বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় কিছু প্রতিষ্ঠান এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি অতিক্রম করে জাতীয় নীতিতে পরিণত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে অবস্থান করছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি শুধু শিক্ষার্থী নির্বাচন করে না, বরং দেশের শিক্ষা-দর্শন, মেধা মূল্যায়নের মানদণ্ড এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষানীতির দিকনির্দেশনাও প্রদান করে। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা সংক্রান্ত যেকোনো নীতিগত পরিবর্তন কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি জাতীয় প্রশ্ন।
সম্প্রতি ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় পৃথক প্রশ্নপত্র প্রণয়নের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের কাছে এটি হয়তো একটি ছোট প্রশাসনিক সমন্বয় বলে মনে হতে পারে, কিন্তু এর প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী। আমি বিশ্বাস করি, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বাংলাদেশের অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা, জাতীয় শিক্ষাক্রম (এনসিটিবি–NCTB) এবং সমান প্রতিযোগিতার নীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
আমার অবস্থানটি হয়তো অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হতে পারে, যেহেতু আমি নিজেই দুটি আন্তর্জাতিক (ইংরেজি মাধ্যম) বিদ্যালয় পরিচালনা করি। বাস্তবতা হলো, ইংরেজি মাধ্যমের জন্য যদি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা সুবিধা সৃষ্টি করে, তাহলে ব্যক্তিগতভাবে সেটি আমার প্রতিষ্ঠানের জন্য লাভজনক হতে পারে। তবে, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি মনে করি, জাতীয় স্বার্থকে ব্যবসায়িক লাভের চেয়ে বড় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। যে নীতি আমার প্রতিষ্ঠানের জন্য লাভজনক হলেও দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, সেই নীতিকে সমর্থন করা নৈতিকভাবে সঠিক নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৬–২৭ শিক্ষাবর্ষে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে ভর্তি পরীক্ষায় বিজ্ঞান ইউনিটের ক্ষেত্রে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার্থীদের কারিকুলাম অনুযায়ী আলাদা প্রশ্নপত্র প্রণয়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ভর্তি পরীক্ষার আবেদন ১১ নভেম্বর থেকে শুরু হবে এবং পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ৫ ডিসেম্বর।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে, একই পাঠ্যক্রম পড়বে, একই শিক্ষক দ্বারা মূল্যায়িত হবে, একই ডিগ্রি অর্জন করবে—কিন্তু ভর্তি পরীক্ষায় ভিন্ন প্রশ্নপত্র? এটি শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যতিক্রম নয়; এটি উচ্চশিক্ষায় একক একাডেমিক মানদণ্ড ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা কোনো নির্দিষ্ট বোর্ডের পাঠ্যবই পরীক্ষা করে না। এটি প্রার্থীর বিশ্লেষণী ক্ষমতা, ধারণাগত দক্ষতা, ভাষাগত সক্ষমতা এবং উচ্চশিক্ষার উপযোগিতা যাচাই করে। সুতরাং প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘কোন বোর্ডে পড়েছ?’ নয়; বরং ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার যোগ্যতা অর্জন করেছ কি না?’ যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের মানদণ্ড এক হয়, তবে মূল্যায়নের মানদণ্ডও এক হওয়া উচিত।
যাঁরা পৃথক প্রশ্নপত্রের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন, তাঁদের কাছে একটি সরল প্রশ্ন-বিশ্বের কোন শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় একই ভর্তি পরীক্ষায় বিভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার জন্য পৃথক প্রশ্নপত্র ব্যবহার করে? যুক্তরাজ্যে শিক্ষার্থীরা এ লেভেল, আন্তর্জাতিক ব্যাকালোরিয়েট, স্কটিশ হাইয়ার (A Level, International Baccalaureate–IB, Scottish Highers) কিংবা বিদেশি কারিকুলাম থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় তাঁদের জন্য পৃথক ভর্তি প্রশ্নপত্র তৈরি করে না। যুক্তরাষ্ট্রে পঞ্চাশটি অঙ্গরাজ্যে ৫০ রকমের স্কুল কারিকুলাম রয়েছে। তবু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি মূল্যায়নে স্যাট, এসিটি (SAT, ACT) কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পরীক্ষায় কোনো ‘স্টেটভিত্তিক’ প্রশ্নপত্র নেই। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া কিংবা কানাডা—কোথাও বিশ্ববিদ্যালয় বলে না, ‘তুমি যে বোর্ডে পড়েছ, সেই বোর্ড অনুযায়ী আমরা প্রশ্ন বদলে দেব।’ কারণ বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলের ধারাকে নয়, শিক্ষার্থীর সক্ষমতাকে মূল্যায়ন করে।
আজ যদি ইংরেজি মাধ্যমের জন্য পৃথক প্রশ্নপত্র হয়, আগামীকাল মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডও একই দাবি করবে। তাদের যুক্তিও হবে—‘আমাদের পাঠ্যক্রম আলাদা।’ এরপর কারিগরি শিক্ষা বোর্ড একই দাবি তুলবে। আন্তর্জাতিক ব্যাকালোরিয়েট শিক্ষার্থীরাও দাবি করতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয় কি তখন প্রত্যেক শিক্ষাধারার জন্য আলাদা আলাদা প্রশ্নপত্র তৈরি করবে?
বাংলাদেশে জাতীয় শিক্ষাক্রম কেবল একটি পাঠ্যক্রম নয়; এটি রাষ্ট্রের শিক্ষা-দর্শনের ভিত্তি। যখন দেশের সর্বোচ্চ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কার্যত ঘোষণা করবে যে জাতীয় কাঠামোর বাইরে থাকা একটি শিক্ষাধারার জন্য বিশেষ প্রশ্নপত্র প্রয়োজন, তখন অভিভাবকদের কাছে কী বার্তা পৌঁছাবে? বার্তাটি হবে জাতীয় শিক্ষাক্রম যথেষ্ট নয়। এটি এনসিটিবির প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে। একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত কখনো কখনো হাজার বিজ্ঞাপনের চেয়েও বেশি প্রভাব সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক শিক্ষা বোর্ড পরিচালনা করে বিদেশি প্রতিষ্ঠান। প্রতি বছর পরীক্ষা ফি, বই, প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন সেবার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যায়। এটি স্বাভাবিক আন্তর্জাতিক শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ। কিন্তু রাষ্ট্র যদি এমন নীতি গ্রহণ করে, যার ফলে বিদেশি কারিকুলামের বাজার আরও সম্প্রসারিত হয়, তাহলে সেই নীতির অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করাও জরুরি। এখানে প্রশ্নটি কোনো ষড়যন্ত্রের নয়। প্রশ্নটি হলো নীতিটি কাদের জন্য প্রণোদনা তৈরি করছে? কে লাভবান হবে? জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা, নাকি আন্তর্জাতিক শিক্ষা-ব্যবসার বাজার? যেকোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের উচিত এ ধরনের নীতির দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন করা।
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের সমান সুযোগের কথা বলে। সমান সুযোগ মানে সবার জন্য আলাদা মানদণ্ড নয়। বরং একই প্রতিযোগিতায় একই মানদণ্ড। যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের দরজা এক হয়, তবে সেই দরজার চাবিও এক হওয়া উচিত।
ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের কিছু বাস্তব সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কিন্তু সেই সমস্যার সমাধান কখনোই পৃথক প্রশ্নপত্র প্রবর্তন হতে পারে না। ভর্তি পরীক্ষায় সমতার নীতি অক্ষুণ্ন রেখেই এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান করা সম্ভব। বরং নীতিনির্ধারকদের উচিত: ভর্তি পরীক্ষার সিলেবাস আরও স্পষ্ট ও স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা; প্রশ্নের ভাষা ও নির্দেশনা আরও নির্ভুল ও দ্ব্যর্থহীন করা; পর্যাপ্ত নমুনা প্রশ্ন ও পরীক্ষার কাঠামো প্রকাশ করা; মূল্যায়ন পদ্ধতিকে আরও বৈজ্ঞানিক, নিরপেক্ষ ও মানসম্মত করা; সব শিক্ষার্থীর জন্য সমান তথ্যপ্রাপ্তি ও প্রস্তুতির সুযোগ নিশ্চিত করা; জাতীয় ও ইংরেজি মাধ্যমের পাঠ্যক্রমের মধ্যে বিদ্যমান দক্ষতার ব্যবধান কমাতে দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক সংস্কার গ্রহণ করা।
বাংলাদেশের শিক্ষা নীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া, যাতে দেশের অভিভাবকদের বিদেশি কারিকুলামের দিকে ঝুঁকতে না হয়। একটি রাষ্ট্র কখনো নিজের শিক্ষাব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে বিকল্প শিক্ষাধারাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খোঁজে না; বরং নিজের ব্যবস্থাকেই আরও শক্তিশালী, আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে তোলে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের মেধার সর্বজনীন প্রতীক। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত শিক্ষার্থীদের উৎস নয়, যোগ্যতা মূল্যায়ন। আজ যদি আমরা ভর্তি পরীক্ষার মানদণ্ড ভেঙে ফেলি, আগামীকাল হয়তো জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার অভিন্ন ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়বে। আমি জানি, এই সিদ্ধান্তে আমার প্রতিষ্ঠানসহ আন্তর্জাতিক শিক্ষাক্রমে পরিচালিত অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্বল্প মেয়াদে উপকৃত হতে পারে। নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ বাড়তে পারে, বাজার সম্প্রসারিত হতে পারে। কিন্তু একজন শিক্ষক এবং দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি আরও বড় একটি সত্য জানি, কোনো নীতি যদি একটি জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করে, তবে সেই সাময়িক লাভের কোনো মূল্য নেই। ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থকে স্থান দেওয়াই একজন নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। কোনো শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য তখনই অর্থবহ, যখন তা পুরো জাতির শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে; দুর্বল করে নয়।