১৯৭০ সালের ভোলা সাইক্লোন ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তবে সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ বলছে, এই প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে একসূত্রে বেঁধেছিল এবং পরবর্তী জাতীয় ঘটনাবলীতে সরাসরি ভূমিকা রেখেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির ইকোনমিকস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক আহমেদ মুশফিক মোবারক ও গবেষক সুলতান মাহমুদ যৌথ গবেষণায় এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন। ঐতিহাসিক স্যাটেলাইট ডেটা, আর্কাইভের তথ্য এবং আধুনিক অর্থনীতির গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে তাঁরা দেখিয়েছেন, কীভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রতি তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর চরম অবহেলা একটি স্বাধিকার আন্দোলনকে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতাযুদ্ধে রূপান্তর করেছিল।
অধ্যাপক মুশফিক মোবারক জানান, "বিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীতে অন্তত ১৪৫টি বিচ্ছিন্নতাবাদী বা স্বাধিকার আন্দোলন ঘটেছে। তবে এর মধ্যে মাত্র ২৭টি আন্দোলন নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনে সফল হয়েছে।"
তাঁর মতে, যেকোনো স্বাধিকার আন্দোলন সফল হতে হলে মূলত দুটি শর্ত পূরণ হতে হয়—গণমানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট ঘটনা বা সুযোগ এবং শোষক সরকারের বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার মানসিকতা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৯৭০ সালের সাইক্লোন এবং পরবর্তী সময়ে শাসকগোষ্ঠীর আচরণ এই দুটি শর্তকেই দ্রুত ত্বরান্বিত করেছিল।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হলেও ভৌগোলিক দূরত্ব, সংস্কৃতি, ভাষা ও অর্থনীতির ব্যাপক পার্থক্যের কারণে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে কোনো মিল ছিল না। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর অর্থনৈতিক বৈষম্য এই ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তোলে। পূর্ব পাকিস্তানে মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বাস করলেও তারা সরকারি রাজস্বের মাত্র ২৯ শতাংশ বরাদ্দ পেত এবং ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল দূরবর্তী ইসলামাবাদ।
১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন নির্ধারিত ছিল। তবে নির্বাচনের ঠিক এক মাস আগে ১২ নভেম্বর উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে প্রলয়ঙ্করী ভোলা সাইক্লোন। আগাম পূর্বাভাসের অভাবে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ মানুষ প্রাণ হারান। উপকূলীয় অঞ্চলে লাশের স্তূপ ও কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দ্রুত দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে আসেননি। চীন সফর থেকে ফেরার পথে ঢাকায় ক্ষণিকের জন্য থেমে হেলিকপ্টার থেকে এলাকা পরিদর্শন করে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, "পরিস্থিতি ততটা খারাপ মনে হচ্ছে না।"
এরপর তিনি ঢাকায় ফিরে এক পার্টিতে যোগ দেন। এই চরম উদাসীনতা ও ত্রাণ কার্যক্রমে ব্যর্থতা বাঙালি জাতিকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, এই সরকারের কাছে তাদের জীবনের কোনো মূল্য নেই।
তৎকালীন বায়ুমণ্ডলের ডেটা সংগ্রহ করতে গবেষকেরা মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের আইটিওএস-১ (ITOS-1) নামক একটি বিরল সামরিক স্যাটেলাইটের সহায়তা নিয়েছেন। এটি ছিল বিশ্বের প্রথম জিওসিনক্রোনাস কক্ষপথের স্যাটেলাইট। ১৯৭০ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি টেপ রেকর্ডার নষ্ট হয়ে অকেজো হওয়ার ঠিক আগে এটি ভোলা সাইক্লোনের কিছু স্পষ্ট ছবি তুলেছিল। পদার্থবিজ্ঞান ও আবহাওয়া বিজ্ঞানের নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে মেঘের ঘনত্ব ও সৌর বিকিরণের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা তৎকালীন বাতাসের গতিবেগ ও ঝড়ের প্রকৃত তীব্রতা পরিমাপ করেছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব নির্বাচনী এলাকায় ঝড়ের তাণ্ডব ও ক্ষয়ক্ষতি বেশি ছিল, সেখানকার মানুষের রাজনৈতিক অবস্থানের দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। ঘূর্ণিঝড়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত ভোটের হার ৭৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৭ শতাংশে পৌঁছায়। এছাড়া আর্কাইভের ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সাইক্লোনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো থেকে আনুপাতিক হারে অনেক বেশি তরুণ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। হিসাব অনুযায়ী, সাইক্লোনের কারণে সৃষ্ট তীব্র ক্ষোভের ফলে প্রায় ৪৬ হাজার অতিরিক্ত তরুণ যুদ্ধে যোগদান করেছিলেন।
তথ্যসূত্র: ভক্সডেভ