নাম জুলাইবিব। শরীরের গড়ন ছিল ছোটখাটো; চেহারাও বিশেষভাবে আকর্ষণীয় বলে পরিচিত ছিলেন না। বংশপরিচয়ও ছিল অখ্যাত। মদিনার সমাজে তুলনামূলকভাবে তিনি ছিলেন অদৃশ্য এক মানুষ—যে কারণে কেউ তাঁকে গুরুত্ব দিতেন না, কথাও মনে রাখতেন না।

এই বাস্তবতাতেই ধারণা করা যেত, তিনি হয়তো সহজে বিয়ে করার সুযোগ পাবেন না। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ বলছে উল্টো কথা। মুসনাদে আহমাদে (হাদিস: ১৯৮১০) বর্ণিত হয়েছে—একদিন নবীজির দরবারে হঠাৎ করে জুলাইবিবের ডাক পড়ে। নবীজি তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, বিয়ে করতে চান কি না।

জুলাইবিব বিস্মিত হয়ে জবাব দেন—‘আমার কাছে মেয়ে বিয়ে দেবে কে? নবীজি (সা.) বুঝলেন, জুলাইবিবের ইচ্ছা থাকলেও পারিপার্শ্বিক কারণে হীনম্মন্যতা কাজ করছে তার মধ্যে।’

এরপর আর কথা না বাড়িয়ে নবীজি একটি আনসারি পরিবারের কাছে সরাসরি চলে যান। সেখানে মেয়ে যে কাউকে বিয়ে দিতে রাজি কি না—সেই প্রশ্ন তুলতে গিয়ে নবীজি মেয়ের বাবাকে বলেন, ‘তোমার মেয়েকে কি বিয়ে দেবে? তিনি ভাবলেন, নবীজি নিজেই বুঝি বিয়ে করতে চান। তৎক্ষণাৎ তিনি স্বচ্ছন্দে রাজি হয়ে গেলেন।’

কিন্তু নবীজি (সা.) পরিষ্কার করে দেন—‘আমার কাছে নয়, জুলাইবিবের কাছে।’ কথাটি শুনে মেয়ের বাবা কিছুটা হকচকিয়ে পড়ে যান। তিনি এরপর বলেন, ‘আমার স্ত্রীর সঙ্গে একটু পরামর্শ করে আসি। স্ত্রী শুনে সোজা না করে দিলেন।’

বিয়ে প্রসঙ্গটি পৌঁছে যায় এরপর খোদ কনের কাছেও। মা-বাবা দ্বিধাগ্রস্ত হলেও মেয়ে নিজেই এগিয়ে এসে কথা বলার উদ্যোগ নেন। তখনকার সমাজে বিয়ে নিয়ে মেয়েদের কথা বলা অস্বাভাবিক ছিল না। তিনি জানতে চান—প্রস্তাবটি কি মহানবী (সা.) নিজেই দিয়েছেন। উত্তরে বলা হয়, হ্যাঁ।

তখন মেয়ে বলেন, ‘তাহলে আর সময় নষ্টের কোনো অর্থ হয় না। তিনি যা সঠিক মনে করেছেন, আমার কাছেও তা-ই সঠিক। রহমতের নবী তিনি, কাউকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারেন না।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৯৮১০)

এরপর বিয়ে সম্পন্ন হয়। যে ব্যক্তিকে সমাজ বিয়ের জন্য অনুপযুক্ত ভাবছিল, নবীজির একটি কথাতেই তিনি আপন হয়ে ওঠেন এক দ্বীনদার পরিবারের দূরদর্শী কন্যার সঙ্গে।

এর কিছুদিন পর জিহাদের ডাক আসে। মুজাহিদ সাহাবিদের সঙ্গে সেই জিহাদে অংশ নেন জুলাইবিব (রা.) নিজেও। যুদ্ধ শেষে নবীজি (সা.) সাহাবিদের দিকে তাকিয়ে গুনতে শুরু করেন—কে শহীদ হয়েছেন, কতজন আহত হয়েছেন—তার হিসাব নিচ্ছেন।

হঠাৎ তিনি জিজ্ঞেস করেন—খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, এমন কেউ কি আছে তোমাদের মধ্যে? সাহাবিরা কয়েকজনের নাম জানান। নবীজি আবারও একই প্রশ্ন করলে তারা আরও কয়েকজনের নাম বলেন। তৃতীয়বারও একই প্রশ্ন করলে সাহাবিরা তখন জানিয়ে দেন, না, এমন কেউ আর নেই।

এ কথা শুনে নবীজি (সা.) বলেন, ‘কিন্তু আমি তো জুলাইবিবকে খুঁজে পাচ্ছি না। তাঁকে খুঁজে বের করো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৪৭২)

শুরু হয় জুলাইবিবকে খোঁজার কাজ। খুঁজতে খুঁজতে তাঁকে পাওয়া যায় শহীদদের মাঝে। ময়দানের এক পাশে পড়ে আছে মরদেহ; আর তাঁকে ঘিরে পড়ে আছে সাত শত্রুর লাশ। অর্থাৎ তিনি শেষনিঃশ্বাস পর্যন্ত সংগ্রাম করে গেছেন—বীরত্বের সঙ্গে।

নবীজি (সা.) সেখানে গিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়ান এবং বলেন—‘এক অবিস্মরণীয় কথা, সে আমার, আর আমি তার।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৪৭২)

এরপর নবীজি নিজ হাতে তুলে নেন জুলাইবিবের নিথর শরীর। খাটিয়া বা কারও সাহায্য ছাড়াই তিনি তাঁকে বহন করে নিয়ে যান কবর পর্যন্ত। শহীদদের গোসল দিতে হয় না; তাই সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় উল্লেখ আছে—‘তাই তাঁকে সে অবস্থায় কবর দিলেন তিনি নিজ হাতেই।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৪৭২)

জুলাইবিবের নামডাক মদিনায় ছিল না; বড়জোর কেউ চিনতেন না তাঁকে। সহায়-সম্পত্তিও ছিল না। তবু তিনি পেয়েছেন নবীজির এমন স্বীকৃতি, যার মূল্য এই পৃথিবী ও তার সব সম্পদের চেয়ে বেশি। নবীজির (সা.) যাঁকে নিজের বুকে টেনে নিয়েছেন—দুনিয়ায় যতই দাম থাকুক না কেন, আসমানে তা অনেক অনেক উচ্চে। এ কারণেই ইসলামের ইতিহাসে আজও তিনি অমর ও চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।