চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি জাহাজ ভাঙার কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে উচ্চপর্যায়ের দুটি পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রাথমিক পরীক্ষায় ওই জাহাজে মাত্রাতিরিক্ত ‘হাইড্রোজেন সালফাইড’ গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকায় অবস্থিত ফেরদৌস স্টিল নামক কারখানায় শুক্রবার সকাল নয়টার দিকে এই দুর্ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, যে জাহাজটি কাটা হচ্ছিল সেটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হতো।

শনিবার (১৫ আগস্ট) সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী পরিদর্শক এস.এম. সাখাওয়াত হোসেন জানান, সেখানে মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, "দুর্ঘটনার চার ঘণ্টা পর বিস্ফোরক পরিদপ্তরের পরীক্ষায় সেখানে ১০.৮ পিপিএম হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি পাওয়া যায়। যা দুর্ঘটনার সময় ১০০ পিপিএম-এর চেয়েও বেশি ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।"

গ্যাসটির বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে তিনি আরও বলেন, "হাইড্রোজেন সালফাইডকে একটি সাইলেন্ট কিলার বা অদৃশ্য ঘাতক বলা হয়। এটি একটি সম্পূর্ণ বর্ণহীন গ্যাস। এটি সাধারণ বাতাসের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ ভারী। যে কারণে এটি ওপরের বাতাসে উড়ে না গিয়ে জাহাজের নিচতলা, ট্যাংক বা আবদ্ধ নিচু জায়গায় জমে থাকে।"

ঘটনার তদন্তে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে ১১ সদস্যের এবং চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৯ সদস্যের দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানান, সরকারের একাধিক সংস্থা উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে ঘটনার আগে-পরের বিস্তারিত বিষয় নিয়ে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, "তদন্তে কারও অবহেলা বা গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম জানান, এ ধরনের জাহাজ কাটার আগে সেগুলোকে গ্যাসমুক্ত করতে হয়, কারণ কিছু ট্যাংকে বিষাক্ত গ্যাস থাকতে পারে। কারখানা কর্তৃপক্ষ ট্যাংক গ্যাসমুক্ত না করে কাটার কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ১০ পিপিএম মাত্রায় হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস থাকলে চোখ দিয়ে পানি পড়া, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব এবং কাশির উদ্রেক হয়। তবে ১০০ পিপিএম-এর বেশি গ্যাসের সংস্পর্শে এলে ফুসফুসে পানি জমে রক্তক্ষরণ হতে পারে এবং মানুষ অচেতন হয়ে পড়ে। স্নায়ুতন্ত্র অচল হয়ে এক থেকে তিন মিনিটের মধ্যে ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু ঘটে।

জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম জানান, মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি বলেন, "নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা হয়নি। তবে পুলিশ সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। কেউ অভিযোগ দিলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"