দক্ষিণ কোরিয়ার কয়েকটি এলাকায় মাটির নিচ থেকে তোলার আগেই আলু নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গরমের প্রভাবে আলুগুলো নরম হয়ে পড়ছে—অনেকটা ‘সেদ্ধ’ হওয়ার মতো অবস্থায় চলে যাচ্ছে বলে স্থানীয় পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ার পর এমন পরিস্থিতির খবর পাওয়া গেছে।
স্থানীয় গণমাধ্যম জানায়, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি গ্যাংওন প্রদেশে কৃষকেরা আলুর খেত খুঁড়ে দেখেন। দেখা যায়, ফসল তোলার মতো কিছুই অবশিষ্ট নেই। অথচ এক সপ্তাহ আগেও খেতগুলো দেখতে ভালো ছিল।
উত্তর কোরিয়া সীমান্তের কাছে ইয়াংগু কাউন্টির হেয়ান এলাকায় চাষাবাদ করেন লি সাং-হিউক। স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম এসবিএসকে তিনি বলেন, ‘শুধু যে একটি–দুটি খেতে এমন অবস্থা হয়েছে, তা নয়। আসলে কী করে যে এটা বলে বোঝাব। আমি ভীষণ হতাশ।’
লি সাং-হিউক বলেন, তিনি ৪০ বছর ধরে চাষাবাদ করছেন। এর আগে কখনো এমন পরিস্থিতি দেখেননি।
কাছের এলাকায় কয়েক হাজার পিয়ং পরিমাণ (কোরিয়ার হিসাবে এক পিয়ং প্রায় ৩ দশমিক ৩ বর্গমিটার) জায়গাজুড়ে থাকা বাঁধাকপির খেতও নষ্ট হয়ে গেছে। ভালো দামের আশায় সেখানকার কৃষকেরা ফসল তুলতে দেরি করছিলেন। প্রচণ্ড গরমে খেতেই বাঁধাকপি পুড়ে যায়। পরে ক্ষতিগ্রস্ত গাছগুলো মাটিতে চাষ দিয়ে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। নষ্ট হওয়া এসব বাঁধাকপির দাম ছিল কয়েক কোটি ওন।
যে গ্যাংওন প্রদেশে এই দুটি খামারের অবস্থান, সে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পাহাড়ি এলাকায় চলতি মাসে প্রথমবারের মতো প্রচণ্ড তাপপ্রবাহজনিত সতর্কতা জারি করা হয়েছে। প্রদেশটির চুনচন, হংচন ও হোয়ংসং শহরে এই সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
কৃষকেরা বলছেন, প্রচণ্ড গরমের কারণে শুধু সবজি নয়, ফলের বাগানেও প্রভাব পড়ছে। সরাসরি সূর্যের আলোয় আপেলের খোসা পুড়ে রং বদলে যাচ্ছে। পিচ ফলও ফেটে যাচ্ছে।
আপেলচাষি চন জং-তে এসবিএসকে বলেন, ‘সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে চুসক উৎসবের সময় যেসব আপেল পাকা ও রং ধরতে শুরু করার কথা ছিল, সেগুলোর স্বাভাবিক বৃদ্ধি থেমে গেছে। শুধু সূর্যের দিকে থাকা অংশ লাল হচ্ছে। তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকলে আপেলগুলো সাদা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।’
দক্ষিণ কোরিয়ার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রচণ্ড গরমে দেশটিতে অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ৯ লাখের বেশি গবাদিপশু এবং খামারে চাষ করা ১৪ লাখ মাছ মারা গেছে।
গত ২ আগস্ট দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ইয়াংসানে তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল। ১৯০৪ সালে আধুনিক পদ্ধতিতে তাপমাত্রা রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর এটি দক্ষিণ কোরিয়ার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। সে তুলনায়, যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ২০২২ সালের জুলাইয়ে লিংকনশায়ারের কনিংসবিতে রেকর্ড করা হয়েছিল।
প্রচণ্ড গরমে শুধু ফসলই নয়, কৃষকেরাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে ঘরের ভেতরে থাকার জন্য সরকারিভাবে যে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, তা মেনে চলা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, ততক্ষণে খেতের ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
পিচচাষি পার্ক ওন-সন বলেন, ‘তাঁরা (সরকার) আমাদের দিনের বেলায় বাইরে গিয়ে কাজ না করার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু পিচগুলো তো পচে যাচ্ছে।’
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং মন্ত্রিসভাকে বলেন, দেশটিতে এমন আবহাওয়া পরিস্থিতি আগে কখনো দেখা যায়নি। তিনি জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের আহ্বান জানান। লি জে মিয়ং বলেন, এ ধরনের চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতা হয়ে উঠছে।
এ পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব মূলত মৃত্যু ও গবাদিপশুর ক্ষতির ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। ফসলের কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা কর্মকর্তারা এখনো নির্ধারণ করতে পারেননি।
দক্ষিণ কোরিয়ায় খাদ্যপণ্যে দাম আগে থেকেই বেশি। কৃষকদের আশঙ্কা, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে দেশটিতে তিন দিনের শরৎকালীন ফসল উৎসব চুসককে সামনে রেখে মূল্য আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। এ সময় উৎসবের খাবারের জন্য পরিবারগুলো প্রচুর পরিমাণে খাদ্যপণ্য কেনে।
প্রচণ্ড গরমের কারণে ঝুঁকিতে থাকা ফসল হিসেবে গবেষকেরা যেসব ফসলকে চিহ্নিত করেছেন, আলু তার মধ্যে অন্যতম।
২০২৪ সালে পটেটো রিসার্চ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, দক্ষিণ কোরিয়ায় গ্রীষ্মকালীন আলু চাষের জন্য তাপসহনশীল আলুর জাত প্রয়োজন হবে। জার্মানির লাইবনিজ সেন্টার ফর অ্যাগ্রিকালচারাল ল্যান্ডস্কেপ রিসার্চ ও ব্রান্ডেনবুর্গ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির বিজ্ঞানীদের করা ওই গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বসন্তকালীন আলুর ক্ষেত্রে আগাম চাষের মধ্য দিয়ে ফলন ভালো হতে পারে।
ঝড়ের কারণে সাময়িক স্বস্তি আসার আগপর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ায় তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল। জাপানেরও কয়েকটি স্থানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি বা তার বেশি রেকর্ড করা হয়েছে।
হংকংয়ে তাপমাত্রা পৌঁছায় ৩৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা ১৮৮৪ সালে রেকর্ড রাখা শুরুর পর সর্বোচ্চ। চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলের একটি আবহাওয়া কেন্দ্রেও জুলাইয়ে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সাম্প্রতিক ‘স্টেট অব দ্য ক্লাইমেট ইন এশিয়া’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৩৫ বছরে এশিয়ায় উষ্ণতা বৃদ্ধির হার তার আগের তিন দশকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।