ইরানে হামলায় অংশ নেওয়া মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর জায়গায় মোতায়েন করা হচ্ছে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার প্রেক্ষাপটে লিংকনের নাবিকদের মানসিক চাপ এবং নানা ধরনের সমস্যার খবর প্রকাশের পর এই পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনায় অচলাবস্থা না কাটলে ইরানের বন্দরগুলোতে ‘অনির্দিষ্টকাল’ নৌ অবরোধ চালিয়ে যাবে তারা। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন দাবি করছে, হরমুজ প্রণালি তাদের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে।
তবে ইরানের দাবি, হরমুজের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই এবং জলপথটি বন্ধ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শর্ত মেনে না নেওয়া পর্যন্ত এটি খোলা হবে না। ওই শর্তগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি রয়েছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য নতুন রণতরি পাঠানোর সিদ্ধান্তটি এমন সময়ে আসে, যখন ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন টানা ২৪০ দিনের বেশি সময় সমুদ্রে রয়েছে। মার্কিন আইনপ্রণেতারা জাহাজটির নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরবরাহের ঘাটতি, পানিদূষণ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এসব প্রতিবেদনকে ‘সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপিত’ বলে দাবি করেছেন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, জাহাজের কোনো নৌ সদস্য মারা যাননি। ৩ আগস্ট জাহাজ থেকে পড়ে যাওয়া একজন নাবিককে দ্রুত উদ্ধার করা হয়েছিল।
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘ অভিযানে নাবিকদের মানসিক চাপের পাশাপাশি মৌলিক সরবরাহের ঘাটতি, পানিদূষণ ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যার খবরও আলোচনায় আসে।
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন নৌ কর্মকর্তা হারলান উলম্যান বলেন, পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরির মতো জটিল যুদ্ধজাহাজের অনেক রক্ষণাবেক্ষণ সমুদ্রে সম্ভব নয়। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকলে জাহাজের প্রস্তুতি ও সক্ষমতা কমে যেতে পারে। লিংকন টানা প্রায় ২০০ দিন কোনো বন্দরে ভেড়েনি।
এ কারণে জর্জ ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোকে কেবল নিয়মিত জাহাজ বদল হিসেবে না দেখে, দীর্ঘ অভিযানে মার্কিন নৌবাহিনীর ওপর তৈরি চাপের প্রতিফলন হিসেবেই দেখা হচ্ছে। জর্জ ওয়াশিংটন ইতিমধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাত্রা করেছে।
গত বৃহস্পতিবার হেগসেথ বলেন, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ কার্যকর রাখতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি ‘অনির্দিষ্টকাল’ বজায় রাখা সম্ভব। জাহাজগুলো পর্যায়ক্রমে বদলে দিয়ে এ অবরোধ চালানো হবে বলে তিনি জানান। একই দিন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের ওপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক চাপ তৈরির ঘোষণা দেন। আগামী সপ্তাহ থেকে কোনো দেশকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রে ‘নজিরবিহীন’ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ বন্ধে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছিল। এতে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা করে চূড়ান্ত যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে আলোচনা ভেঙে যায় এবং দুই দেশ আবারও পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু করে।
৬০ দিনের সেই সময়সীমা আগামীকাল রোববার শেষ হচ্ছে; কিন্তু সমঝোতা নবায়ন বা নতুন করে আলোচনা শুরুর কোনো লক্ষণ নেই। এর মধ্যে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে নৌ অবরোধসহ নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে ওয়াশিংটন।
যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন ১৩০ থেকে ১৪০টি জাহাজ চলাচল করত। মঙ্গলবার তা কমে আটটিতে নেমে এসেছে। তবে গত ১০ দিনে দৈনিক গড়ে প্রায় ১২টি জাহাজ এই প্রণালি পার হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ এবং ইরানের ‘প্রণালি বন্ধ’—দুই দাবিই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
হরমুজ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই জলপথ দিয়ে যেত। অবরোধ ও ইরানের পাল্টা পদক্ষেপে এখন এই সরবরাহব্যবস্থা চাপের মুখে পড়েছে।
ইরান বলছে, তেহরানের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ হরমুজ দিয়ে চলতে পারবে না। দেশটির যৌথ সামরিক কমান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকার দাবি ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’ বলে মন্তব্য করেছে।
মার্কিন অবরোধে ইরানের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস তেল রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের মাধ্যমে তেহরানকে আলোচনায় ছাড় দিতে বাধ্য করাই ওয়াশিংটনের লক্ষ্য।
তবে ইরানের হাতেও বড় চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ধরা হচ্ছে হরমুজ প্রণালিকে। বিশ্লেষকদের মতে, এই জলপথে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপরও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র নতুন রণতরি এনে অবরোধ দীর্ঘায়িত করার সক্ষমতা দেখাচ্ছে। অন্যদিকে ইরান হরমুজকে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ধরে রেখেছে। যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা আবার শুরু না হলে এই অচলাবস্থা আরও দীর্ঘ হতে পারে।