গত সপ্তাহে ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ সংসদে জানান, ২০২৯ সালে ভারতের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) পাঁচ ট্রিলিয়ন (পাঁচ লাখ কোটি মার্কিন ডলার) ডলারে পৌঁছাবে। চক্রবৃদ্ধি হারে প্রবৃদ্ধির সাধারণ হিসাবের ওপর ভিত্তি করে এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ভারতের বর্তমান অর্থনীতির আকার প্রায় চার ট্রিলিয়ন (চার লাখ ডলার) ডলার। অর্থনীতি ক্রমেই বড় হচ্ছে—এই যুক্তি ধরে বলা হচ্ছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা একদিন পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
তবে ‘পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি’ শোনার পর অনেক ভারতীয় নাগরিকের মধ্যে অস্বস্তিও তৈরি হয়। তাদের বক্তব্য, এ ধরনের লক্ষ্য আগেও বহুবার শোনা গেছে—বিশেষ করে মোদি সরকারের আমলে। তাদের মতে, ভারতের অর্থনীতির বাস্তব চিত্র সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি করতেই এমন বক্তব্য বারবার আসছে।
“পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের পূর্বাভাস ও বাস্তবতার এই বিশাল ব্যবধানে মোদি ও তাঁর সমর্থকদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। শুধু তা–ই নয়, এটি নিয়ে মূলত ভারতীয়দের গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা উচিত।”
একটি প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে মানুষকে আশ্বস্ত করার রীতি যেমন পরে বাস্তব পরিকল্পনা স্পষ্ট না থাকলে প্রশ্নের জন্ম দেয়, তেমনি মোদি সরকারও বারবার ভারতীয়দের সামনে ‘পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির’ স্বপ্ন দেখিয়েছে—কিন্তু লক্ষ্য অর্জনের রূপরেখা ও প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়নি। লক্ষ্য পূরণ না হলে কেন তা সম্ভব হয়নি—মোদি সরকার সেটির ব্যাখ্যাও দেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
ওই প্রসঙ্গে বলা হয়, সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ২০১৮ সালের শুরুতে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সভায় মোদি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ২০২৫ সালের মধ্যে ভারত পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে। ওই বছরই পরে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২০২৫ সালের মধ্যে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জনের লক্ষ্যে একটি ‘পথনকশা’ তৈরি করা হচ্ছে। এ জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
পরে ২০১৯ সালে সময়সীমা আরও এগিয়ে আনা হয়। ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে মোদি বলেন, ২০২৪ সালের মধ্যে ভারত পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে। তবে সে সময় সরকারের অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশে কী পরিবর্তন এসেছে, তা প্রকাশ করা হয়নি।
“বিজেপি সরকার এখন ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতের অর্থনীতি ৩৫ ট্রিলিয়ন ডলার করার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে।”
স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে ২০২০–২১ অর্থবছরকে সবচেয়ে কঠিন সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সে সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিশৃঙ্খল ও কঠোর করোনাভাইরাসের লকডাউনের কারণে অর্থনীতি ৭ শতাংশের বেশি সংকুচিত হয়েছিল। করোনাকালে ভারতের মতো বড় কোনো দেশের অর্থনীতি এতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি—এমন পর্যবেক্ষণও আছে।
তবে বড় ধাক্কার পরও বিজেপি সরকারের পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতিতে পরিবর্তন আনা হয়নি বলে সমালোচনা রয়েছে। ২০২২ সালে সরকারের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ মোদির আগের ওয়াদা পুনরাবৃত্তি করে বলেন, ২০২৫ সালের মধ্যে ভারত পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে। কয়েক মাস পর সাইপ্রাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও একই কথা বলেন।
এরই মধ্যে ২০২৫ সাল পার হলেও ভারত পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের মুখ দেখেনি বলে উল্লেখ করা হয়। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারা নিয়ে সরকারের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—কারও মতে, বিষয়টি স্রেফ উপেক্ষা করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশও মোদি সরকারের এসব গালভরা দাবির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
ওয়াদা রক্ষা করতে না পারলেও মোদি সরকার পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির প্রতিশ্রুতি বন্ধ করেনি—এমন বক্তব্যও উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে আবারও জিডিপির ওই লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়, তবে এবার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। বলা হয়, তখন মোদি সময় না উল্লেখ করে কাব্যিক ভঙ্গিতে বলেন, ভারত পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার দিন আর বেশি দূরে নয়।
এরপর ধীরে ধীরে লক্ষ্য বদলের দিকেও মনোযোগ সরানো হতে থাকে। পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের বদলে নতুন করে বলা শুরু হয়, ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতের অর্থনীতি ৩৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পরিণত হবে এবং দেশটি ‘পুরোপুরি উন্নত অর্থনীতি’ হবে।
এই নতুন লক্ষ্যটি তুলনামূলকভাবে অনেক দূরের—তাই পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতির মতো চাপ ও ঝুঁকি তৈরি করে না বলে মত দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে বলা হচ্ছে, পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের কাহিনি এক অর্থে ভারতের রাজনীতির নিজের তৈরি এক ব্যঙ্গচিত্র। তবে এর মধ্যে মোদির রাজনৈতিক কৌশল এবং ভারতের নিকট ভবিষ্যতের অর্থনীতি নিয়ে কিছু শিক্ষা আছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রথমত, সরকার বড় বড় প্রতিশ্রুতির ওপর ভর করে চলে। মোদি ভারতকে বদলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আলোড়ন তুলেছিলেন—বিশেষ করে ‘আচ্ছে দিন’ বা ভালো দিন আসবে—এই স্লোগানকে ঘিরে।
দ্বিতীয়ত, প্রশ্নের ঘাটতি ও জনচাপের অনুপস্থিতির প্রসঙ্গও তোলা হয়। বলা হয়, অনুগত সংবাদমাধ্যমের কারণে সরকারের অতিরিক্ত আশাবাদী লক্ষ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তেমন প্রশ্ন তোলা হয়নি। ফলে সরকারের পক্ষে বছরের পর বছর দেশের অর্থনীতির স্বাস্থ্য নিয়ে বিভ্রান্তিকর চিত্র তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, জিডিপি প্রবৃদ্ধির তথ্য অতিরঞ্জিত হয়ে থাকলে তা আরও গুরুতর বিষয় হতে পারে। এ প্রসঙ্গে বলা হয়, বিশ্বের মধ্যে ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থান চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ স্থানে নেমে এসেছে। পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের মতো লক্ষ্য দূরের প্রসঙ্গ হলেও, গত মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সংসদে মোদি সরকার জানিয়েছে, ভারত এখনো চার ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে পারেনি।
সরকার ও সমর্থকেরা এই ফারাকের কারণ হিসেবে রুপি-ডলারের বিনিময় হারকে দায়ী করার চেষ্টা করেছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। তবে বলা হয়, এটিকে এক ধরনের বৃত্তাকার যুক্তি হিসেবে ধরা যায়। রুপির দরপতনকে ভারতীয় অর্থনীতির দুর্বলতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়; বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারত থেকে অর্থ তুলে নিলে রুপির মূল্য কমে। ফলে অর্থনীতির দুর্বলতার একটি লক্ষণকে সেই দুর্বলতার কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে—এমন সমালোচনা রয়েছে।
‘অসন্তোষ’ অংশে বলা হয়, মোদির জন্য নেতিবাচক খবর হলো—অর্থনীতির লক্ষ্য নিয়ে গালভরা দাবি করার দিন হয়তো শেষ হয়ে আসছে। তৃতীয় মেয়াদে নিজের সমর্থক ধোপদুরস্ত (হোয়াইট–কলার) মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ক্ষোভের কথা বলা হচ্ছে। প্রথমে অনলাইনে, পরে কথিত ‘তেলাপোকা’ আন্দোলনের রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে সেই ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
এর বাইরে নতুন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (জিএআই) উত্থানকে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ওপর চাপ বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের ভাষ্য অনুযায়ী, এই খাতের ভিত্তি হিসেবে পরিচিত অনেক কাজ এখন জেনারেটিভ এআই দিয়ে করা সম্ভব। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ কাজ করেন এবং দেশের জিডিপিতে এই খাতের অবদান প্রায় ৭ শতাংশ।
আরেকটি উদ্বেগের দিক হিসেবে বলা হয়, ভারতের কোনো সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা নেই। মোদির উৎপাদন খাত সম্প্রসারণের উদ্যোগ সফল হয়নি বলেও দাবি করা হয়, ফলে তাঁর শাসনামলে জিডিপিতে উৎপাদন খাতের অংশ উল্টো কমেছে। ভারতের জনগণ এখনো বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটির মাথাপিছু জিডিপি তলানিতে পড়ে আছে—শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের চেয়ে নিচে—এমন পর্যবেক্ষণও রয়েছে।
এছাড়া ঝাড়খন্ডে শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক বিক্ষোভের কথাও বলা হয়। ভারতের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো কতটা গভীর এবং কীভাবে সমাধান করতে হবে—সে বিষয়ে বিরোধীদের জানা আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
সবশেষে আবারও বলা হয়, পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের পূর্বাভাস ও বাস্তবতার মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান—তা নিয়ে মোদি ও তাঁর সমর্থকদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। শুধু তাই নয়, এ বিষয়ে ভারতীয়দের গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করার আহ্বানও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।