মানুষ জ্ঞানী হলেও সর্বজ্ঞ নয়। ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার জ্ঞানতত্ত্ব এই সত্যটিকে সামনে এনে মানুষের জানার পাশাপাশি 'না জানা'র গুরুত্বের ওপর জোর দেয়। এই দর্শনের মতে, জ্ঞানের প্রকৃত সীমারেখা উপলব্ধি করতে হলে মানুষের জানার আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে প্রজ্ঞা থাকা জরুরি। যে বিবেক নিজের সীমাকে অস্বীকার করে, তা ধীরে ধীরে জ্ঞান থেকে মতাদর্শে, অনুসন্ধান থেকে আধিপত্যে এবং প্রজ্ঞা থেকে অহংকারে রূপান্তরিত হয়। ফলে ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যায় জ্ঞানের সীমা নির্ধারণ করা সত্য অনুসন্ধানের একটি নৈতিক শর্ত হিসেবে গণ্য হয়।
এই দর্শনে বলা হয়েছে, "অন্তর্দৃষ্টি সত্যের একটি দরজা, কিন্তু একমাত্র দরজা নয়। যে দর্শন কেবল অনুভূতির ওপর দাঁড়ায়, সে শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে সর্বজনীন সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।"
অস্তিত্বের স্তরবিন্যাস অনুযায়ী সমগ্র কায়েনাত একই রকম বাস্তবতা দিয়ে গঠিত নয়। এর স্তরগুলো হলো— ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, বুদ্ধিগ্রাহ্য, অভিজ্ঞতাগ্রাহ্য, নৈতিক উপলব্ধি এবং গায়েবের স্তর। ফলে সব বাস্তবতাকে একই পদ্ধতিতে জানা সম্ভব নয়। পাথরের ঘনত্ব নির্ণয়ের পদ্ধতি দিয়ে ইনসাফের মর্যাদা বা নদীর প্রবাহ পরিমাপের উপায়ে মানুষের বাতিনের তাকওয়া পরিমাপ করা যায় না। একইভাবে, ভালোবাসার অনুভবের সাহায্যে দূরবর্তী নক্ষত্রের রাসায়নিক গঠন নির্ণয় করা সম্ভব নয়। বাস্তবতার স্তর ভিন্ন হলে জ্ঞানার্জনের পথও ভিন্ন হবে— এটাই ফিতরাতি জ্ঞানতত্ত্বের মৌলিক স্বীকৃতি।
পরীক্ষাগার জ্ঞানের একটি অপরিহার্য মাকাম হলেও তা সমগ্র জ্ঞানের একমাত্র আদালত নয়। পুনরাবৃত্ত পর্যবেক্ষণ, পরিমাপ ও পরীক্ষার আওতায় আসা পদার্থ, শক্তি, জীবপ্রক্রিয়া, পরিবেশগত পরিবর্তন কিংবা জৈবিক সম্পর্কের অনুসন্ধানে পরীক্ষাগার অতুলনীয়। তবে এর নিজস্ব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পরীক্ষাগার উদ্দেশ্যকে পরিমাপ করতে পারে না, অর্থকে ওজন করতে পারে না, সৌন্দর্যকে রাসায়নিক বিশ্লেষণে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করতে পারে না এবং নৈতিক কর্তব্যকে কোনো যন্ত্রের সূচকে রূপান্তর করতে পারে না। এটি অযোগ্যতার বিষয় নয়, বরং এটি তার আলোচ্য বিষয়ের বাইরের আলাপ।
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা কেবল অন্তর্দৃষ্টিকেও সর্বশক্তিমান মনে করে না। মানুষের অন্তর অনেক সময় সত্যের ইঙ্গিত দিলেও তা নফস, অভ্যাস, ভয় ও আকাঙ্ক্ষার আবরণে আচ্ছন্ন হতে পারে। তাই যে দর্শন কেবল অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে চলে, তা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে সর্বজনীন সত্য বানাতে চায়; আবার যে দর্শন কেবল পরিমাপের ওপর নির্ভরশীল, সে বাস্তবতার অদৃশ্য মাত্রাকে অস্বীকার করে। ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা এই উভয় চরমতা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখে।
এই প্রেক্ষাপটে ওহির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়। ওহি মানুষের অজানাকে বিলুপ্ত করতে আসে না, বরং অজানার প্রকৃতি সম্পর্কে সচেতন করে। সৃষ্টির চূড়ান্ত উদ্দেশ্য, মৃত্যুর পরবর্তী বাস্তবতা, হিসাব, জান্নাত, জাহান্নাম, ফেরেশতা, রূহের প্রকৃতি কিংবা আল্লাহর চূড়ান্ত সিফাতের মতো বিষয়ে মানুষের আকল প্রশ্ন করতে পারলেও পূর্ণ জ্ঞান হাসিল করতে পারে না। ওহি এখানে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে আকলের অপূর্ণতাকে পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনার সঙ্গে যুক্ত করে। তাই ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যায় ‘না জানা’ কোনো শরমের বিষয় নয়; বরং না জানাকে যথার্থভাবে কবুল করাই প্রকৃত ইলমের আলামত।
ইতিহাস সাক্ষী যে, "জ্ঞানের ইতিহাসে বহু বিপর্যয় ঘটেছে তখনই, যখন মানুষ সাময়িক জ্ঞানকে চূড়ান্ত জ্ঞান বলে ঘোষণা করেছে। একসময় বিজ্ঞান নিজেকে সব বাস্তবতার একমাত্র ভাষ্যকার মনে করেছে।"
আবার কখনো ধর্মীয় ব্যাখ্যার চার্চীয় রূপ নিজেদের সংশোধনের ঊর্ধ্বে ভেবেছে। উভয় ক্ষেত্রেই মূল সমস্যা ছিল জ্ঞানের অভাব নয়, বরং নিজেদের জ্ঞানের সীমা ভুলে যাওয়া। সীমা ভুলে যাওয়া মানেই মিজান হারিয়ে ফেলা। প্রকৃত আলেম যত শেখেন, ততই উপলব্ধি করেন যে অজানার সমুদ্র আরও প্রসারিত হচ্ছে। তাই ইলমের পরিণতি আত্মপ্রসাদ নয়, বরং তাওয়াদু বা বিনয়। যে জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করে না, তা হিকমায় উন্নীত হয় না।
এই বিনয়তত্ত্ব ব্যক্তিগত চরিত্রের পাশাপাশি সভ্যতার জন্যও প্রযোজ্য। যে সভ্যতা নিজের জ্ঞানকে চূড়ান্ত মনে করে, সে অন্য জ্ঞানধারাকে ধ্বংস করে এবং প্রকৃতি ও মানুষকে কেবল উপকরণে রূপান্তর করে। বিপরীতে, যে সভ্যতা নিজের সীমা স্বীকার করে, সে সংলাপ সৃষ্টি করে এবং ভুল সংশোধনের নৈতিক শক্তি অর্জন করে।
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার দৃষ্টিতে জ্ঞানের পরম শত্রু হলো সীমাহীনতার বিভ্রম। মানুষ যখন তার জানাকেই চূড়ান্ত মনে করে, তখন অনুসন্ধান থেমে যায় এবং প্রজ্ঞার পরিবর্তে মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সীমাবদ্ধতা মানুষের অপমান নয়, বরং খিলাফতের শর্ত। কারণ, "যে নিজেকে সীমিত জানে, সে ওহির প্রয়োজন অনুভব করে। যে ওহির প্রয়োজন অনুভব করে, সে সত্যকে নিজের মালিকানা নয়; বরং আল্লাহর আমানত হিসেবে ধারণ করতে শেখে।"
পরিশেষে, ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার জ্ঞানতত্ত্বে বিনয় একটি এপিস্টেমিক নীতি। মানুষ যখন উপলব্ধি করে যে সে সবকিছু জানতে জন্মায়নি, তখনই জ্ঞানের প্রকৃত দরজা খুলে যায়। এই উপলব্ধি আকলকে অহংকার থেকে মুক্ত করে অনুসন্ধানকে ইবাদতে রূপ দেয় এবং ইলমকে হিকমার মোহনায় নিয়ে যায়।