যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েটে নির্বাচনী আবহ বাড়ছিল ঠিকই, তবে মার্কিন সিনেট নির্বাচনের ডেমোক্রেটিক প্রাথমিক বাছাইয়ের (প্রাইমারি) শেষ মুহূর্তে আবদুল আল–সাইয়েদের এগিয়ে থাকার ব্যবধানও কমতে থাকে। কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্স তাঁকে দ্রুত ছাপিয়ে যেতে পারেন—এমন আশঙ্কাও দেখা দেয়।

জনস্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মী আল–সাইয়েদ গত বুধবার (৫ আগস্ট) মধ্যরাতের পর সমর্থকদের সামনে মঞ্চে ওঠেন। ভোট গণনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় ডেট্রয়েটে তাঁর সমর্থকদের উৎসবের আমেজও ততক্ষণে অনেকটা ম্লান হয়ে গিয়েছিল। মঞ্চে আল–সাইয়েদ বলেন, ‘ইচ্ছা ছিল এখন বিজয় ঘোষণা করি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, মিশিগানে কিছু ভোট গণনা করতে বেশ সময় লাগে। এটি তো বড় একটি অঙ্গরাজ্য।’

এরপর তিনি তাঁদের প্রচারে কোন ধরনের শক্তির সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে—সেটি স্মরণ করিয়ে দেন। আল–সাইয়েদ বলেন, তাঁদের প্রতিপক্ষের পক্ষে প্রচারে ইসরায়েলের লবিস্ট গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (আইপ্যাক) ও অন্যান্য বিশেষ স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো কোটি কোটি ডলার খরচ করেছে। তিনি বলেন, ‘একটা কথা মনে রাখবেন। ইনশা আল্লাহ আমরা যদি জিতি, তাহলে সবাই জানবে, ৭ কোটি ডলার খরচ করেও তারা আমাদের হারাতে পারেনি। আমরা লড়াই চালিয়ে গেছি।’

ভোট গণনার সঙ্গে সঙ্গে চারবারের কংগ্রেস সদস্য স্টিভেন্সের ব্যবধানও কমে আসছিল। একপর্যায়ে দুজনের ব্যবধান ১ শতাংশের নিচে নেমে আসে। বুধবার সকালে সূর্য ওঠার বেশ অনেকক্ষণ পরে চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হয়। এতে খুব অল্প ব্যবধানে আল–সাইয়েদ জয় পান।

এই জয়ের মধ্যে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—আল–সাইয়েদ শুধু স্টিভেন্সকেই হারাননি; তিনি একই সঙ্গে ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠী ও মিশিগানের ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রভাবশালী নেতাদেরও হারিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর গ্রেচেন হুইটমারের মতো শীর্ষ নেতারা, যিনি স্টিভেন্সকে সরাসরি সমর্থন দিয়েছিলেন।

এই ফল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনকে বিস্মিত করেছে। এই জয় ইসরায়েলপন্থী ডেমোক্র্যাটদের জন্য আরেকটি ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ নিয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি আল–সাইয়েদকে ‘ইহুদি ও ইসরায়েলবিদ্বেষী পরাজিত কমিউনিস্ট’ বলে আখ্যা দেন। তবে এই ভোটের ফলাফলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—শুধু বিপুল প্রচার ব্যয় ও প্রভাবশালী নেতাদের সমর্থন পেলেই ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে এখন আর সহজে জয় পাওয়া যাচ্ছে না।

‘পুরোনো ধারা অচল হয়ে পড়ছে’

আল–সাইয়েদের সমর্থকেরা বলছেন, ভোটের ফল প্রকাশে বিলম্ব ও প্রত্যাশার তুলনায় কম ব্যবধানে জয় এই নির্বাচনের গুরুত্ব কমিয়ে দেয় না। ডেমোক্রেটিক পার্টির মিশিগান অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতা আলাবাস ফারহাত বলেন, আল–সাইয়েদের জয় স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। কোনো প্রার্থী যদি যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়ে নির্বাচন করেন এবং আইপ্যাকের মতো ইসরায়েলের স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে প্রস্তুত থাকেন, তাহলে মানুষ তাঁকে ভোট দেবে।

ফারহাত আল–জাজিরাকে বলেন, ‘অবস্থা এখন আর আগের মতো নেই। এসব নির্বাচনে সহজে জয় পাওয়া যায়, প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিকেরা এত দিন এমনটা ভেবেছিলেন। কিন্তু এখন মানুষ প্রচলিত ধারাকে বদলে দিতে এগিয়ে আসছেন। তাঁরা মিশিগানের শ্রমজীবী পরিবার ও অন্য জায়গার সাধারণ মানুষের জন্য বড় ও সাহসী কর্মসূচি এবং বাস্তব স্বস্তির সুযোগ করে দিতে চান।’

স্টিভেন্স ডেমোক্রেটিক পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বের জোরালো সমর্থন পেয়েছিলেন। রাজ্য গভর্নর গ্রেচেন হুইটমার, সাবেক সিনেটর ডেবি স্ট্যাবেনো, সিনেটে সংখ্যালঘু ডেমোক্রেটিক নেতা চাক শুমার ও অবসরে যাওয়া সিনেটর গ্যারি পিটার্স তাঁকে সমর্থন দিয়েছিলেন। এসব কিছুর পাশাপাশি স্টিভেন্স তাঁর নিজের আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন।

স্টিভেন্সকে হারিয়ে আল–সাইয়েদ এখন আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির সাবেক কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সের মুখোমুখি হবেন। রজার্স ট্রাম্পের সমর্থন পেয়েছেন। তাঁর ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন পাওয়ারও যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

আইপ্যাক এরই মধ্যে জানিয়েছে, আল–সাইয়েদকে সাধারণ নির্বাচনে হারাতে তারা মিশিগানে অর্থ ব্যয় অব্যাহত রাখবে। বুধবার এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, ‘আমাদের সদস্যরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। নভেম্বরে ভোটাররা যেন আল–সাইয়েদ ও তাঁর ইসরায়েলবিরোধী এজেন্ডা প্রত্যাখ্যান করেন, তা নিশ্চিত করতে আমরা কাজ চালিয়ে যাব।’

ইসরায়েলপন্থী এই লবিস্ট সংগঠন আল–সাইয়েদের জয়কে তেমন গুরুত্ব দিতে চায়নি। বরং তারা নিজেদের সমর্থিত ইসরায়েলপন্থী প্রার্থীদের জয়ের কথা তুলে ধরে। এর মধ্যে মিসৌরি অঙ্গরাজ্যে আইপ্যাক-সমর্থিত কংগ্রেস সদস্য ওয়েসলি বেল সহজেই তাঁর প্রগতিশীল প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক কংগ্রেস সদস্য কোরি বুশকে হারিয়েছেন। এর মধ্যে ওয়েসলি বেল ইসরায়েলপন্থী। আর কোরি বুশ প্রগতিশীল ও ইসরায়েলের সমালোচক।

আইপ্যাক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আমাদের সমর্থিত কয়েকজন প্রার্থী জয়ী না হওয়ায় আমরা হতাশ। তবে আমাদের মূল্যবোধে বিশ্বাসী ইসরায়েলপন্থী ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থন দিতে পেরে আমরা গর্বিত। চলতি প্রাইমারি মৌসুমে বিভিন্ন নির্বাচনে ভোটাররা যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের শক্তিশালী অংশীদারত্বের পক্ষে থাকা নেতাদের বেছে নিচ্ছেন, এটি আমাদের উৎসাহিত করছে।’

জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, সাধারণ নির্বাচনের ফল এখনো অনিশ্চিত। তা সত্ত্বেও বিশ্লেষকেরা আল–সাইয়েদের প্রাইমারিতে জয়কে ঐতিহাসিক বলে মনে করছেন। প্রগতিশীল সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এই জয়কে আধুনিক মার্কিন রাজনীতির ‘সবচেয়ে অসাধারণ বিজয়’ বলে মন্তব্য করেছেন।

‘পড সেভ আমেরিকা’ পডকাস্টে বার্নি স্যান্ডার্স বলেন, ‘কোনো বড় নির্বাচনে এমন কোনো প্রার্থীর কথা কি শুনেছেন, যিনি প্রতিপক্ষের তুলনায় ৯ গুণ কম অর্থ খরচ করেছেন, পুরো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লড়েছেন এবং তারপরও জিতেছেন?’

বার্নি স্যান্ডার্স বলেন, ‘আমার মনে পড়ে না, আগে কেউ এমনটা করতে পেরেছেন।’

বামপন্থীদের জয়

মিশিগানের প্রাইমারি নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল বা বামপন্থী অংশের মধ্যে আবদুল আল–সাইয়েদ একমাত্র বিজীয় ব্যক্তি নন। তাই অঙ্গরাজ্যটির নির্বাচনের ফলকে সামগ্রিকভাবে প্রগতিশীলদের বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত মঙ্গলবারের নির্বাচনে অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতা ডোনাভান ম্যাককিনি ডেমোক্র্যাট প্রাইমারিতে ইসরায়েলপন্থী বর্তমান কংগ্রেস সদস্য শ্রী থানেদারকে পরাজিত করেন। এই নির্বাচন ছিল মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের একটি আসনের জন্য।

এ ছাড়া ডেট্রয়েটের উত্তরের একটি এলাকায় জলবায়ু আন্দোলনের সংগঠক উইলিয়াম লরেন্সও কংগ্রেস নির্বাচনের ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারিতে ১৫ শতাংশের ব্যবধানে জিতেছেন।

শুধু মিশিগান নয়—ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, পেনসিলভানিয়া, নিউ জার্সি, নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যেও প্রগতিশীল প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। তাঁরা কয়েকজন বর্তমান জনপ্রতিনিধিকে পরাজিত করেছেন এবং ডেমোক্র্যাটদের নিরাপদ আসনগুলোতেও জয়ী হয়েছেন।

প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় ও প্রভাবশালী নেতাদের সমর্থন—শুধু এই দুটি বিষয়ে আল–সাইয়েদের জয়কে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলেনি। বরং তিনি এমন একটি সুইং অঙ্গরাজ্যে পুরো অঙ্গরাজ্যজুড়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জিতেছেন, যেখানে দুই বছরের কম সময় আগে ট্রাম্প জয়ী হয়েছিলেন। মিশিগানের জনসংখ্যা এক কোটির বেশি।

পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রতিনিধি পরিষদের প্রগতিশীল সদস্য ক্রিস র‍্যাব গত মে মাসে ডেমোক্র্যাটদের শক্ত ঘাঁটির একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রাইমারিতে জিতে কংগ্রেসে যাওয়ার পথে রয়েছেন। তিনি বলেন, বামপন্থী প্রার্থীরা জয় পাচ্ছেন। কারণ, তাঁরা সহমর্মিতাপূর্ণ ও বাস্তবভিত্তিক বার্তা দিয়ে ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে পারছেন।

ক্রিস র‍্যাব বলেন, আল–সাইয়েদের জয় ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্বের জন্য একটি বার্তা। আগামী নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ নতুন করে ভাবতে হবে।

ক্রিস র‍্যাব বলেন, ‘আগে যেসব কৌশল কাজ করত, সেগুলো এখন পুরোনো। সেগুলো আর সেই মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে না, যাঁরা পুরোনো ধ্যানধারণার ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের ভোট দেন না।’

এই প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ আরও বলেন, ‘আল–সাইয়েদ এমন মানুষদের ভোটকেন্দ্রে আনছেন, যাঁরা অনেক দিন ভোট দিতে আসেননি কিংবা কখনোই আসেননি।’

ক্রিস র‍্যাবের মতে, ডেমোক্র্যাটদের ভোটব্যাংক বিস্তৃত করার এই সক্ষমতা নভেম্বরে মাইক রজার্সকে হারাতে আল–সাইয়েদকে সাহায্য করবে।

আল–সাইয়েদের নির্বাচনী স্লোগান হলো, ‘রাজনীতি থেকে অর্থের প্রভাব দূর করুন। অর্থ রাখুন মানুষের পকেটে। সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে।’

আল–সাইয়েদের নির্বাচনী অঙ্গীকারের মূল বিষয় ছিল জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানো। তবে এই নির্বাচনে আইপ্যাকের সম্পৃক্ততা ও ইসরায়েলকে ঘিরে তীব্র বিভাজনের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বিশেষ করে গাজায় ইসরায়েলের জাতিগত নিধন অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে।

‘জলি গুড জিঞ্জার’ নামে পরিচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাষ্যকার রাসেল এলিস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ভোটাররা দেখিয়ে দিচ্ছেন, তাঁরা ইসরায়েল ও আইপ্যাকের ভূমিকা নিয়ে বিরক্ত।

আল–জাজিরাকে এলিস বলেন, ‘জাতিগত নিধন চালিয়ে যেতে বোমা পাঠানোর বিরুদ্ধে যাঁরা স্পষ্ট অবস্থান নিচ্ছেন, তাঁদের সংখ্যা মানুষ যতটা ভাবছে, তার চেয়ে অনেক বেশি। সংখ্যাটা বিশাল।’

এলিস বলেন, ‘জাতিগত নিধনকে সমর্থন করা যায় না—এ বিষয়ে অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক একমত হবেন বলে আমার বিশ্বাস। গাজা, সুদান, কঙ্গো বা বিশ্বের যেকোনো জায়গায় জাতিগত নিধন চালাতে মার্কিন করদাতাদের অর্থ ও মার্কিন বোমা ব্যবহার করা গ্রহণযোগ্য নয়।’