খাগড়াছড়িতে এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে হতাশাজনক চিত্র। জেলার তিনটি উচ্চবিদ্যালয় থেকে অংশ নেওয়া কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। বিদ্যালয় তিনটি হলো—সদর উপজেলার ভাইবোনছড়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, দীঘিনালা উপজেলার জারুলছড়ি হেডম্যানপাড়া উচ্চবিদ্যালয় এবং একই উপজেলার তারাবুনিয়া উচ্চবিদ্যালয়।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এবার খাগড়াছড়িতে এসএসসি পরীক্ষায় মোট ৭ হাজার ৭৭৮ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে পাস করেছে ২ হাজার ৭৬৬ জন। ফলে জেলায় সামগ্রিক পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৫৬ শতাংশে।
এমন ফলাফলে স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিভাবকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, শিক্ষকদের পাঠদানের পরিবেশ উন্নত করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি সহযোগিতার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
সদর উপজেলার ভাইবোনছড়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাবি, তাদের বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী দুর্গম এলাকার বাসিন্দা, ফলে অনেক অভিভাবকই সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠান না। এছাড়া বিদ্যালয়টি তিন বছর আগে নিবন্ধিত হলেও প্রধান শিক্ষক ছাড়া বাকি ১৩ জন শিক্ষক নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না, যা শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা ও অনিহা তৈরি করেছে।
ভাইবোনছড়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক দীপেন চাকমা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "আমাদের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ দুর্গম এলাকা থেকে আসে। বেশির ভাগ সময় তারা বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিত হতে পারে না। শিক্ষকদের বেতন-ভাতার বিষয়টিও দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চিত। এসব কারণে পাঠদানের পরিবেশে প্রভাব পড়ছে। তবে আমরা শিক্ষার্থীদের ফলাফল উন্নয়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।"
একই স্কুলের আরেক সহকারী শিক্ষক মিনুচিং মারমা জানান, এ বছরের শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত দুর্বল ছিল এবং অভিভাবকদের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, "আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। আমরা পরীক্ষার ২ মাস আগে থেকে আলাদাভাবে ক্লাস নেওয়া ও স্কুলে রেখে পড়ানোর সিদ্ধান্ত নিই। এতেও কোনো সাড়া পাইনি। যার কারণে হয়তো আজকের এই পরিণতি।"
শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ক্যহ্লাচিং মারমা মুক্তকণ্ঠকে জানান, "আমরা চাই সন্তানরা ভালোভাবে পড়াশোনা করুক। কিন্তু দুর্গম এলাকায় যাতায়াতের সমস্যা আছে। স্কুলে নিয়মিত ক্লাস ও শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেলে ফলাফল অনেক ভালো হবে।"
আরেক অভিভাবক মিলন চাকমা বলেন, "শুধু শিক্ষার্থীদের দায়ী করলে হবে না। বিদ্যালয়ের পরিবেশ, শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা এবং অভিভাবকদের সচেতনতা সবকিছু একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে শিক্ষকদের।"
ভাইবোনছড়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাধন চাকমা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "আমাদের বিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ভোকেশনাল শিক্ষা চালু আছে। এবারে এসএসসি পরীক্ষায় ১৭ জন শিক্ষার্থী সাধারণ শাখা হতে বাকি ৯ জন শিক্ষার্থী ভোকেশনাল হতে অংশ নেয়। তারমধ্যে ৪ জন শিক্ষার্থী ভোকেশনাল থেকে পাস করেন। তবে সাধারণ শাখা হতে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি। তবে এবারে পরীক্ষায় খারাপ করা আমরা শিক্ষার্থীদের দুর্বল বিষয়গুলো চিহ্নিত করে বিশেষ ক্লাস, নিয়মিত পরীক্ষা ও অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছি। আগামীতে যাতে এ ধরনের ফলাফল না হয়, সেজন্য বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।"
খাগড়াছড়ি জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র সিকদার মুক্তকণ্ঠকে জানান, "ফলাফল পর্যালোচনা করে যেসব বিদ্যালয়ে ফলাফল আশানুরূপ হয়নি, সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান, শিক্ষকদের পাঠদান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও অভিভাবকদের সম্পৃক্ততার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। দুর্বল বিদ্যালয়গুলোকে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় একাডেমিক সহায়তা ও মনিটরিং জোরদার করা হবে।"
তবে শহরের বিদ্যালয়গুলোর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। খাগড়াছড়ি ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৬৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১৬২ জন। এর মধ্যে ৬৫ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।
জেলার এই দুই ধরনের ফলাফলের ব্যবধান শিক্ষার মান, পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং সুযোগ-সুবিধার বৈষম্যকে স্পষ্ট করে তুলেছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ না নিলে এই বৈষম্য আরও প্রকট হতে পারে।