নিজের ডাকা একটি বিশেষ উপনির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন নাইজেল ফারাজ। যুক্তরাজ্যের অন্য বড় রাজনৈতিক দলগুলো এই নির্বাচন বর্জন করায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা কার্যত সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হন মাথায় ডাস্টবিন লাগানো এক কৌতুকাভিনেতা। এই জয়ের মাধ্যমে ফারাজ পার্লামেন্ট সদস্য (এমপি) হিসেবে নিজের আসন ধরে রাখলেন।
কট্টর ডানপন্থী পপুলিস্ট দল ‘রিফর্ম ইউকে’র নেতা নাইজেল ফারাজ এই নির্বাচনে বিশাল ব্যবধানে পুনর্নির্বাচিত হন। তিনি মোট ২২ হাজার ২৩৯ ভোট পান। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের চেয়ে এবার তিনি এক হাজার ভোট বেশি পেয়েছেন।
এই উপনির্বাচনে ফারাজের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ‘কাউন্ট বিনফেস’। তিনি নিজেকে ‘আন্তগ্যালাকটিক মহাকাশ যোদ্ধা’ বা ভিনগ্রহের যোদ্ধা হিসেবে দাবি করেন। নির্বাচনে তিনি ৯ হাজার ৪৫৫ ভোট পেয়ে চমক দেখান। যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে ডানপন্থী এলাকাগুলোর একটিতে এমন ফল আসায় ফারাজবিরোধী বড় একটি ভোটব্যাংক থাকার ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে।
নাইজেল ফারাজ এই ফলকে নিজের নিরঙ্কুশ বিজয় বলে দাবি করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) তিনি লিখেছেন, ‘ক্ল্যাকটনের এই ফলাফলই সব কথা বলে দিচ্ছে।’
ফারাজ আগে থেকেই ক্ল্যাকটন এলাকার এমপি ছিলেন। কিন্তু নিজের আর্থিক লেনদেন নিয়ে নজিরবিহীন বিতর্কের মুখে তিনি পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগ করেন। এরপরই সেখানে এই উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই আর্থিক বিতর্কের জেরে পার্লামেন্টারি স্ট্যান্ডার্ডস কমিটি তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছিল। নির্বাচনের কারণে তদন্তটি স্থগিত ছিল, যা এখন আবার শুরু হবে।
ফলাফল ঘোষণার সময় ফারাজ উপস্থিত ছিলেন না। ফলে তিনি কোনো বিজয়ী ভাষণও দেননি। তাঁর দাবি, পুলিশ তাঁকে সতর্ক করেছিল, সেখানে বিশৃঙ্খলা হতে পারে। তবে এসেক্স পুলিশ জানিয়েছে, সেখানে কোনো ‘ঘটনা বা সমস্যার’ আশঙ্কা ছিল না। ভোট গণনার সময় উপস্থিত থাকার বিষয়টি পুরোপুরি ‘ব্যক্তি এবং তাঁর নিরাপত্তা দলের’ ওপর নির্ভর করে।
উপনির্বাচনে বিজয়ীদের ভোট গণনার সময় উপস্থিত না থাকা বেশ বিরল। এর আগে ১৯৮১ সালে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির সদস্য ববি স্যান্ডস এমপি নির্বাচিত হওয়ার সময়ও তিনি উপস্থিত ছিলেন না। তবে সে সময় তিনি কারাগারে ছিলেন এবং অনশন করছিলেন।
ফলাফল ঘোষণার পরপরই এক্সে একটি পোস্ট দেন কাউন্ট বিনফেস। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘ক্ল্যাকটনের উপনির্বাচনে আমি প্রথম হয়েছি। অন্তত ফলাফল ঘোষণার সময় যেসব প্রার্থী উপস্থিত হওয়ার কষ্টটুকু করেছেন, তাঁদের মধ্যে আমিই প্রথম।’
এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরাসরি নিজের ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে চেয়েছিলেন ফারাজ। তিনি একে ক্ষমতাবানদের (এস্টাবলিশমেন্ট) বিরুদ্ধে নিজের লড়াই হিসেবে তুলে ধরেন। উপনির্বাচনের ডাক দেওয়ার সময় তিনি বলেছিলেন, ‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ক্ল্যাকটনের জনগণই আমার কাজের বিচার করবেন।’
তবে নির্বাচনটি দ্রুতই আলোচনায় ‘বিনোদনমূলক ঘটনাও’ যুক্ত হয়েছে। জন সোপেলের মতো বিখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিকেরা একে একটি ‘সার্কাস’ বলে আখ্যা দেন। কারণ, ফারাজকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ৩৩ জন অদ্ভুত ও নামসর্বস্ব প্রার্থী দাঁড়িয়েছিলেন। অন্যদিকে ‘রিফর্ম ইউকে’ দলের আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগও পিছু ছাড়ছে না।
এ ছাড়া এমন একটি নির্বাচন আয়োজনের বিপুল খরচ নিয়েও ফারাজের বিরুদ্ধে সমালোচনা উঠেছে। এই নির্বাচনে প্রায় আড়াই লাখ পাউন্ড (৩ লাখ ৩৮ হাজার ডলার) খরচ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফারাজ দাবি করেছিলেন, তাঁর দল রিফর্ম ইউকে এই খরচ বহন করবে। কিন্তু আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে এই অর্থ সাধারণ জনগণের পকেট থেকেই যাবে।
ফারাজ একসঙ্গে দুটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। একদিকে তাঁর নিজস্ব ভোটব্যাংক ভাগ হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের নতুন মধ্য-বামপন্থী প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের মতো এক শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাঁকে। রিফর্ম ইউকে দলের জন্য এ ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতি একেবারেই নতুন বলে মনে করা হচ্ছে। এর আগে দলটি জাতীয় জনমত জরিপে এগিয়ে ছিল এবং স্থানীয় নির্বাচনগুলোতেও ঐতিহাসিক সাফল্য পাচ্ছিল।
ফারাজের বিরুদ্ধে চলমান তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে তিনি পার্লামেন্টের নিয়ম ভেঙেছেন, তাহলে আরেকটি আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে। সে ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত ওই আসনে আরও একটি উপনির্বাচন হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, সেই নির্বাচনে অন্যান্য বড় দলগুলোও নিজেদের প্রার্থী দেবে।
রিফর্ম ইউকে এখন নিজ ঘরানার কট্টর ডানপন্থীদের দিক থেকেও চাপের মুখে পড়েছে। দলের সাবেক এমপি রুপার্ট লোও সম্প্রতি ‘রেস্টোর ব্রিটেন’ নামে একটি নতুন দল গঠন করেছেন। দলটি ফারাজের ছোট হলেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি ভোটব্যাংক নিজেদের দিকে টেনে নিচ্ছে।
ফারাজের সঙ্গে রুপার্ট লোওয়ের বিরোধ দীর্ঘদিনের। গত বছর তাঁকে রিফর্ম ইউকে থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের উৎসাহে তিনি নিজের নতুন দল গঠন করেন। এখন সুযোগ বুঝে লোও ফারাজের সঙ্গে একটি জোট গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে শর্ত হলো, ফারাজকে ‘রেস্টোর ব্রিটেন’-এর কিছু চরমপন্থী নীতি মেনে নিতে হবে। কিন্তু ফারাজ এখন পর্যন্ত এই পুরোনো বিরোধ মেটাতে খুব একটা আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না।
ডানপন্থী রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করেন লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক টিম বেল। তিনি সিএনএনকে বলেন, ‘তাদের মধ্যে কোনো চুক্তি হওয়াটা বেশ কঠিন। কারণ, রেস্টোর ব্রিটেনের নীতিগুলো এতটাই চরমপন্থী যে সেগুলো গ্রহণ করলে রিফর্ম ইউকে সাধারণ ভোটারদের কাছে আকর্ষণ হারাবে। বিশেষ করে যেসব ভোটার পুরোপুরি কট্টর ডানপন্থী নীতি পছন্দ করেন না, তাঁরা মুখ ফিরিয়ে নেবেন।’
এসব ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন দেশে একটি নতুন জাতীয় সরকার ক্ষমতায় এসেছে। লেবার পার্টির নেতা ও প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যাম তাঁর পূর্বসূরি কিয়ার স্টারমারের চেয়ে বেশি জনপ্রিয়। চলতি গ্রীষ্মের শুরুতে পার্লামেন্টে সফল প্রত্যাবর্তনের সময় তিনি প্রমাণ করেছেন, রিফর্ম পার্টিকে মোকাবিলা করার যথেষ্ট যোগ্যতা তাঁর রয়েছে।
উপনির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ফারাজকে ঘিরে যে আলোচনাই বেশি—সেখানে ‘কাউন্ট বিনফেস’ চরিত্রও ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কাউন্ট বিনফেস সত্যি সত্যি মহাকাশ থেকে আসেননি। এটি মূলত কমেডিয়ান জন হার্ভের তৈরি করা একটি ব্যঙ্গাত্মক চরিত্র। এর আগেও তিনি বেশ কয়েকটি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন।
সিএনএনের সাংবাদিক ম্যাক্স ফস্টারকে তাঁর ‘স্টারশিপ’ (মহাকাশযান) থেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিনফেস বলেন, ‘১৩ আগস্ট পর্যন্ত আমি একটি বিষয় একেবারেই স্পষ্ট করতে চাই। আর তা হলো, এই পুরো মহাবিশ্বে ক্ল্যাকটনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কোনো জায়গা আমার কাছে নেই।’
বিনফেস আরও বলেন, তিনি হলোগ্রাফিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাঁর মহাকাশযানটিকে অবিকল ক্ল্যাকটনের একটি সস্তা হোটেলের মতো সাজিয়েছেন। অন্যদিকে সিএনএন থেকে ফারাজের কাছে সাক্ষাৎকারের অনুরোধ করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
বিনফেসের নির্বাচনী ইশতেহারটি মূলত যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন জাতীয় বিষয় নিয়ে করা নানা রসিকতায় ভরপুর ছিল। এর মধ্যে অন্যতম হলো, ‘আপনার কর কমানো হবে, আর বাকি সবার কর বাড়ানো হবে।’ এ ছাড়া জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী অ্যাডেলকে ‘জাতীয়করণ’ করা এবং তারকাদের লেখা (বা তাঁদের নামে লেখা) ক্রাইম থ্রিলার উপন্যাসের ওপর ‘উইন্ডফল ট্যাক্স’ বা অতিরিক্ত কর বসানোর প্রতিশ্রুতিও ছিল তাঁর ইশতেহারে।
যুক্তরাজ্যে গত ছয় দশকের বেশি সময় ধরে নির্বাচনে এ ধরনের ব্যঙ্গাত্মক প্রার্থীদের অংশ নেওয়ার চল রয়েছে। কাউন্ট বিনফেস সেই দীর্ঘ তালিকারই একজন। এ ধরনের প্রার্থীরা যুক্তরাজ্যের নির্বাচনের এক অনন্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছেন। যুক্তরাজ্যে যে কেউই পার্লামেন্ট নির্বাচনে দাঁড়াতে পারেন। এ জন্য মাত্র ৫০০ পাউন্ড (৬৭৫ ডলার) জামানত এবং ১০ জন সমর্থকের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। ফলে খুব বেশি ঝামেলা ছাড়াই মানুষ মজা করার জন্য বা অভিনব কোনো বার্তা দেওয়ার জন্য নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন।
এই ঐতিহ্য পাকাপোক্ত হয় মূলত ১৯৬৩ সালে। সে বছর এক তরুণ সংগীতশিল্পী একটি উপনির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন, যিনি পরে ‘স্ক্রিমিং লর্ড সুচ’ নামে পরিচিতি পান। নিজের জীবনে তিনি মোট ৪১টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এর মধ্যে তিনজন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর বিপক্ষেও তিনি লড়েছেন। দলের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ১৯৮২ সালে তিনি ‘অফিশিয়াল মনস্টার রেভিং লুনি পার্টি’ নামে একটি রাজনৈতিক দলও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
এই দলের অদ্ভুত সব নামের প্রার্থীরা কখনোই যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে (ওয়েস্টমিনস্টার) নির্বাচিত হতে পারেননি। এর মধ্যে ‘নিক দ্য ইনক্রেডিবল ফ্লাইং ব্রিক’ এবং দলটির বর্তমান নেতা ‘হাওলিং লড হোপ’-এর নাম উল্লেখযোগ্য। তবে তাঁরা জয়ী না হলেও অন্যদের এই পথে হাঁটতে উৎসাহিত করেছেন। ক্ল্যাকটন উপনির্বাচনেও এই দলের তিনজন প্রার্থী দাঁড়িয়েছিলেন এবং তাঁরা সবাই মিলে মোট ৬১ ভোট পেয়েছেন।
এ ধরনের রসিকতার আড়ালে কিছু কিছু নির্বাচনী প্রচারে বেশ গভীর বার্তাও লুকিয়ে থাকে। যেমন গত জুনে ম্যানচেস্টারের সাবেক মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম যখন পার্লামেন্টে ফিরে আসেন, তখন তাঁর পাশেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন শেয়ালের পোশাক পরা এক ব্যক্তি। তিনি মূলত পশু অধিকার আদায়ের দাবিতে প্রচার চালাচ্ছিলেন।
প্রয়াত লর্ড সুচ তাঁর প্রচারে বেশ কিছু নীতি তুলে ধরেছিলেন। এর মধ্যে ভোটের বয়স ২১ থেকে কমিয়ে ১৮ করা এবং বাণিজ্যিক রেডিওকে বৈধতা দেওয়ার মতো দাবিগুলো শেষ পর্যন্ত আইনে পরিণত হয়েছিল। এরপরও এসব ডামি বা নামসর্বস্ব প্রার্থীর অংশগ্রহণকে অনেকেই স্রেফ তামাশা বলে উপহাস করেন।
কাউন্ট বিনফেসের কথায় ফেরা যাক। ভোটের আগে তিনি অনেক বাগাড়ম্বর করেছিলেন। ঐক্যের প্রতীক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য এসব মোটেও যথেষ্ট ছিল না।