ঢাকা ছেড়ে আসা আখাউড়াগামী তিতাস কমিউটার ট্রেন গত ১৭ জুলাই ভৈরব রেলসেতুতে উঠতে গিয়ে আটকে যায়। একাধিকবার চেষ্টা করেও ট্রেনটি সেতু পার হতে পারেনি। পরে বিকল্প ইঞ্জিন এনে আড়াই ঘণ্টা দেরিতে ট্রেনটি সেতু পার হয়।
ভৈরব রেলসেতুতে উঠতে গিয়ে সম্প্রতি এমন সমস্যায় পড়ছে বিভিন্ন ট্রেন। কখনো কখনো ট্রেনকে ভৈরব স্টেশনে ফিরিয়ে এনে দ্বিতীয় বা তৃতীয় চেষ্টায় সেতু পার হতে হচ্ছে। কখনো কখনো বিকল্প ইঞ্জিন এনে ট্রেন চালাতে হয়। এতে একেকটি ট্রেনের আধা ঘণ্টা থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত দেরি হচ্ছে। এতে ট্রেনের সময়সূচি ঠিক রাখা যাচ্ছে না।
ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-নোয়াখালীসহ পূর্বাঞ্চলীয় রেলপথের প্রায় সব ট্রেনকে ভৈরব রেলসেতু অতিক্রম করতে হয়। ভৈরব স্টেশন থেকে সেতুর দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার। এই রেলপথ বেশ উঁচু। চলতি বছরের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত—গত তিন মাসে অন্তত ছয়বার বিভিন্ন ট্রেন ভৈরব রেলসেতুতে উঠতে ব্যর্থ হয়।
রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, প্রয়োজনীয় ট্রাকশন (একধরনের যন্ত্র, যার শক্তিতে ট্রেনের চাকা ঘোরে) মোটর না থাকাই এ সমস্যার মূল কারণ। একটি লোকোমোটিভে (রেল ইঞ্জিন) চারটি ট্রাকশন মোটর থাকার কথা থাকলেও কোনোটিতে দুটি-তিনটি কিংবা একটি মোটর সচল আছে। ফলে ইঞ্জিন পূর্ণ শক্তি পাচ্ছে না। ভৈরব স্টেশনে থামার পর ট্রেনকে অল্প দূরত্বের মধ্যে নতুন করে গতি তুলে সেতুর ঢাল বেয়ে উঠতে গিয়ে এ সমস্যা হচ্ছে।
.তিন মাসে আটকে গেছে ছয়বার
ভৈরবের স্টেশনমাস্টারের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জুলাই চট্টগ্রামগামী ‘মহানগর এক্সপ্রেস’ ট্রেন বেলা ১১টা ১৮ মিনিটে ভৈরব স্টেশন ছেড়ে যায়। কিন্তু সেতুতে উঠতে ব্যর্থ হয়ে ট্রেনটি ১১টা ৩৩ মিনিটে আবার স্টেশনে ফিরে আসে। এরপর ১১টা ৪০ মিনিটে আবার যাত্রা করে ট্রেনটি সফলভাবে সেতু পার হয়। ৯ জুলাই একই ট্রেন আবার সেতুতে উঠতে ব্যর্থ হয়। ১৭ জুলাই আখাউড়াগামী তিতাস কমিউটার ট্রেন একাধিকবার চেষ্টা করেও সেতুতে উঠতে পারেনি। এর আগে গত জুন মাসে এ রকম বিপত্তি ঘটে দুবার। ১০ জুন মহানগর গোধূলী ট্রেন প্রায় ১৯ মিনিট ভৈরব সেতুর আগে আটকে থাকে। এ ছাড়া গত ২৬ জুন চট্টগ্রামগামী চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেন রাত ৯টা ২০ মিনিটে ভৈরব স্টেশন ছেড়ে কিছুক্ষণের মধ্যে আবার ফিরে আসে। পরে এক ঘণ্টা দেরিতে ট্রেনটি সেতু পার হয়। তার আগে গত ১৭ মে তূর্ণা নিশীথা এক্সপ্রেস ট্রেন রাত আড়াইটায় ভৈরব স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার পর সেতুতে উঠতে না পেরে ফিরে আসে। এর এক ঘণ্টা পর ট্রেনটি সেতু অতিক্রম করে।
.লোকোমোটিভ বা রেল ইঞ্জিনে প্রয়োজনীয় ট্রাকশন মোটর না থাকাই এ সমস্যার মূল কারণ।মুহাম্মদ কুদরত-ই-খুদা, যুগ্ম মহাপরিচালক (যান্ত্রিক), বাংলাদেশ রেলওয়ে
ভৈরবের স্টেশন মাস্টার ইউসুফ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, কনটেইনার ট্রেনে বগি ও মালামালের ওজন বেশি থাকায় আগে এমন সমস্যা হতো। কিন্তু এখন যাত্রীবাহী ট্রেনের ইঞ্জিনে ট্রাকশন মোটর কম থাকায় এ সমস্যা হচ্ছে। ট্রেনে আসনের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি যাত্রী পরিবহনের বিষয়টিও যুক্ত। প্রতিটি ঘটনায় যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ে। একটি ট্রেন বিলম্বিত হলে পরবর্তী ট্রেনগুলোর শিডিউলও (সূচি) বিঘ্নিত হয়।
.সংকটের নেপথ্যে কী
রেলওয়ের যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ভৈরব স্টেশনে যেসব ট্রেন থামে, সেগুলোতেই এ সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে। স্টেশন থেকে সেতুর দূরত্ব এক কিলোমিটার। সেতু পর্যন্ত এই এক কিলোমিটার পথ বেশ উঁচু। মূলত উঁচু এই পথে উঠতে গিয়ে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। যেসব ট্রেন স্টেশনে না থেমে পূর্ণ গতিতে চলে যায়, সেগুলো সাধারণত এ সমস্যায় পড়ে না।
বাংলাদেশ রেলওয়ের যুগ্ম মহাপরিচালক (যান্ত্রিক) মুহাম্মদ কুদরত-ই-খুদা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, লোকোমোটিভ বা রেল ইঞ্জিনে প্রয়োজনীয় ট্রাকশন মোটর না থাকাই এ সমস্যার মূল কারণ।
.ট্রাকশন মোটর হলো এমন একটি বৈদ্যুতিক মোটর, যা বৈদ্যুতিক শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তর করে ট্রেনের চাকা ঘোরায়। ট্রেনকে টানার জন্য প্রয়োজনীয় টর্ক বা ঘূর্ণনবলও সরবরাহ করে ট্রাকশন। একটি লোকোমোটিভে প্রয়োজনীয়সংখ্যক ট্রাকশন মোটর সচল না থাকলে ইঞ্জিন তার পূর্ণ ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে না। ফলে ঢালু পথে ভারী ট্রেন টানতে গিয়ে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টি ও শীতকালে ঘন কুয়াশায় রেললাইন পিচ্ছিল হয়ে গেলে এ সমস্যা আরও বেড়ে যায়।
রেলওয়ের চট্টগ্রামের প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলী (পূর্ব) সাদেকুর রহমান বলেন, আগে শীতকালে সমস্যা বেশি হতো। এখনো সংকট পুরোপুরি কাটেনি। লোকোমোটিভে ট্রাকশন মোটরের ঘাটতি ও দক্ষ লোকোমাস্টারের অভাবেরÑকারণে এ সমস্যা হচ্ছে।
.ইঞ্জিনের সক্ষমতা জানেন না অনেক লোকোমাস্টার
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনজন লোকোমাস্টার (ট্রেনচালক) মুক্তকণ্ঠকে বলেছেন, কোন ইঞ্জিনে কতটি ট্রাকশন মোটর সচল আছে, সেই তথ্য তাঁদের আগে জানানো হয় না। ইঞ্জিনের সক্ষমতা না জেনেই তাঁদের ট্রেন চালাতে হয়। আগে তথ্য জানা থাকলে সেতুর আগে প্রয়োজনীয় গতি তোলার চেষ্টা করা যেত।
লোকোমাস্টারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেতুর ঢালে ট্রেন আটকে গেলে শুধু সময় নষ্ট হয় না; নিরাপত্তাঝুঁকিও তৈরি হয়। বিশেষ করে ভৈরব প্রান্তের নির্জন এলাকায় ট্রেন থেমে থাকলে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, শুধু ভৈরব নয়, বড় রেলসেতুতে বছরে কয়েকবার এমন ঘটনা ঘটে। গত ১৫ জুলাই নরসিংদীর ঘোড়াশাল সেতুতে ‘এগারসিন্ধুর এক্সপ্রেস’ ট্রেন আটকে গিয়েছিল।
.‘উন্নত দেশে বুলেট ট্রেন চলছে’
পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে সূত্র জানায়, বর্তমানে মিটারগেজ রেলপথে লোকোমোটিভ ১৫০টি। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ লোকোমোটিভ আয়ুষ্কাল উত্তীর্ণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ট্রাকশন মোটরের সংকট।
রেলওয়ের একাধিক সূত্র জানায়, অন্তত ৩০ শতাংশ লোকোমোটিভে প্রয়োজনীয় চারটি ট্রাকশন মোটর নেই। একটি, দুটি কিংবা তিনটি মোটর দিয়েই ইঞ্জিন চলছে।
গত ৯ জুলাই ভৈরব রেলসেতুতে উঠতে না পারা ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী ‘মহানগর এক্সপ্রেস’ ট্রেনের যাত্রী ছিলেন কলেজশিক্ষার্থী মাহাবুব রহমান। তাঁর বাড়ি ভৈরব পৌর শহরের কমলপুর এলাকায়। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘উন্নত দেশে এখন বুলেট ট্রেন চলছে। অথচ দেশে ট্রেনের ইঞ্জিনগুলোর কী অবস্থা! বড় কোনো রেলসেতুতে ঠিকমতো উঠতেও পারছে না।’