারণ মানুষ ও দলের হাইকমান্ড চাইলে তিনি মেয়র পদে নির্বাচন করতে আগ্রহী। তবে প্রার্থী মনোনয়নের সিদ্ধান্ত হাইকমান্ডের।"

জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ বলেন, "দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মতামতের ভিত্তিতে প্রার্থী নির্বাচন করা হবে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের মনোনয়নের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হবে না। দল মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করবেন। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কখনো যাননি, এবারও যাবেন না।"

বিএনপির বাইরে জামায়াতে ইসলামীও নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলালের নাম সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।

বরিশাল মহানগর জামায়াতের আমির জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর বলেন, "জোটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয়ভাবে নেওয়া হবে। এখনো কেন্দ্র থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। তবে স্থানীয়ভাবে অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলালকে নিয়ে তারা কাজ করছেন।"

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবারও বরিশাল সিটি নির্বাচনে এককভাবে লড়তে চায়। তবে দলটির প্রার্থী এখনো চূড়ান্ত হয়নি। গত সিটি নির্বাচনে দলটির প্রার্থী ছিলেন সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম। এবার তিনি নির্বাচন করতে আগ্রহী নন বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা। ফলে নতুন প্রার্থী নিয়ে আলোচনা চলছে।

বরিশাল মহানগর ইসলামী আন্দোলনের সহকারী সেক্রেটারি নাসির উদ্দিন নাইস বলেন, "মেয়র পদে তারা এককভাবে নির্বাচন করবেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন দলের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম।"

দলটির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে আইনজীবী শেখ আব্দুল্লাহ নাসিরের নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। শেখ আব্দুল্লাহ নাসির বলেন, "নির্বাচনের দিন-তারিখ এখনো ঘোষণা হয়নি। দলীয় নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি কাজ করছেন। দল মনোনয়ন দিলে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছেন।"

এনসিপিও প্রার্থী চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। বরিশাল জেলার প্রধান সমন্বয়কারী আবু সাঈদ মুসা বলেন, "এখন পর্যন্ত দলের কোনো প্রার্থী ঘোষণা হয়নি। এককভাবে প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। শিগগিরই প্রার্থী ঘোষণা হতে পারে। জোটের বিষয়ে নির্বাচনের ঘোষণা আসার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।"

বামপন্থী দলগুলোর পক্ষ থেকেও প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। বাসদ বরিশাল জেলার সমন্বয়ক ডা. মনিষা চক্রবর্তী বলেন, "সিটি নির্বাচনে বামপন্থীদের প্রার্থী থাকবে। তবে নির্বাচনের দিন-তারিখ নির্ধারিত না হওয়ায় এখনো প্রার্থী চূড়ান্ত হয়নি। দল ও জোট মনোনয়ন দিলে তিনি নির্বাচন করবেন।"

এদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও কয়েকজনের নাম নগরীর রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘুরছে। তবে তফসিল ঘোষণার পরই প্রার্থিতার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

প্রায় ৫৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বরিশাল সিটি করপোরেশনে ৩০টি ওয়ার্ড রয়েছে। তিনটি থানা ও ২২৫টি মহল্লা নিয়ে গঠিত এই সিটি করপোরেশনে ৩০ জন সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ১০ জন সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।

২০০৩ সালে সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন মজিবর রহমান সরোয়ার। এরপর প্রয়াত শওকত হোসেন হিরন, প্রয়াত আহসান হাবীব কামাল, সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ এবং সর্বশেষ আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন।