হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের পথ নির্ধারণে প্রাথমিক সমঝোতার পর এখন চূড়ান্ত চুক্তির দিকে এগোচ্ছে ইরান ও ওমান। কিছু বিষয়ে মতভেদ থাকলেও তা পর্যালোচনার পর খুব শীঘ্রই চুক্তিটি ঘোষণা করা হতে পারে। একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, এই সমঝোতা কার্যকর হলে জলপথে চলাচলকারী জাহাজগুলোর নিয়ন্ত্রণ এবং সেবা ফি সংগ্রহের সুযোগ থাকবে তেহরানের হাতে।
আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে এই নিয়ন্ত্রণ ইরানের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে। পাঁচ মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে এটি তেহরানের জন্য একটি কৌশলগত ও অর্থনৈতিক জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। উল্লেখ্য, যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের এমন নিয়ন্ত্রণ ছিল না এবং তখন জাহাজ চলাচলের জন্য কোনো সেবা ফি দিতে হতো না।
গত বুধবার রাতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ওমানের সঙ্গে প্রাথমিক ঐকমত্যের কথা জানান এবং জানান যে চূড়ান্ত পর্যালোচনা চলছে। ইরানের পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী কাজেম গারিববাদী বলেন, সমঝোতা অনুযায়ী হরমুজ দিয়ে পারস্য উপসাগরে জাহাজ প্রবেশ ও বের হওয়ার পথের নিয়ন্ত্রণ করবে তেহরান।
রয়টার্সকে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, খসড়া চুক্তি অনুযায়ী পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর ওপর ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে। তবে উপসাগর থেকে বেরিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোর ক্ষেত্রে ইরানের ভূমিকা বা কর্তৃত্ব কেমন হবে, তা নিয়ে এখনো পর্যালোচনা চলছে।
মধ্যপ্রাচ্যের আরও কিছু সূত্র জানিয়েছে, জাহাজের নিয়ন্ত্রণের বিস্তারিত পথরেখা তৈরির কাজ চলছে। পাশাপাশি সেবা ফি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। তেহরান পণ্যের মোট মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ ফি দাবি করলেও ওমান তা ৩ শতাংশে নামিয়ে আনতে আলোচনা করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এই ধরনের যেকোনো ফির বিপক্ষে।
তেহরানে অবস্থানরত আল-জাজিরার সাংবাদিক তোহিদ আসাদি কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছেন, অমীমাংসিত বিষয়গুলো খুব বেশি জটিল নয়, কারণ মূল বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়েছে। তাঁর মতে, বৃহস্পতিবার দিনের শেষ নাগাদ একটি চুক্তির ঘোষণা দিতে পারে তেহরান।
কিংস কলেজ লন্ডনের শিক্ষক রব জেইস্ট পিনফোল্ড খসড়া চুক্তিটি সম্পর্কে বলেন, "সমঝোতা অনুযায়ী হরমুজে দুটি পথ থাকবে।" তিনি আরও জানান, একটি পথ হবে ইরানের এবং অন্যটি ওমানের উপকূল দিয়ে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধের আগে ব্যবহৃত মাঝবরাবর পথের তুলনায় নতুন পথে সে পরিমাণ জাহাজ চলাচল সম্ভব নয়, তাই এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু করার পর থেকেই হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয়। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়, ফলে প্রণালি বন্ধ থাকায় জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং ওয়াশিংটন চাপে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে প্রণালিটি চালু করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত জুলাইয়ে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক হামলার মূল কারণও ছিল এই হরমুজ প্রণালি। তবে ইরান তাদের অবস্থানে অটল থেকে জানিয়েছে, জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকবে এবং তারা টোল নেবে। ওমান উপকূল দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ইরান বাহিনী হামলাও চালিয়েছিল।
ইরান জানিয়েছে, এই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রকে যুক্ত করা হয়নি। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নাকচ করে দিয়ে বলেছে, অস্থায়ী কোনো পথে জাহাজ চলাচলে অনুমতি বা টোল গ্রহণযোগ্য নয়।
আল-জাজিরার সাংবাদিক মাহমুদ আবদেল ওয়াহেদ মনে করেন, চুক্তি হলেও সংকটের শেষ হবে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি, ইরানের ওপর নৌ-অবরোধ এবং যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনার কোনো অগ্রগতি হয়নি।
এদিকে পাল্টাপাল্টি হুমকিও অব্যাহত। বুধবার ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, চুক্তি না হলে ইরানে কঠোর হামলা চালানো হবে। বিপরীতে বৃহস্পতিবার ইরানের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমির আকরামিনিয়া বলেছেন, "যেকোনো হুমকির জবাব দিতে পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে ইরান।"