মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল সোমবার একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। এতে স্কুলে শিক্ষার্থীদের টিকা নেওয়া বাধ্যতামূলক করার নীতিগুলো নতুন করে পর্যালোচনার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে হাম, মাম্পস ও রুবেলার সমন্বিত টিকা (এমএমআর)–কে তিনটি আলাদা টিকা হিসেবে দেওয়ার দাবিও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
চিকিৎসাবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের একাংশ এই উদ্যোগকে বৈজ্ঞানিকভাবে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে পদক্ষেপটি জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
মার্কিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র টিকার ওপর কড়াকড়ি আরোপকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকারের জায়গায় রেখেছেন। তিনি টিকাবিরোধী একটি অলাভজনক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা। রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র দীর্ঘদিন ধরে প্রচার করে আসছেন, টিকা নেওয়ার সঙ্গে অটিজমের সম্পর্ক রয়েছে—যা বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল প্রমাণ হয়েছে।
ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে যে কয়েকটি বিষয়ে সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর কিছুতে কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই। স্কুলে ভর্তি বা পড়াশোনা করার জন্য শিক্ষার্থীদের টিকা নেওয়া বাধ্যতামূলক করা—এ ধরনের ক্ষমতা অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে। সে কারণে এসব ক্ষেত্রে ট্রাম্পের পদক্ষেপকে সরাসরি আদেশের চেয়ে পরামর্শ বা সুপারিশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আদেশে বলা হয়েছে, ‘স্কুলে ভর্তি ও উপস্থিতির মতো ক্ষেত্রে টিকা দেওয়ার বাধ্যবাধকতার বিষয়ে’ ট্রাম্প প্রশাসনের সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করতে অঙ্গরাজ্য ও অঞ্চলগুলোকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ একটি টাস্কফোর্স গঠন করবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এই টাস্কফোর্স বেসরকারি খাত ও প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য দেশের সঙ্গে কাজ করবে। তারা এমএমআর নামের সমন্বিত টিকাটিকে তিনটি আলাদা টিকা হিসেবে দেওয়ার উদ্যোগ নেবে। তবে সমন্বিত টিকা এবং চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় টিকাগুলোর সরবরাহ অব্যাহত রাখার কথাও আদেশে আছে।
নিউইয়র্ক নগরের স্বাস্থ্যবিষয়ক কমিশনার অ্যালিস্টার মার্টিন বলেছেন, ‘রাজনীতি ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ওপর’ ভিত্তি করে এই নির্বাহী আদেশ দেওয়া হয়েছে। এক বিবৃতিতে মার্টিন বলেন, ‘সৌভাগ্যক্রমে, টিকা দেওয়ার সুপারিশ প্রেসিডেন্ট নির্ধারণ করেন না, আর তা করা উচিতও নয়।’
এ ছাড়া ট্রাম্প নিজেও বলেছেন, ‘শহর ও অঙ্গরাজ্যগুলো নিজেদের টিকা দেওয়ার সুপারিশ ও বাধ্যতামূলক নিয়ম নির্ধারণ করতে পারে। নিউইয়র্ক নগরসহ অনেক জায়গা কেন্দ্রীয় সরকারের সুপারিশ থেকে সরে এসেছে। কারণ, দিন দিন সেসব সুপারিশ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ও বৈজ্ঞানিকভাবে ভিত্তিহীন হয়ে পড়েছে।’
বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণায় বলা হয়েছে, এমএমআর–এর সমন্বিত টিকা নিরাপদ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, সমন্বিত টিকা শিশুদের দ্রুত বেশি সুরক্ষা দেয় এবং যেসব মা–বাবার পক্ষে বারবার টিকার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া কঠিন, তাদের ঝামেলাও কমায়।
ওভাল অফিসে নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষরের সময় ট্রাম্প ওই সুপারিশের বিপরীতে একাধিক উসকানিমূলক ও ভিত্তিহীন বক্তব্য দেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু রেসিন বলেন, ‘ যুক্তরাষ্ট্রে এমএমআর টিকার তিনটি উপাদান আলাদা করে আলাদা আলাদা টিকা তৈরি ও অনুমোদন পেতে এক দশকের বেশি সময় লাগতে পারে।’
চিকিৎসক ও সিনেটর বিল ক্যাসিডি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে লিখেছেন, প্রেসিডেন্টের এই উদ্যোগ টিকার প্রতি মানুষের অনীহা বৃদ্ধি করবে এবং শিশুরা আরও কম নিরাপদ হয়ে পড়বে। ক্যাসিডি বলেন, ‘এই নির্বাহী আদেশটি ভুল। প্রেসিডেন্টের এসব পরিবর্তন করার মতো বিশেষজ্ঞ জ্ঞান নেই। টিকা অত্যন্ত নিরাপদ। টিকা কার্যকর। টিকা অটিজম তৈরি করে না।’
ট্রাম্প প্রশাসন এমন সময়ে টিকা নীতিতে বড় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে, যখন চলতি বছরের শুরুতে একটি ফেডারেল আদালত এসব পরিবর্তন বাস্তবায়নের চেষ্টা আটকে দিয়েছে। আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে। আদালতের দেওয়া সিদ্ধান্তটি কয়েকটি বড় চিকিৎসা সংগঠনের পক্ষে গেছে। এসব সংগঠন বলেছিল, পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়নে ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপ আইনসম্মত নয়।
ট্রাম্পের নতুন নির্বাহী আদেশটি এমন সময়ে দেওয়া হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রে গত ৩৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব চলছে। ট্রাম্পের স্বাস্থ্যমন্ত্রী কেনেডির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি টিকাবিরোধী মনোভাব ছড়িয়ে এবং নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণিত টিকা নিয়ে মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করে সংকট বাড়াচ্ছেন।
জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, এখনো বেশির ভাগ মার্কিন নাগরিক টিকাদানের পক্ষে। গত কয়েক মাসে কেনেডি ও ট্রাম্প দুজনই টিকাবিরোধী বক্তব্য থেকে কিছুটা সরে এসেছিলেন। এ ধরনের বক্তব্য নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—এ কারণেই তারা সরে এসেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে গতকাল সোমবার ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে, বিষয়টি এখনো তাঁদের স্বাস্থ্যনীতি কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ, দুজনই এখনো এই মিথ্যা ধারণায় বিশ্বাস করেন যে টিকা নেওয়ার কারণে অটিজম হতে পারে। যদিও বহু বছরের গবেষণায় ধারণাটি ইতিমধ্যেই ভুল প্রমাণিত হয়েছে।