মহাকাশের বিশাল আগুনের কুণ্ডলী সূর্য আপাতদৃষ্টিতে শান্ত মনে হলেও এর পৃষ্ঠভাগে লুকিয়ে ছিল নানা রহস্য। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় বিজ্ঞানীরা এবার সূর্যের গায়ে সেই অদৃশ্য ঘূর্ণিপাক উন্মোচন করেছেন, যা মানবজাতির জন্য এক অভূতপূর্ব মহাজাগতিক আবিষ্কার।
যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়ে অবস্থিত ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ইনোয়ে সোলার টেলিস্কোপ ব্যবহার করে সূর্যের ভেতরে এই ঘূর্ণির দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে। টেলিস্কোপের ছবিতে সূর্যের বহিরাংশের এক শীতল সানস্পট বা সৌরকলঙ্কের প্রান্তে তীব্র চৌম্বকীয় তাণ্ডব পরিলক্ষিত হয়েছে। এই ছবির পাশাপাশি আধুনিক কম্পিউটার সিমুলেশন ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা নতুন তথ্য সংগ্রহ করেছেন।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারে প্রকাশিত এক গবেষণায় জানানো হয়েছে, সৌরপৃষ্ঠে প্রথমবারের মতো 'কেলভিন-হেলমহোল্টজ ইনস্ট্যাবিলিটি' নামের একটি ঘটনার উপস্থিতি স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। সূর্যের ওপর যখন দুটি তরল বা প্লাজমা প্লাবন ভিন্ন গতিতে একে অপরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন পানির ঘূর্ণিপাকের মতো প্যাটার্ন তৈরি হয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, প্লাজমার এই ঘূর্ণিগুলো সূর্যের সবচেয়ে শক্তিশালী আবহাওয়া পরিবর্তনের প্রধান কারণ হতে পারে। এই আবিষ্কারের ফলে সৌরঝড় বা করোনাল মাস ইজেকশনের পূর্বাভাস পাওয়া সহজ হবে, যা সাধারণত পৃথিবীর স্যাটেলাইট ও বিদ্যুৎ-ব্যবস্থা বিকল করে দেয়।
ন্যাশনাল সোলার অবজারভেটরির এনএসএফ প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জ্যাকিন কেন জানিয়েছেন, "কয়েক দশক ধরে এত ছোট স্কেলে এসব ঘূর্ণি দেখা অসম্ভব ছিল। একটি চার মিটার বিশালাকার আয়নার সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করে ইনোয়ে সোলার টেলিস্কোপ আমাদের এই সূক্ষ্ম বিষয় দেখার সুযোগ করে দিয়েছে।"
গবেষকরা টেলিস্কোপের তথ্যের সঙ্গে বিশেষভাবে তৈরি কম্পিউটার সিমুলেশন মিলিয়ে দেখেছেন এবং উভয় মাধ্যমেই চৌম্বকীয়ভাবে অস্থির অঞ্চলে একাধিক কেএইচআই ঘূর্ণির উপস্থিতির মিল পেয়েছেন। এতে কম্পিউটার সিমুলেশনের নির্ভুলতা প্রমাণিত হয়েছে।
ন্যাশনাল সোলার অবজারভেটরির উপপরিচালক ডেভিড বোবোল্টজ জানিয়েছেন, "সৌর ও নক্ষত্রমণ্ডলীর প্লাজমার গতিশীলতা বোঝার ক্ষেত্রে এটি এক বড় অগ্রগতি। এটি ভবিষ্যতের নিত্যনতুন আবিষ্কারের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।"
বিজ্ঞানীদের ধারণা, কেএইচআই ঘূর্ণি সৌরকলঙ্কের তীব্র বিস্ফোরণের পেছনে জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। সৌরশিখা থেকে উৎপন্ন ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয়তা মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর স্যাটেলাইট, জিপিএস ও বিদ্যুৎ গ্রিডে বিপর্যয় ঘটায়। আগের তত্ত্ব অনুযায়ী, সৌরচৌম্বক রেখাগুলো চুলের বেণির মতো একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে শক্তি সঞ্চয় করে এবং একপর্যায়ে ছিঁড়ে বিপুল শক্তি মহাকাশে ছড়িয়ে দেয়। তবে কেন এই বিন্যাস পেঁচিয়ে যায়, তা এতদিন অজানা ছিল।
এখন বিজ্ঞানীদের ধারণা, কেলভিন-হেলমহোল্টজ ইনস্ট্যাবিলিটির ফলে তৈরি হওয়া ছোট ঘূর্ণিগুলোই চৌম্বক রেখাকে পেঁচিয়ে দিতে মূল ইঞ্জিনের ভূমিকা পালন করে। এর মাধ্যমে সূর্যের করোনা অঞ্চল কেন কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস উত্তপ্ত হয়, তার ব্যাখ্যাও মিলতে পারে।
ন্যাশনাল সোলার অবজারভেটরির বিজ্ঞানী ফ্রিডরিখ ভো গার বলেন, "কেলভিন-হেলমহোল্টজ ইনস্ট্যাবিলিটি আবিষ্কারের পর সৌরজগৎকে বোঝার যে নতুন পথ খুলেছে, আমরা কেবল তার সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে আছি।"