যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী বাছাইয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে প্রভাবশালী ইসরায়েলপন্থী লবিং গোষ্ঠী আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (আইপ্যাক)। সংগঠনটি তাদের সমর্থিত প্রার্থী হ্যালি স্টিভেন্সের পেছনে ব্যাপক অর্থ ঢাললেও তিনি পরাজিত হয়েছেন।

তবে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারিতে তাদের পছন্দের প্রার্থীর পরাজয় সত্ত্বেও আইপ্যাক কার্যক্রম থামাচ্ছে না। নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের পক্ষে আবারও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে সংগঠনটি।

প্রাইমারিতে আইপ্যাকের সুপার প্যাক ‘ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট’ কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্সের পক্ষে ৩ কোটি ২০ লাখ ডলার ব্যয় করেছিল। লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলের কড়া সমালোচক আবদুল আল–সাইয়েদকে হারানো। কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ইতিহাস গড়ে তিনি এই আসনে ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়ে নির্বাচনে লড়ার মনোনয়ন পেয়ে যান।

আইপ্যাকের নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলা ছয় ব্যক্তি জানিয়েছেন, সংগঠনটির অনেক বড় দাতা মনে করছেন, সাধারণ নির্বাচনেও আল–সাইয়েদের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করা উচিত। সে ক্ষেত্রে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের পক্ষে কয়েক কোটি ডলার খরচের পরিকল্পনা হতে পারে।

আইপ্যাকের মুখপাত্র ডেরিন সাউসা এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমাদের সদস্যরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। নভেম্বরে ভোটাররা যেন আবদুল আল–সাইয়েদ ও তাঁর চরমপন্থী ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান প্রত্যাখ্যান করেন, সে লক্ষ্যেই আমরা কাজ করব।’

অন্যদিকে আইপ্যাকের সুপার প্যাক ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্টের মুখপাত্র প্যাট্রিক ডর্টন বলেন, সাধারণ নির্বাচনে অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, জুনের শেষে সংগঠনটির হাতে প্রায় আট কোটি ডলার ছিল।

বড় পরিবর্তনের পথে আইপ্যাক

সাধারণ নির্বাচনে একজন রিপাবলিকান প্রার্থীকে প্রকাশ্যে সমর্থন করলে সেটি হবে আইপ্যাকের জন্য বড় পরিবর্তন। দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনটি নিজেদের দুই দলের কাছেই সমানভাবে গ্রহণযোগ্য বলে দাবি করে এসেছে। ২০২২ সালের আগে তারা ফেডারেল নির্বাচনে সরাসরি অর্থও ব্যয় করত না।

তবে আইপ্যাকের অনেক সমর্থকই আল–সাইয়েদকে বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন। কারণ, তাঁর নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল ইসরায়েলের সমালোচনা। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, নির্বাচিত হলে ইসরায়েলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন বন্ধের পক্ষে তিনি ভোট দেবেন।

রিপাবলিকান জুইশ কোয়ালিশনের রাজনৈতিক পরিচালক স্যাম মার্কস্টেইন বলেন, ‘আমাদের চুপ করে থাকতে বলা বা ভদ্র থাকার সময় শেষ। আমরা ভয় পাব না, অপপ্রচারেও থামব না। জিততে যা প্রয়োজন, আমরা তা–ই করব।’

স্যাম আরও বলেন, ‘ভালোবাসা পাওয়ার চেয়ে সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকাই আমাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

আবদুল আল–সাইয়েদ বিজয়ী হওয়ার পর দেওয়া ভাষণে ইহুদি ভোটারদের প্রতিও সমর্থনের বার্তা দেন। একই সঙ্গে তিনি প্রাইমারিতে আইপ্যাকের ভূমিকার সমালোচনা অব্যাহত রাখেন।

আবদুল আল–সাইয়েদ বলেন, ‘ইহুদি ধর্মাবলম্বী আমার সব ভাই–বোনকে, কিংবা অন্য যেকোনো ধর্মের মানুষকে, এমনকি কোনো ধর্মে বিশ্বাস না করা মানুষকেও আমি বলতে চাই—আপনাদের নিরাপত্তার প্রতি আমার যে অঙ্গীকার, সেটি আমার নিজের মেয়েদের নিরাপত্তার প্রতি অঙ্গীকারের মতোই দৃঢ়।’

আইপ্যাকের সঙ্গে যোগাযোগ আছে, ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান পার্টির এমন কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, নভেম্বরে সাধারণ নির্বাচনে সংগঠনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রাজনৈতিক কমিটি মাইক রজার্সের পক্ষে কয়েক কোটি ডলার ব্যয় করতে পারে।

প্রাইমারির আগে আইপ্যাকের নেতাদের সঙ্গে কথা বলা ছয় ব্যক্তি জানিয়েছেন, শুরু থেকেই তাঁদের ধারণা ছিল, আল–সাইয়েদ সাধারণ নির্বাচনে মনোনয়ন পেলে তাঁর বিরুদ্ধে আবারও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করবে আইপ্যাক।

রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স নিজেকে বরাবরই ইসরায়েলের দৃঢ় সমর্থক হিসেবে তুলে ধরেছেন।

নভেম্বরে অর্থ ব্যয়ের ইস্যু মিশিগান ছাড়িয়ে ছড়ায়

অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, ডেমোক্র্যাট প্রাইমারিতে আইপ্যাকের বিপুল অর্থ ব্যয় শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল দিয়েছে। কারণ, জনমত জরিপে আল–সাইয়েদের অবস্থান ক্রমেই শক্ত হচ্ছিল। তিনি নির্বাচনী প্রচারে আইপ্যাকের অর্থ ব্যয়ের বিষয়টিকেই প্রতিদ্বন্দ্বী হ্যালি স্টিভেন্সের বিরুদ্ধে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন।

তবে আইপ্যাকের নেতারা ব্যক্তিগত আলোচনায় এ নিয়ে কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করেননি। সংগঠনটির সঙ্গে যোগাযোগ থাকা কয়েকজন জানান, শুরু থেকেই এই দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল।

নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিকে আইপ্যাক–ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বড় দাতা সংগঠনটির সমালোচনা না করে বরং তাদের সমর্থিত প্রার্থী হ্যালি স্টিভেন্স ও গণমাধ্যমের সমালোচনা করেন।

শেষ পর্যন্ত খুব অল্প ভোটের ব্যবধানেই জয় পান আবদুল আল–সাইয়েদ।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে আইপ্যাক দাবি করে এসেছে, ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান—উভয় দলের রাজনীতিকদের জন্যই ইসরায়েলকে সমর্থন করা রাজনৈতিকভাবে লাভজনক। তবে এখন পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে।

ডেমোক্র্যাটদের অনেক প্রাইমারিতে ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নেওয়াই এখন প্রার্থীদের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে। সম্প্রতি এক জরিপে দেখা গেছে, মিশিগানের প্রায় অর্ধেক ডেমোক্র্যাট ভোটারের আইপ্যাক সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। বিপরীতে মাত্র ১২ শতাংশ ভোটার সংগঠনটিকে ইতিবাচকভাবে দেখেন।

এদিকে নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া ও ইলিনয়ের আসনগুলোয় ডেমোক্রেটিক পার্টির ইসরায়েলের সমালোচক প্রার্থীরা প্রাইমারিতে জয় পাচ্ছেন। ফলে আগামী কংগ্রেসে ইসরায়েল নিয়ে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রশ্ন তোলা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ পর্যন্ত তিনটি নির্বাচনী ধাপে অংশ নিয়ে আইপ্যাকের সুপার প্যাক বেশ কয়েকটি নির্বাচনে হেরেছে। তবে এত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেও এবারই প্রথম পরাজয়ের মুখে পড়ল সংগঠনটি। আবার ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান প্রার্থীর সাধারণ নির্বাচনের লড়াইয়ে তারা মাত্র একবার অর্থ ব্যয় করেছে।

আইপ্যাক আলোচনায়, কেন ব্যাখ্যা আসছে বিভিন্ন উদাহরণে

মিশিগানে আবদুল আল-সাইয়েদের জয়ের পরও ইসরায়েলপন্থী আইপ্যাক আলোচনায় রয়েছে। সেই নির্বাচনে পিটসবার্গের ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য সামার লির বিরুদ্ধে প্রায় ১২ লাখ ডলার ব্যয় করেছিল আইপ্যাকের সুপার প্যাক ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি সহজেই তাঁর রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করেন।

এ বছরের নির্বাচনে মেইনের রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সের পক্ষেও প্রচারে নামার বিষয়টি বিবেচনা করেছিল আইপ্যাক। তবে সংগঠনটির ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ধারণা, মেইন ও মিশিগান—দুই জায়গাতেই একসঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করার সম্ভাবনা কম।

এরই মধ্যে গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় ক্যালিফোর্নিয়ার একটি কংগ্রেসনাল আসনে ডেমোক্রেটিক পার্টির দুই প্রার্থীর লড়াইয়ে ১২ লাখ ডলার ব্যয়ের ঘোষণা দিয়েছে আইপ্যাক।

মিশিগানের নির্বাচনই প্রথম নয়, এর আগেও আইপ্যাকের অর্থ ব্যয় নির্বাচনী ইস্যু হয়ে উঠেছিল। এ বছর ইলিনয়ের ডেমোক্র্যাট প্রাইমারিতে আইপ্যাক–সমর্থিত কয়েকটি রাজনৈতিক কমিটি অঙ্গরাজ্যের সিনেটর লরা ফাইনের পক্ষে প্রায় ৪৪ লাখ ডলার ব্যয় করে। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ইভানস্টনের মেয়র ড্যানিয়েল বিস প্রচারজুড়েই আইপ্যাকের সমর্থন পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে লরা ফাইনের সমালোচনা করেন।

ড্যানিয়েল বিস নিজেও ইহুদি। ইসরায়েলের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। এরপরও তিনি সেই প্রাইমারিতে জয়ী হন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, কংগ্রেসে নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েল নীতি পরিবর্তনের পক্ষে কাজ করবেন।

মিশিগানে প্রাইমারির শেষ দিকে জনমত জরিপে নিজের স্পষ্ট এগিয়ে থাকার আভাস পেয়ে আবদুল আল–সাইয়েদ প্রকাশ্যেই আইপ্যাককে সাধারণ নির্বাচনেও তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ ব্যয়ের চ্যালেঞ্জ জানান।

আল–সাইয়েদ বলেন, ‘আইপ্যাক, যদি আমার কথা শুনে থাকো, তাহলে সাধারণ নির্বাচনেও এসো। তোমাদের অর্থ খরচ করো। দরকার হলে আরও খরচ করো। আমি খুশি মনে তোমাদের অর্থ নষ্ট করব। তারপর আমরা আসল কাজ শুরু করব—দেশ পরিচালনা এবং এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কি অন্য একটি দেশের স্বার্থে পরিচালিত হবে?’

অন্যদিকে আইপ্যাকের সমালোচক ও তুলনামূলক উদারপন্থী ইসরায়েল–সমর্থক সংগঠন জে স্ট্রিটের সভাপতি জেরেমি বেন–আমি বলেন, আইপ্যাকের সুপার প্যাক যদি সরাসরি মাইক রজার্সকে সমর্থন করে, তাহলে সেটি হবে রাজনৈতিকভাবে বড় ভুল।

জেরেমি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝতে না পারা এবং সময়ের পরিবর্তন উপলব্ধি না করা আমাকে ক্ষুব্ধও করে, আবার হতাশও করে।’

মিশিগান রিপাবলিকান পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান রন ওয়াইজার চলতি নির্বাচনে ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্টকে ১ লাখ ২৫ হাজার ডলার অনুদান দিয়েছেন।

রন ওয়াইজারের মতে, আইপ্যাকের উচিত মাইক রজার্সের পক্ষে অর্থ ব্যয় করা। তিনি বলেন, ‘এর প্রথম কারণ, আমি একজন রিপাবলিকান। দ্বিতীয় কারণ, আমি আর এমন কোনো কণ্ঠস্বর শুনতে চাই না, যারা ইসরায়েলে অর্থায়ন বন্ধ করার কথা বলে বা গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রীদের মতো এ ধরনের অবস্থান নেয়।’