আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও কোলাহলপ্রিয় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একজন মুখপাত্রের প্রয়োজনীয়তা হয়তো খুব বেশি নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি তর্কের মাধ্যমে তিনি নিজেই নিজের বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে অভ্যস্ত। তবে এই প্রেক্ষাপটেও প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিটের পদত্যাগের ঘোষণা ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই বিদায় প্রেসিডেন্টের পরামর্শক দলে লেভিটের গুরুত্বকে আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

লেভিট কেবল একজন মুখপাত্র ছিলেন না, বরং তিনি ট্রাম্পের চিন্তাভাবনা ও মানসিকতা গভীরভাবে বুঝতেন। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ওয়াশিংটনের জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার ও আঘাত হানার প্রক্রিয়ায় তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। নিজের বসের মতোই তিনি পদের প্রচলিত প্রথা ভেঙে কাজ করতে পছন্দ করতেন।

লেভিট জানিয়েছেন, গত মে মাসে দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের পর তিনি অনুভব করেন যে সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না। তাঁর এই বিশ্বস্ত সহযোগীর প্রশংসা করে ট্রাম্প জানিয়েছেন, লেভিট এখন বাইরের একজন উপদেষ্টা হিসেবে কাজ চালিয়ে যাবেন।

ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি হওয়া অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ। এই প্রশাসনের ক্ষেত্রে ‘বক্তব্যে শৃঙ্খলা’ বলে কিছু নেই। প্রেসিডেন্ট এক মুহূর্ত পর কী বলবেন, তা তিনি ছাড়া কেউ জানেন না এবং প্রায়ই তিনি তাঁর কর্মকর্তাদের বক্তব্যের বিপরীত কথা বলে নীতি বদলে ফেলেন।

"ট্রাম্পের সমর্থকেরা লেভিটকে ভীষণ পছন্দ করেন। সাংবাদিকদের ওপর তাঁর চড়াও হওয়ার ভঙ্গি ট্রাম্পের প্রথম প্রচারণার বিদ্রোহী স্লোগানের কথা মনে করিয়ে দেয়। তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে বরং তাঁদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পছন্দ করতেন।"

সংবাদমাধ্যমকে নিজের অনুকূলে ব্যবহার করতে ট্রাম্প অত্যন্ত পারদর্শী। কয়েক দশক ধরে তিনি সাংবাদিকদের কখনো খলনায়ক, কখনো তোষামোদকারী, আবার কখনো খেলনা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। গণমাধ্যমের সংবাদের চাহিদাকে তিনি মানুষের মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার অস্ত্র হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন। সংঘাতপ্রিয় মানসিকতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্থান একই সময়ে হওয়ায় তিনি পূর্বসূরিদের মতো মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি নিজের তীব্র বক্তব্য ছড়িয়ে দিতে পারেন। এই কারণে হয়তো তাঁর নতুন কোনো প্রেস সেক্রেটারির প্রয়োজন নেই বলে মনে হতে পারে।

তবে লেভিটের মতো দক্ষ কাউকে খুঁজে পাওয়া ট্রাম্পের জন্য কঠিন হবে। ক্যামেরার সামনে ট্রাম্পের পর লেভিটই সবচেয়ে সাবলীলভাবে ‘মাগা’ মতাদর্শ প্রচার করতে পারতেন। তাঁর ব্রিফিংগুলো নীতি ব্যাখ্যার চেয়ে ট্রাম্পের অবাধ্যতার প্রদর্শন হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিল।

গত মাসে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প যখন সাংবাদিকদের কড়া ভাষায় আক্রমণ করছিলেন, তখন লেভিট তাঁর পাশেই বসে ছিলেন—যা তাঁর মেয়াদের শেষ মুহূর্তের প্রতীক হয়ে থাকবে। এছাড়া ট্রাম্পের গোপন বিমানযাত্রায় সাংবাদিকদের ঢাল হিসেবে ব্যবহারের বিতর্ক চলাকালেই লেভিট পদত্যাগ করলেন।

সংবাদমাধ্যমের জবাবদিহিতার ভূমিকাকে সংকুচিত করার ক্ষেত্রে লেভিটের মেয়াদকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি সাংবাদিকদের ঐতিহ্যবাহী পুল ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন এবং প্রেস গ্রুপে ট্রাম্পপন্থী পডকাস্টার ও স্থানীয় রেডিও উপস্থাপকদের যুক্ত করেন। সমালোচকরা একে ট্রাম্পের প্রতি নরমপন্থী সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে ঢোকানোর চেষ্টা বললেও সমর্থকরা একে স্বাগত জানান। এমনকি ট্রাম্পের আদেশে মেক্সিকো উপসাগরের নাম বদলে ‘আমেরিকা উপসাগর’ করতে রাজি না হওয়ায় বার্তা সংস্থা এপির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন লেভিট।

লেভিটের ব্রিফিংগুলো ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের ‘বিকল্প তথ্যের’ ধারণাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তিনি শুরুতেই ট্রাম্পের অর্জনের অতিশয়োক্তিপূর্ণ প্রশংসা করতেন, যা রক্ষণশীল টেলিভিশনের রাতের টক শোর মতো শোনাত। ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে তিনি বিনোদনজগতেই ক্যারিয়ার গড়বেন।

যেকোনো সরকারের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের দূরত্ব তৈরি হয়। বুশ, ওবামা কিংবা বাইডেনের প্রেস দলও সাংবাদিকদের সঙ্গে তিক্ততায় জড়িয়েছে। তবে ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমের সাংবিধানিক ভূমিকাকে যেভাবে হুমকির মুখে ফেলেছেন, তা নজিরবিহীন।

ডেমোক্রেটিক দলের প্রতিনিধি জেমস ওয়াকিনশ বলেন, লেভিট পারিবারিক কারণে পদত্যাগ করছেন। এই দাবির সত্যতা নিয়ে তাঁর কোনো সন্দেহ নেই, তবে তিনি আরও বলেন, “ট্রাম্পের মুখপাত্র হতে গেলে আপনাকে প্রতিদিন জেনেশুনে বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে হবে।”

ব্রিফিংগুলো সংঘাতপূর্ণ হলেও ক্যামেরার পেছনে লেভিট সাংবাদিকদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করতেন এবং ট্রাম্পের আস্থার পাত্রী ছিলেন। এখন আশঙ্কা করা হচ্ছে, লেভিটের প্রস্থান খামখেয়ালি এই প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত গ্রহণের খবর পাওয়া সাংবাদিকদের জন্য আরও কঠিন করে তুলবে।

ট্রাম্প যদি তাঁর ঘনিষ্ঠ কাউকে বেছে না নেন, তবে নতুন কারো পক্ষে লেভিটের মতো শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হওয়া কঠিন হবে। তাঁর স্থলাভিষিক্ত কে হবেন তা নিয়ে কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকায় গুঞ্জন উঠেছে যে, ট্রাম্প নিজেই হয়তো এই দায়িত্ব নেবেন।

ট্রাম্পের সমর্থকদের কাছে লেভিট সব সময় একজন ‘হিরোইন’ হয়ে থাকবেন। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসন চলে যাওয়ার পরও তাঁর কাজের কৌশল রয়ে যাবে, কারণ ভবিষ্যতের কোনো প্রেসিডেন্টই সংবাদমাধ্যমের হাতে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে চাইবেন না। ক্ষমতার প্রদর্শনে লেভিট ছিলেন ট্রাম্পের এক বিশ্বস্ত সহযোগী।