বাগেরহাট সদর উপজেলার কাড়াপাড়া ইউনিয়নের মাজিডাঙ্গা আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৪০টি পরিবার বছরের পর বছর জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যাওয়ার চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। জোয়ার এলেই বসতঘর, রান্নাঘর, মসজিদ এবং চলাচলের রাস্তা হাঁটুপানিতে ডুবে যাওয়ায় জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে পরিবারগুলো অন্যত্র আশ্রয় নেয় এবং পানি নেমে গেলে কাদা-পানি মাড়িয়ে পুনরায় নিজেদের ঘরে ফেরে।

১৯৯৮ সালে মাজিডাঙ্গা গ্রামে ৬০টি ভূমিহীন পরিবারকে ঘর ও জমি দেওয়ার মাধ্যমে এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে প্রকল্পের সামনের চরভরাটি জমিতে আরও ৮০টি ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। বর্তমানে এখানে প্রায় ১৪০ পরিবারের সাড়ে চার শতাধিক মানুষ বসবাস করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প তৈরির সময় পর্যাপ্ত মাটি দিয়ে জায়গাটি উঁচু করা হয়নি, যার ফলে বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের পানি সহজেই প্রকল্প এলাকায় ঢুকে পড়ে। এর ফলে অনেক ঘর এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, জোয়ারের পানিতে প্রকল্পের রাস্তা, বসতঘর, রান্নাঘর ও মসজিদ প্লাবিত হয়েছে। অনেক ঘরের মেঝেতে হাঁটুপানি জমে থাকায় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা রাসেল বলেন, "বছরের পর বছর এই কষ্ট সহ্য করছি। জোয়ারের সময় মনে হয় আমরা দ্বীপের মানুষের মতো হয়ে যাই। ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে থাকে, চলাচলের রাস্তাও থাকে না। আমরা কোনো দান বা আর্থিক সহায়তা চাই না, শুধু জোয়ারের পানি ঠেকানোর স্থায়ী ব্যবস্থা চাই।"

আরেক বাসিন্দা মরিয়ম বেগম বলেন, "বাচ্চাদের নিয়ে পানির মধ্যে থাকতে খুব ভয় লাগে। রান্নাঘর ডুবে যাওয়ায় অনেক সময় শুকনা খাবার খেয়ে থাকতে হয়। পানি নেমে গেলে ঘরের ভেতরের কাদা পরিষ্কার করতে হয়। স্থায়ী বেড়িবাঁধ হলে আমাদের এই দুর্ভোগ অনেকটাই কমে যাবে।"

মসজিদের সহসভাপতি আকরাম জানান, "দুপুরে জোহরের নামাজের জন্য আজান দিয়েছিলাম। আজান দেওয়ার কিছুক্ষণ পরই জোয়ারের পানি এসে মসজিদসহ পুরো আশ্রয়ণ প্রকল্প প্লাবিত করে। পানির কারণে আমরা নামাজও আদায় করতে পারিনি।"

এলাকাবাসী মো. জাকির বলেন, "এই মানুষগুলো দীর্ঘদিন ধরে পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে বসবাস করছেন। বর্ষা ও জোয়ারের সময় তাঁদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি হয়। আশ্রয়ণ প্রকল্পের চারপাশে বাঁধ এবং একটি ভালো সড়ক নির্মাণ করা হলে বাসিন্দাদের কষ্ট অনেকটাই কমবে।"

কাড়াপাড়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য ও বিএনপি নেতা মো. আবু হানিফ হাওলাদার বলেন, "আশ্রয়ণ প্রকল্প তৈরির সময় প্রয়োজনের তুলনায় কম মাটি দিয়ে জায়গা উঁচু করা হয়েছিল। এ কারণে জোয়ার এলেই মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। দ্রুত বেড়িবাঁধ ও পাকা সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি জরাজীর্ণ ঘরগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।"

বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তারা কোনো আর্থিক সহায়তা বা ত্রাণ চান না; বরং জোয়ারের পানি থেকে রক্ষা পেতে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ, জরাজীর্ণ ঘর সংস্কার এবং একটি পাকা সড়ক চান।

এ বিষয়ে বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহানাজ পারভীন বীথি বলেন, "মাজিডাঙ্গা আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাড়িঘর জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যাওয়ার বিষয়টি জানতে পেরে দ্রুত সমস্যা সমাধানে প্রকল্প গ্রহণের জন্য পিআইওকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরেজমিনে পরিদর্শনের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"