ফিফার বিশ্বকাপের একাংশ বেসরকারীকরণের পরিকল্পনা তীব্র বিরোধিতার মুখে আপাতত স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অনেক দেশ ভবিষ্যতে বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকি দেয় এবং ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর পদত্যাগের আহ্বানও ওঠে।

এ প্রেক্ষাপটেই প্রশ্ন উঠেছে—প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগকারীরা বিশ্বকাপে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন কেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ ফের আসবে কি না, সে বিষয়েও চলছে আলোচনা।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানুষের বিনোদন ও অবসর কাটানোর ধরন বদলে দিতে পারে—এমন প্রত্যাশা থেকে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ক্যাপিটালের সহযোগী প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ইটার্নালের কর্মকর্তারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় বিনিয়োগ করতে চেয়েছিলেন। এর জন্য বিনিয়োগকারীদের কনসোর্টিয়াম গঠনের পরিকল্পনা ছিল।

তাদের ভাবনায় ফুটবলকে একটি নতুন বিনিয়োগ কৌশলের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছিল। তারা বিশ্বাস করেন, এআই বিপ্লবের মধ্যেও খেলাধুলা টিকে থাকবে এবং সময়ের সঙ্গে এর মূল্য আরও বাড়বে।

থ্রাইভ ক্যাপিটালের নেতৃত্বে আছেন জশুয়া কুশনার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারের ভাই। থ্রাইভ মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করা প্রযুক্তি কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে এবং প্রতিষ্ঠানটি ওপেনএআইয়ের অন্যতম বড় আর্থিক পৃষ্ঠপোষক।

চলতি বছরের এপ্রিলে নিউইয়র্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি ‘থ্রাইভ ইটার্নাল’ নামে নতুন বিনিয়োগ শাখা চালু করে। প্রযুক্তির মাধ্যমে যেসব বিষয় ‘অনুকরণ করা যায় না’, তেমন খাতে বিনিয়োগ করাই এই কোম্পানির লক্ষ্য।

এই কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে খেলাধুলা। এখান থেকেই ফুটবলে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়। ফিফার প্রস্তাবিত ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজের (এফএফই) মাধ্যমে বিশ্বকাপের অংশীদারত্ব নেওয়ার বিষয়টি তাদের কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

বিনিয়োগকারীদের ধারণা, ফুটবলের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্ক থাকার কারণে এ খেলা এআইজনিত আমূল পরিবর্তনের হাত থেকে তুলনামূলকভাবে রক্ষা পাবে। চলচ্চিত্র ও সংগীতের মতো অন্যান্য বিনোদন খাতে প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই মানুষের ভূমিকা কমিয়ে দেওয়ার দিকে এগোলেও ফুটবলের ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম বলেই তাদের অভিমত।

ক্রীড়া বিশ্লেষকেরা বলেন, বিনিয়োগের আগ্রহ ও বাণিজ্যিকীকরণের কারণে ফুটবল ও সমর্থক–সংক্রান্ত অনেক সিদ্ধান্ত এখন ‘ওয়াল স্ট্রিট ও সিলিকন ভ্যালিতে’ নেওয়া হচ্ছে। তাদের মতে, বিষয়টি ধীরে ধীরে চেপে বসলেও কী ঘটছে, তা নিয়ে সবাই প্রকৃত অর্থে ভাবেননি।

ফিফার পরিচালনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বিশ্লেষকেরা বলছেন, মানুষ পছন্দ করুক বা না করুক, খেলাধুলায় বেসরকারি মূলধন বিনিয়োগ এখন বাস্তবতা।

এবারের বিশ্বকাপে বাণিজ্যিকীকরণের স্পষ্ট চিত্র দেখা গেলেও বিবিসি জানিয়েছে, এফএফই প্রস্তাব নিয়ে থ্রাইভের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে গত বছর। বাণিজ্যিক পরামর্শক হিসেবে আনা হয়েছিল ফর্মুলা ওয়ানের মালিক প্রতিষ্ঠান লিবার্টি মিডিয়ার সাবেক প্রধান গ্রেগ ম্যাফেইকে।

থ্রাইভ সাবেক ডিজনি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বব আইগারকেও নিয়োগ দিয়েছিল।

থ্রাইভ ইটার্নাল ইতিমধ্যে অন্যান্য ক্রীড়া খাতেও বিনিয়োগ করছে। প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরুর সময় জানিয়েছিল, তারা মেজর লিগ বেসবলের দল সান ফ্রান্সিসকো জায়ান্টসের একাংশ কেনার বিষয়ে চুক্তি করেছে। এ ছাড়া লাস ভেগাসে নতুন এনবিএ ফ্র্যাঞ্চাইজি কেনার সম্ভাব্য উদ্যোগ নিয়েও প্রতিষ্ঠানটির আগ্রহ আছে বলে জানা গেছে।

থ্রাইভ ইটার্নালের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ‘ঐতিহ্য, পরিচয় ও অভিন্ন অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এসব ‘খ্যাতনামা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান’ এআই বিপ্লবের মধ্যে শুধু টিকে থাকবে না, বরং ভবিষ্যতে এগুলোর গুরুত্ব আরও বাড়বে।

ফিফায় বিনিয়োগের পরিকল্পনা এবং তা নিয়ে পরবর্তী বিতর্কের বিষয়ে কুশনার ও থ্রাইভ ইটার্নাল মন্তব্য করেনি।

তবে প্রতিষ্ঠানটির ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, ফিফার সদস্যসংস্থাগুলোর অনুমোদনসাপেক্ষ এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য দ্রুত মুনাফা করা ছিল না; বরং দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করে ফুটবলের উন্নয়নে অর্থায়ন করাই ছিল এর লক্ষ্য।

প্রাথমিকভাবে ৪২০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রস্তুতি নেওয়া বিনিয়োগকারীরা ধরে নিয়েছিলেন, কয়েক দশক মুনাফা হবে না। সেই বিষয়টি মাথায় নিয়েই এগোচ্ছিলেন তাঁরা। কেননা, থ্রাইভ ইটার্নালকে হোল্ডিং কোম্পানি হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।

সূত্রটি আরও জানায়, এফএফই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ২০০ কোটি ডলারের মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রতিটি সদস্যসংস্থা সর্বোচ্চ ৯ কোটি ১০ লাখ ডলার মূল্যের অংশীদারত্ব পেত। তবে ওই অংশীদারত্বের নিয়ন্ত্রণ বিনিয়োগকারীদের হাতে নয়, ফিফার কাছেই থাকত। পরবর্তী সময়ে সেই অংশীদারত্বের কোনো অংশ বিক্রি করা হবে কি না, তা নির্ধারণের ভারও ছিল সংশ্লিষ্ট সদস্যসংস্থার।

সূত্রটি বলেছে, বাইরের বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য ছিল যেসব দেশ সাধারণত বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগ পায় না, সেসব দেশের হাতে শুরুতেই বেশি অর্থ তুলে দেওয়া। ওই অর্থ দিয়ে তারা স্টেডিয়াম, প্রশিক্ষণ অবকাঠামোসহ নিজেদের দেশে ফুটবলের উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে পারত।

ফিফার ভাষ্য অনুযায়ী, এফএফইর লক্ষ্য ছিল ‘ফুটবলের ব্যবসা খেলাটির পরিচালনা থেকে আলাদা করা’।

ইংল্যান্ডে ফুটবলের ব্যবসা বেড়েছে—বিশেষ করে প্রিমিয়ার লিগ চালুর পর। এই লিগের আর্থিক নিয়মকানুন, খেলোয়াড় কেনাবেচার চুক্তি ও ক্লাবের পরিচালনা পর্ষদের নানা খবর এখন মাঠের খেলার মতোই সমর্থকদের আলোচনার বিষয়।

ফুটবলে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ অবশ্য নতুন কিছু নয়। দুই দশকেরও বেশি আগে গ্লেজার পরিবার ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কেনার পর থেকে ইংল্যান্ড ও ইউরোপের অন্যান্য ক্লাবে মার্কিন বিনিয়োগ ক্রমেই বেড়েছে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, ফিফা ও বিশ্বকাপের এই অর্থের প্রয়োজন কেন। ফিফা দাবি করেছে, বিশ্বকাপ থেকে যতটা আয় করা সম্ভব, ততটা হচ্ছে না। তবে পানিবিরতির বিজ্ঞাপন, টিকিটের দামে পরিবর্তন, সম্প্রচার ও স্পনসরশিপ স্বত্ব থেকে রেকর্ড আয়—সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ থেকে রেকর্ড রাজস্ব আয় হয়েছে বলে জানা গেছে।

৪৮ দলের বিশ্বকাপ ও ভবিষ্যতে ৬৪ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের যে সম্ভাবনা, তাতে আরও বেশি বাণিজ্যের সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা আছে। বেশি দেশ মানে বেশি দর্শক, বেশি দর্শক মানে বেশি আয়।

পোর্টসমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান ও ক্রীড়া অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ক্রিস্টিনা ফিলিপু বলেন, নগদ অর্থের প্রবাহে সমস্যা দেখা দিলে অন্যান্য খেলাধুলা ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ফুটবল ক্লাবেও এ ধরনের বাইরের বিনিয়োগ নেওয়া হয়েছে।

তবে ফিফার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি তেমন নয়। তাঁর ভাষায়, ‘ফিফা এমন অবস্থায় নেই যে তাদের অর্থের জন্য মরিয়া হতে হবে; বরং তারা চাইলে হাতে থাকা অর্থ দিয়েই সদস্যসংস্থাগুলোকে আরও বেশি অর্থ দিতে পারে। বাইরের অর্থ আনার প্রয়োজন নেই।’

থ্রাইভ ইটার্নাল এ পরিকল্পনা বাতিলের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে মোদ্দা কথা হলো, ফুটবলে বিনিয়োগের আগ্রহ যে এখনো প্রবল—তা পরিষ্কার।