থাইল্যান্ডের ব্যাংককের উপকণ্ঠে একটি স্কুলে এক কিশোরের চালানো গুলিতে আটজনের মৃত্যু এবং ২২ জন আহত হওয়ার পর জনসমক্ষে আগ্নেয়াস্ত্র বহনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের অঙ্গীকার করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল। প্রস্তাবিত নতুন আইন অনুযায়ী, শুধুমাত্র দায়িত্বপালনরত সরকারি কর্মকর্তারা বন্দুক বহন করতে পারবেন।

ঘটনাটি ঘটে ননথাবুরি এলাকার নামকরা দেবসিরিন স্কুলে। জানা গেছে, ১৪ বছর বয়সী ওই কিশোর প্রথমে তার বাড়িতে থাকা দাদা-দাদিকে হত্যা করে। এরপর সে স্কুলে গিয়ে পাঁচ শিক্ষককে হত্যা করার পর আত্মহত্যা করে। সে ওই স্কুলেরই শিক্ষার্থী ছিল। পরবর্তীতে থাই সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, গুলিতে আহত এক শিক্ষার্থীরও মৃত্যু হয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তা থাদসাকর্ন কোনথং জানান, হামলায় ব্যবহৃত বন্দুক ও গুলি ওই কিশোরের দাদার। প্রাথমিক তদন্তে তার দাদার শোবার ঘরে বন্দুকটি থাকার আলামত পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, বন্দুকটি আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত ছিল এবং সেটির বৈধ অনুমতিপত্রও ছিল।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র থাকার হার সবচেয়ে বেশি দেশগুলোর একটি থাইল্যান্ড। দেশটিতে সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ বন্দুক অবৈধ বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে অবৈধভাবে আগ্নেয়াস্ত্র রাখার সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছরের কারাদণ্ড হলেও আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে নানা সমস্যা রয়ে গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীন আনুতিন নতুন লাইসেন্স প্রদান এবং বন্দুক আমদানিতে বিধিনিষেধসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

এই মর্মান্তিক ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল বলেন, ‘এমন ঘটনা কখনোই ঘটার কথা ছিল না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি শুধু নিহত ব্যক্তিদের জন্যই দুঃখিত নই, এ ঘটনা ঘটেছে বলেও আমি দুঃখিত। আমাদের দেশে এমন ঘটনা কীভাবে ঘটতে পারে?’

তদন্তে জানা গেছে, স্থানীয় সময় ভোর ৫টার দিকে ওই কিশোর তার ৭৩ বছর বয়সী দাদা ও ৭৪ বছর বয়সী দাদিকে গুলি করে হত্যা করে। তারা একটি দোতলা ফ্ল্যাটে থাকতেন। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, দুজনের মাথায় গুলি লাগায় তারা ঘটনাস্থলেই নিহত হন। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এরপর ওই কিশোর বন্দুক ও গুলি নিয়ে স্কুলবাসে ওঠে। সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে প্রথম এবং ৯টা ২০ মিনিটে দ্বিতীয় ক্লাসে অংশ নেয় সে। দ্বিতীয় ক্লাস শুরুর প্রায় ৩০ মিনিট পর সে এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে।

থাইল্যান্ডের জাতীয় পুলিশের প্রধান কিত্তিরাত ফানফেত সাংবাদিকদের জানান, ফরেনসিক তদন্তে দেখা গেছে হামলাকারীর নিশানা করার সক্ষমতা বেশ ভালো ছিল এবং তার ছোড়া গুলিগুলো শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অংশে লেগেছে। প্রধানমন্ত্রী আনুতিন এই হামলাটিকে ‘সুপরিকল্পিত’ বলে অভিহিত করেছেন।

পুলিশ কিশোরটির ইলেকট্রনিক ডিভাইস তল্লাশি করে যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলে গুলির ঘটনা নিয়ে তৈরি বেশ কিছু ভিডিও পেয়েছে। পরিবারের সদস্যরা তাকে শান্ত ও ভালো আচরণের ছেলে হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার চাচা থাই সংবাদমাধ্যমকে জানান, সে বেশির ভাগ সময় ঘরে থেকে সহিংস ভিডিও গেম খেলত এবং খুব কমই বাইরে বের হতো। তবে এমন হামলার কোনো লক্ষণ তার মধ্যে দেখা যায়নি। কিশোরটি তার দাদা-দাদির সঙ্গে থাকত, তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল।

১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত দেবসিরিন স্কুল থাইল্যান্ডের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়। দেশটির অনেক পরিচিত ব্যক্তিত্ব, কূটনীতিক, ক্রীড়াবিদ এবং বেশ কয়েকজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এই স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলেন।