দেশের পণ্য রপ্তানির প্রায় ১৯ শতাংশ সম্পন্ন হচ্ছে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে, যার ফলে রপ্তানি আয়ের সমপরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করছে এসব ব্যাংক। অন্যদিকে, আমদানির ১৩ শতাংশ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এই ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যাদের অধীনে মোট ৭০টি শাখা ও ৫টি উপশাখা রয়েছে। এই ব্যাংকগুলোর মধ্যে বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। এছাড়া সিটি ব্যাংক এনএ, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, উরি ব্যাংক, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, হাবিব ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান ও ব্যাংক আলফালাহ তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

আমানত ও ঋণের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিদেশি ব্যাংকগুলোর শাখা নেটওয়ার্ক সীমিত হলেও আমানতের ক্ষেত্রে তারা শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এসব ব্যাংকের মোট আমানত ছিল ৮৭ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সামান্য বেড়ে ৮৭ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের তুলনায় তাদের আমানতের অংশ ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে।

আমানতের ধরনে দেশি ও বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে বড় পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। দেশি ব্যাংকগুলোতে স্থায়ী আমানতের হার ৪৮ শতাংশ হলেও বিদেশি ব্যাংকগুলোতে তা মাত্র ১৬ শতাংশ। বিপরীতে, বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের ৩৯ শতাংশ আসে চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে, যেখানে দেশি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এই হার ২৯ শতাংশ। এছাড়া ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট (আরএফসিডি) ছিল ১৭ শতাংশ, যা দেশি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে মাত্র ২ শতাংশ। মূলত করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এসব ব্যাংকের আমানত সংগ্রহের খরচ কম থাকে।

তবে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে সংকোচন দেখা গেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৫১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ৪৬ হাজার ১২২ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। ফলে পুরো ব্যাংকিং খাতে তাদের ঋণের অংশ ৩ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে।

বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বিদেশি ব্যাংকগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে তারা ৩৭৩ কোটি ডলারের রপ্তানি বিল সংগ্রহ করেছিল, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে বেড়ে ৪১২ কোটি ডলার হয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানি আয়ে তাদের অংশ ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ। আমদানির ক্ষেত্রে ২০২৪ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ৩৮৭ কোটি ডলারের বিল পরিশোধ করা এসব ব্যাংক ২০২৫ সালের একই সময়ে ৪২৯ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে। বর্তমানে মোট আমদানির ১৩ দশমিক ১ শতাংশ এই ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তবে রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে তাদের অবদান মাত্র দশমিক ৩ শতাংশ।

মুনাফার ক্ষেত্রে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে বেড়ে ৩ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা হয়েছে। তবে মুনাফা বিদেশে পাঠানোর পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের শেষ ছয় মাসে ৫৭৭ কোটি টাকা পাঠানো হলেও ২০২৫ সালের একই সময়ে তা বেড়ে ১ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা হয়েছে। ডলার সংকটের কারণে আগে কম মুনাফা পাঠানো সম্ভব হলেও ২০২৫ সালে বকেয়া মুনাফা পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে অনেক বহুজাতিক ব্যাংকের মুনাফায় প্রভাব পড়েছে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ ২০২৫ সালে ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। তবে এইচএসবিসির নিট মুনাফা ২৩ শতাংশ কমে ৮২৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ১ হাজার ৮৬ কোটি টাকা। কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের মুনাফা ৬০০ কোটি টাকা থেকে কমে ৫৭৬ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংক এনএ-র মুনাফা ৩৮৪ কোটি টাকা থেকে কমে ৩২৮ কোটি টাকা এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার মুনাফা ২৩০ কোটি টাকা থেকে কমে ২০৭ কোটি টাকা হয়েছে। হাবিব ব্যাংক ২০২৫ সালে মুনাফা করেছে ১৮ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালে ছিল ২৪ কোটি টাকা।

এই পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্বাস ও সেবার মানের কারণে কম সুদ পেলেও মানুষ বিদেশি ব্যাংকে যাচ্ছে। বৈশ্বিক সেবাকে দ্রুত ধারণ করায় ভালো করপোরেটরা এসব ব্যাংকের গ্রাহক। এ ছাড়া ধনী ও উচ্চ শ্রেণির মানুষ এসব ব্যাংকের আস্থাভাজন গ্রাহক। এর ফলে এসব ব্যাংক উচ্চ মুনাফা করছে। পাশাপাশি অন্য ব্যাংকের এসএমই ও ক্ষুদ্র খাতেও এসব ব্যাংক অর্থায়ন করে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে বিদেশি ব্যাংকগুলো এই দেশে ভালো করছে। তাদের থেকে দেশি ব্যাংকগুলো অনেক সেবা ও কালচারকে গ্রহণ করছে।’