দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সুগন্ধি চালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও তীব্র চাহিদার প্রেক্ষিতে রপ্তানি প্রক্রিয়ায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। অনুমোদিত রপ্তানি কোটা কমানো বা সমন্বয়ের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রকৃত রপ্তানির তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। আজ বৃহস্পতিবার এই আদেশ জারি করা হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, "সুগন্ধি চালের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আগে দেওয়া রপ্তানি অনুমোদনের পরিমাণ কমানো বা সমন্বয় করা প্রয়োজন।"

মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি-২ শাখায় এই বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে হবে। আজ প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্তের কারণ এবং রপ্তানিকারকদের রপ্তানি না করার বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠান অনুমতি পাওয়ার পরও নির্ধারিত পরিমাণ চাল রপ্তানি করতে পারেনি বা আংশিক রপ্তানি করেছে, তাদের অব্যবহৃত কোটা পুনর্বিবেচনার আওতায় আসতে পারে।

এর আগে ২ আগস্ট বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে চালের উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং রপ্তানির প্রকৃত চিত্র পর্যালোচনা করা হয়। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রথম দফায় ১৩ মে ২১১টি এবং দ্বিতীয় দফায় ৬৭টি প্রতিষ্ঠানসহ মোট ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে ৪৫ হাজার ২৭০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে ২ আগস্টের সভায় উঠে আসে যে, অনেক প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত কোটা অনুযায়ী রপ্তানি করতে পারেনি, ফলে অনুমোদিত কোটা ও প্রকৃত রপ্তানির মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

বাজার পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দেশের শীর্ষ ১০টি বড় মিলমালিকের কাছে বিপুল পরিমাণ সুগন্ধি চাল মজুত রয়েছে। তাদের দাবি, বাজারে প্রয়োজন অনুযায়ী চাল না ছেড়ে কৃত্রিম সংকট তৈরির কারণেই দাম বেড়েছে। সব পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনার পর কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা ঠেকাতে কঠোর তদারকির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এজন্য জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে সঙ্গে নিয়ে বাজার তদারকি জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সরকার এখন যাচাই করবে রপ্তানির অনুমতি পেয়েও যারা নির্ধারিত পরিমাণ চাল পাঠাতে পারেনি, তাদের অব্যবহৃত কোটা বহাল রাখার যৌক্তিকতা আছে কি না। তথ্য যাচাইয়ের পর কোটা কমানো বা সমন্বয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, যাতে অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে এবং প্রকৃত সক্ষম রপ্তানিকারকরা সুযোগ পান।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সুগন্ধি চাল রপ্তানি করে আয় হয়েছিল ২৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা কমে ২০ লাখ ৬০ হাজার ডলার এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ১০ লাখ ৭০ হাজার ডলারে নেমে আসে। এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরে সরকার সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি স্থগিত করে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে বাংলাদেশ সুগন্ধি চাল রপ্তানি শুরু করে। প্রথম বছর ৬৬৩ টন রপ্তানির পরিমাণ ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১০ হাজার ৮৭৯ টনে উন্নীত হয়। দেশে বছরে ১৮ থেকে ২০ লাখ টন সুগন্ধি চাল উৎপাদিত হয় এবং গড়ে ১০ হাজার টন রপ্তানি হয়। বর্তমানে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্রুনেই, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিশ্বের ১৩০টির বেশি দেশে এই চাল রপ্তানি হচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের তালিকায় থাকা রপ্তানিযোগ্য সুগন্ধি চালগুলোর মধ্যে রয়েছে কালিজিরা, কালিজিরা টিপিএল-৬২, চিনিগুঁড়া, চিনি আতপ, চিনি কানাই, বাদশাভোগ, কাটারিভোগ, মদনভোগ, রাঁধুনিপাগল, বাঁশফুল, জটাবাঁশফুল, বিন্নাফুল, তুলসী মালা, তুলসী আতপ, তুলসী মণি, মধুমালা, খোরমা, সাককুর খোরমা, নুনিয়া, পশুশাইল ও দুলাভোগ।