দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলেও পরবর্তীতে তা অস্বীকার করে অপহরণ ও ধর্ষণের মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলায় গত দেড় মাস ধরে কারাগারে রয়েছেন রুমন খন্দকার (২০) নামে এক তরুণ। তবে এই ঘটনা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বর্ণনা সামনে এসেছে।

আসামি রুমন নগরকান্দার তালমা ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামের বিল্লাল খন্দকারের ছেলে এবং পেশায় একজন কাঠমিস্ত্রি। গত ২ জুলাই ফরিদপুরের নগরকান্দা থানায় ওই তরুণীর দাদি বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। ওই রাতেই পুলিশ রুমনকে গ্রেপ্তার করে।

মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে যে, গত ১৯ জুন বিকেলে বাড়ির পাশ থেকে এক কিশোরীকে অতর্কিতভাবে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং রুমনের বাড়িতে তাকে ধর্ষণ করা হয়। পরদিন সেখান থেকে পালিয়ে এসে ওই কিশোরী ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) চিকিৎসা গ্রহণ করেন। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ২ জুলাই মামলাটি করা হয়।

অন্যদিকে, রুমনের পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি ভিন্ন। তাদের মতে, গত ২২ মে ডাঙ্গী ইউনিয়নের শংকরপাশা গ্রামের ওই কিশোরীর সঙ্গে রুমনের বিয়ে হয়। বিয়ের আগে কনের বাড়িতে গায়ে হলুদের আয়োজন করা হয় এবং প্রায় ৪০ জন বরযাত্রী নিয়ে রুমন কনের বাড়িতে যান। সেখানে দুই পরিবারের স্বজন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। এরপর কনেকে রুমনের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রমাণের জন্য রুমনের পরিবার বিয়ের ছবি ও ভিডিও প্রদর্শন করেছে। তাদের দাবি, কিশোরীর বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় বিয়েটি নিবন্ধন করা হয়নি, তবে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তা নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত ছিল।

রুমনের মামা হাফিজুর রহমান বলেন, "বিয়ের পর দুজনের মধ্যে মনোমালিন্য শুরু হয়। একপর্যায়ে কিশোরীকে বাবার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে স্থানীয় কয়েকজনের মধ্যস্থতায় তাকে আবার রুমনের বাড়িতে নেওয়া হলেও কয়েক দিন পর সে বাবার বাড়িতে চলে যায়।"

তবে কিশোরী ও তার দাদি বিয়ের বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, বিয়ে নয়, বরং কিশোরীকে অপহরণ করে ধর্ষণ করা হয়েছে। বিয়ের অনুষ্ঠান, ছবি বা ভিডিওর বিষয়ে জানতে চাইলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং মামলার অভিযোগের ভিত্তিতে বিচার দাবি করেছেন।

নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানি আজাদ জানান, ২ জুলাই কিশোরীর দাদি লিখিত অভিযোগ এবং ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র জমা দেন। অভিযোগের ভিত্তিতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, "এজাহারে বিয়ের কোনো বিষয় উল্লেখ ছিল না এবং পুলিশকেও বিয়ের বিষয়ে জানানো হয়নি। চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্রসহ ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়ায় বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।"

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক শহিদুল ইসলাম তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেবেন বলে জানান ওসি।

রুমনের আইনজীবী মো. ফারুক হোসেনের দাবি, দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ের পর কিশোরী কিছুদিন রুমনের বাড়িতে সংসার করেছেন, পরে পারিবারিক বিরোধের জেরে ধর্ষণের মামলা করা হয়েছে। তিনি বলেন, "বাল্যবিয়ে আইনগতভাবে স্বীকৃত না হলেও বিয়ের সামাজিক বাস্তবতা, দুই পরিবারের সম্মতি ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তদন্তে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। সুষ্ঠু তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।"

এ বিষয়ে নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা আফরিন বলেন, "বিয়ের সামাজিক ও আইনগত সুরক্ষার জন্য নিবন্ধন গুরুত্বপূর্ণ। এখানে প্রথমেই বাল্যবিয়ের মাধ্যমে আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে। কোনো বিয়ে নিবন্ধক বা কাজি এ ঘটনায় জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"