আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন’ (আইএইউ) চাঁদের পৃষ্ঠের বিভিন্ন গিরিখাত ও আগ্নেয়গিরির মুখের নামকরণ করেছে মধ্যযুগের ১৮ জন আরব ও মুসলিম বিজ্ঞানীর নামে। এই তালিকায় স্থান পেয়েছেন আল-বিরুনি, আল-খাওয়ারিজমি, ইবনে ইউনুস, ইবনে হাইসাম, ইবনে ফিরনাস, আল-ফরগানি, আল–বাত্তানি, নাসির উদ্দিন, আবু আল–ওয়াফা এবং ওমর খৈয়ামের মতো প্রথিতযশা ব্যক্তিত্বরা। উল্লেখ্য, মধ্যযুগের মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের লেখা পাণ্ডুলিপির মাত্র পাঁচ শতাংশ এ পর্যন্ত অনূদিত হলেও তা আধুনিক বিজ্ঞানকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে।

চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নেই, বরং সূর্যের প্রতিফলিত রশ্মির কারণেই আমরা চাঁদকে উজ্জ্বল দেখি—এই সত্যটি প্রথম প্রমাণ করেছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইবনে হাইসাম। চাঁদের পৃষ্ঠের অস্পষ্ট দাগ বা ছোপ নিয়ে তৎকালীন প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণাগুলো খণ্ডন করে তিনি তাঁর কালজয়ী গবেষণা ‘মাহিয়্যাতুল আসার আল্লাজি ইয়াজহারু আলা ওয়াজহিল কামার’ রচনা করেন। এতে তিনি গাণিতিকভাবে দেখান যে, চাঁদের উপাদান নক্ষত্রের মতো আলো উৎপন্ন করে না এবং এর ভেতরের ঘনত্বের তারতম্যের কারণেই সূর্যরশ্মি প্রতিফলনের পর কিছু অংশ তুলনামূলক অন্ধকার দেখায়। এছাড়া ‘ফি আদওয়ায়িল কাওয়াকিব’ গ্রন্থে তিনি উল্লেখ করেন, মহাবিশ্বের অন্যান্য তারকারাজি নিজস্ব আলোতে উজ্জ্বল হলেও চাঁদ সম্পূর্ণরূপে সূর্যের ওপর নির্ভর করে। ইবনে আল-হাইসামের বায়ুমণ্ডলীয় প্রতিসরণ ও লেন্সসংক্রান্ত এই মৌলিক গবেষণাই পরবর্তীতে গ্যালিলিওকে দূরবীক্ষণ যন্ত্র (টেলিস্কোপ) আবিষ্কারে অনুপ্রাণিত করেছিল। (আলী আবদুল্লাহ আল-দিফা, আলামুল ফিজিয়া ফিল ইসলাম, পৃষ্ঠা: ১৬৮, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৮৫)

চাঁদের আবর্তন গতির সূক্ষ্ম তারতম্য বা অসঙ্গতি চিহ্নিত করে গাণিতিক সমীকরণে প্রকাশ করেছিলেন বাগদাদের জ্যোতির্বিজ্ঞানী আবু আল-ওয়াফা। উনবিংশ শতকে ফরাসি অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধানে এই বিষয়টি প্রমাণিত হয়। (এল. এ. সেদিও, তারিখুল আরব আল-আম, পৃষ্ঠা: ৩৪৬, দারু ইহইয়ায়িল কুতুবিল আরাবিয়্যা, কায়রো, ১৯৪৮)

মিসরের ফাতেমীয় আমলের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইবনে ইউনুস মোকাত্তম পাহাড়ের চূড়ায় স্থাপিত পর্যবেক্ষণাগার থেকে চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণের ওপর দীর্ঘ গবেষণা চালান। তিনি চন্দ্রগতির ত্বরান্বিত হার এবং ক্রান্তিবৃত্তের হেলানো কোণ এত সূক্ষ্মভাবে হিসাব করেছিলেন যে তা আধুনিক যন্ত্রের পরিমাপের প্রায় কাছাকাছি। (কাদরি তুকান, তুরাসুল আরবিল ইলমি ফির রিয়াদিয়্যাতি ওয়াল ফালাক, পৃষ্ঠা: ২৪৩, জামিআত আদ–দুওয়াল আরাবিয়া, কায়রো, ১৯৫৪)

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তি গ্রহ-উপগ্রহের উপবৃত্তাকার (ইলিপটিক্যাল) কক্ষপথ। সমরকন্দ পর্যবেক্ষণাগারের প্রধান জ্যোতির্বিজ্ঞানী গিয়াসুদ্দিন জামশিদ গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেছিলেন যে চাঁদ এবং বুধ গ্রহের কক্ষপথ বৃত্তাকার নয়, বরং উপবৃত্তাকার। (আলী আবদুল্লাহ আল-দিফা, নাওয়াবিগু উলামায়িল আরাব ওয়াল মুসলিমিন ফির রিয়াদিয়্যাত, পৃষ্ঠা: ২০৬, দারুল ইতসাম, কায়রো, ১৯৮০)

আন্দালুসীয় বিজ্ঞানী ইবনে আল-জারকালি (ইউরোপে ‘আরজাখেল’ নামে পরিচিত) অ্যাস্ট্রোল্যাব যন্ত্রে বিশেষ পাত বা ‘সফিহা’ যুক্ত করে চাঁদের গতিপথ অনুশীলনের নতুন পথ দেখান। কপারনিকাসের সময় পর্যন্ত ইউরোপের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা না থাকায় আল-জারকালি ও আল-বাতানির প্রস্তুতকৃত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সারণি ব্যবহার করতেন। (জিগ্রিড হুনকে, শামসুল আরব তুশরিকু আলাল গারব, পৃষ্ঠা: ১৪৪, দারু সাদির, বৈরুত, ২০০০)

ইউরোপের জ্যোতির্বিজ্ঞানের রূপকার নিকোলাস কপারনিকাস তাঁর ‘ডি রেভোলুশনিবাস’ গ্রন্থে স্বীকার করেছেন যে তাঁর সৌরকেন্দ্রিক তত্ত্বের গাণিতিক মডেল তৈরিতে তিনি মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানী আল-বাতানি, নাসিরুদ্দিন আল-তুসি এবং সিরিয়ার ইবনে আশ-শাতিরের গবেষণার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করেছেন। (জাফর আল-আরশাদি, আত-তাফাউকুল ইলমি ফিল ইসলাম, পৃষ্ঠা: ১০১, মুয়াসসাসাতুল বালাগ, বৈরুত, ১৯৯০)

এমনকি ইউরোপীয় বিজ্ঞানী উইতেলোর আলো সংক্রান্ত বিখ্যাত গ্রন্থটি মূলত ইবনে হাইসামের ‘কিতাবুল মানাজির’ গ্রন্থের দ্বারা ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত ছিল, যা পরবর্তীতে কেপলারকে গ্রহের গতির সূত্র আবিষ্কারে সাহায্য করেছিল।