ঢাকা-কলম্বো-কাঠমান্ডু—সর্বত্র আন্দোলনের চূড়ান্ত ক্ষণ ছিল সহিংস। তিন দেশেই গণ–আন্দোলন রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীকে জটিল পরিস্থিতির মুখে ফেলে

.

বাংলাদেশ ২০২৪-এ যাকে ‘গণ–অভ্যুত্থান’ বলছিল, শ্রীলঙ্কায় সিংহলিদের কাছে দুই বছর আগে সেটা ছিল ‘আরাগালায়া’। নির্বাচিত সরকারকে তাড়াতে গিয়ে নেপালিরা এক বছর পর সেটাকে বলছিল ‘জেন-জি অভ্যুত্থান’। কলম্বোতে শুরু হওয়া এই সুনামি ঢাকা-কাঠমান্ডু হয়ে তেলাপোকার রূপ ধরে তরঙ্গ তুলেছে সর্বশেষ বিশাল ভারতেও।

নয়াদিল্লি থেকে জুলাইয়ের বার্তাটি বেশ স্পষ্ট: দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে অতৃপ্ত তারুণ্যের রাজনৈতিক বাসনার অনেকখানি দেখা এখনো বাকি।

.

২০২২ সালের মার্চে শ্রীলঙ্কায় আরাগালায়ার তাৎক্ষণিক কারণ ছিল অর্থনৈতিক দুর্দশা, বিশেষ করে জ্বালানিসংকট। বাংলাদেশে অসন্তোষ উসকে দেয় রাষ্ট্রীয় নিয়োগে অন্যায্য কোটা। নেপালে শাসকদের দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ তছরুপ এবং ভারতে যুবকদের নিয়ে প্রধান বিচারপতির কটু মন্তব্য।

চার দেশেই শাসকদের প্রতি আরও অনেক অসন্তুষ্টি ছিল। আরাগালায়ার মধ্যেই সিংহলি ও তামিল তরুণদের কাছে হঠাৎ জনপ্রিয়তা পায় ‘সিস্টেম চেঞ্জ’ শব্দযুগল, যেভাবে বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ‘রাষ্ট্রসংস্কার’।

শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ-নেপালের মধ্যে সংগ্রাম সফল হতে বেশি সময় লাগে প্রথম দেশটিতে। দ্রুততম ছিল নেপালের অধ্যায়। সব দেশে প্রতিপক্ষের পরিণতি ছিল কাছাকাছি। তিন দেশে সর্বোচ্চ নির্বাহী পদচ্যুত হন। শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে মালদ্বীপের পথে রওনা দেন ২০২২ সালের ১৪ জুলাই। এর আগে মে মাসে তাঁর ভাই প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষেও বিদায় নেন।

.

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালান ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করে ৫০০ মাইল দূরের এক সামরিক গ্যারিসনে আশ্রয় নেন। চলতি বছরের ২৮ মার্চ গ্রেপ্তারও হন। তবে এপ্রিলে ছাড়া পান। তাঁর বিরুদ্ধে গণ–অভ্যুত্থানকালে হত্যা মামলার তদন্ত চলছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও অনেক মামলা। সর্বশেষ, ভারতীয় ‘ককরোচ’দের হাতে আরএসএস-বিজেপি পরিবার হারাল ‘প্রথম উইকেট’। মনোযোগ পাওয়ার মতো বিষয়, বিরোধী শিবিরের ভয় কাটিয়ে দিয়েছে নয়াদিল্লির সদ্য বিগত জুলাই।

বাংলাদেশ-নেপাল-শ্রীলঙ্কার গণ–আন্দোলনের পূর্বাপর খবরে বারবার হাসিনা, অলি ও গোতাবায়ার নাম এলেও তিন জায়গাতেই শাসক পরিবারগুলোও ক্ষোভের লক্ষ্যবস্তু ছিল। শ্রীলঙ্কায় রাজাপক্ষে পরিবার, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নিকটজনেরা এবং নেপালে অলি ও অন্য সাবেক শাসকদের পারিবারিক জীবনধারা আন্দোলনকারীদের অসন্তোষের বড় উপলক্ষ ছিল। নেপালে জেন-জিরা এ রকম প্রতিপক্ষকে বলত ‘নেপো-কিড’; অর্থাৎ ‘প্রভাবশালীদের বাচ্চা’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেপো-কিডদের ভোগবিলাস আর ক্ষমতার অপব্যবহারের খবরে নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্তরা মানুষ বিরক্ত ছিল। এটি ছিল আসলে সমাজের উৎকট ধনবৈষম্যজনিত ক্ষোভ।

ধনবৈষম্য, আয়বৈষম্য, দুর্নীতি ও সুশাসনের ঘাটতি তিন দেশে প্রবাসীদেরও আন্দোলনে শামিল করে। প্রতিটি দেশ বিপুলভাবে প্রবাসী আয়নির্ভর হওয়ায় তাঁদের সাড়া আন্দোলনকারীদের কৌশলগত সুবিধা দেয়।

ভারতের তরুণ-তরুণীদের জুলাই-জাগরণও বহির্বিশ্বে প্রবাসীদের মধ্যে ঢেউ তোলার মুখে নরেন্দ্র মোদি শিক্ষামন্ত্রীকে বলি দিয়ে পরিস্থিতি থামালেও বিজেপি শিবিরে এই প্রথম অজানা আতঙ্ক ভর করেছে।

.

ঢাকা-কলম্বো-কাঠমান্ডু—সর্বত্র আন্দোলনের চূড়ান্ত ক্ষণ ছিল সহিংস। তিন দেশেই গণ–আন্দোলন রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীকে জটিল পরিস্থিতির মুখে ফেলে। শ্রীলঙ্কায় চূড়ান্ত মুহূর্তে বিক্ষোভকারীদের দমনে অস্বীকৃতি জানায় তারা, যা বেশ বিস্ময় তৈরি করে এবং আন্দোলনকারীদের জন্য স্বস্তির হয়। বাংলাদেশেও চিত্র ছিল অনুরূপ। নেপালের বেলায় শুরুতে ভাঙচুর থেকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনী কঠোর পদক্ষেপ নিলেও পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব নেয়। তাতে অস্থায়ী সরকার গঠন সহজ হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসও সে রকম। ভারতের সমকালীন ইতিহাসেও এটা অভিনব ছিল যে শিক্ষার্থীদের সমাবেশে এসে পুলিশের একজন সংহতি জানিয়ে চাকরিতে ইস্তফা দেন।

.
ঢাকা-কলম্বো-কাঠমান্ডু—সর্বত্র আন্দোলনের চূড়ান্ত ক্ষণ ছিল সহিংস। তিন দেশেই গণ–আন্দোলন রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীকে জটিল পরিস্থিতির মুখে ফেলে
.

এ রকম যাবতীয় অভিজ্ঞতার মধ্যে তিন দেশে গণ–অভ্যুত্থানের পর নির্বাচন হয়েছে। দেশ-বিদেশে এসব নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতাও পেয়েছে। শ্রীলঙ্কা ও নেপালে ক্ষমতাচ্যুত দলগুলোও নির্বাচনে অংশ নেয়। ক্ষমতাচ্যুতদের রাজনৈতিক ভাগ্যনির্ধারণের ভার জনগণের হাতে দেওয়ার ফল ছিল চমকপ্রদ। শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতাচ্যুত রাজ পক্ষেদের প্রতিনিধি নমল (গোতাবায়ার ভাতিজা এবং মাহিন্দা রাজ পক্ষেরর পুত্র) মাত্র ২ শতাংশ ভোট পান।

নেপালে ক্ষমতাচ্যুত অলি নিজ আসনে প্রদত্ত ভোটের এক–চতুর্থাংশ পেয়ে বিরাট ব্যবধানে হারেন। ৩৬ বছর বয়সী বালেন শাহর কাছে ৭৪ বছর বয়সী তিনবারের প্রধানমন্ত্রীর এ রকম পরাজয় ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন এক স্পষ্ট যৌথ সাধারণ ইচ্ছার স্মারক। বাংলাদেশে জনতাকে সেভাবে আওয়ামী লীগের ‘ভাগ্যনির্ধারণ’–এর সুযোগ দেওয়া হয়নি। ভারতের তরুণদের বিক্ষোভের লক্ষ্য আপাতত সরকার ফেলে দেওয়া ছিল না—তবে সেখানের মিছিল ও বিক্ষোভের শক্তির কাছে সরকারি একগুঁয়েমি হার মেনেছে। ‘তন্ত্র’–এর ওপর ‘গণ’–এর এক দফার জয় হয়েছে।

.

নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশে পুরোনো দ্বিদলীয় ছক বেশ ঝাঁকুনির মুখে পড়েছে গণ–অভ্যুত্থানে। লঙ্কায় ‘আরাগালায়া’ মধ্য বামদের প্রভাব বাড়িয়েছে রাজনীতিতে। বাংলাদেশে জিতেছে মধ্য ডানরা। নেপালে বিজয়ী জাতীয়তাবাদী মধ্যপন্থী তরুণদের সমন্বয়ে পুনর্গঠিত ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’। ভারতের বেলায় আন্দোলন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ নিয়ে হলেও প্ল্যাকার্ড দেখার মতো ছিল গেরুয়া মতাদর্শের বিরুদ্ধে। তরুণদের মধ্যে আম্বেদকরের আবেদন বৃদ্ধি তাৎপর্যপূর্ণ সামাজিক লক্ষণ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

অন্য তিন দেশে নির্বাচন শেষে তিন নির্বাহী প্রধান প্রথমবারের মতো এ রকম দায়িত্ব নিলেন। নিজ নিজ দেশে এখনো তাঁরা জনপ্রিয়তায় নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে বেশ এগিয়ে। তবে তিন দেশেই তিন ধরনের দক্ষিণপন্থার চাপ স্পষ্ট—নির্বাচনী গণতন্ত্রে যাদের আগ্রহ কম। এই তিন দেশের দুটিতে আন্দোলনকারী তরুণ শক্তির ভেতর থেকে একাধিক সংগঠনের জন্ম হয়েছে। শ্রীলঙ্কাতে অভ্যুত্থানকারী তরুণ শক্তির একাংশ অনূঢ়াদের এনপিপি জোটের বাইরে থাকলেও পুরোনো বড় দলগুলোর সঙ্গে যায়নি। নেপালে ব্যতিক্রম একটা প্রবণতা দেখা গেল। অভ্যুত্থানকারী বিভিন্ন গ্রুপ নির্বাচনের আগে পুরোনো দলগুলোকে হারানোর প্রয়োজনে নিজেরাই বালেন শাহকে সামনে রেখে নবীন স্বতন্ত্র পার্টির ছায়ায় একত্র হয়। কাঠমান্ডু ও কলম্বোর রাজনীতিতে এখনো সংস্কারবাদী ঝোঁক প্রধান ধারা হয়ে আছে। বাংলাদেশে সাংগঠনিক জোটবদ্ধতায় জেন-জিদের বড় একাংশকে কাছে পেয়েছে মাওলানা মওদূদী প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামী। বাকিরা অ্যাকটিভিস্ট গ্রুপের আদলে পুনর্গঠিত হওয়ার চেষ্টায় আছে। ‘রাষ্ট্রসংস্কার’–এর প্রশ্নে হাল ছাড়তে চাইছে না তারা। ভারতেও ককরোচদের বড় অংশ সক্রিয় রাজনীতিতে থাকবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

.

এই লেখা তৈরির সময় নেপালে স্বতন্ত্র পার্টির ক্ষমতাসীন হওয়ার বয়স ১০০ দিন পার হয়ে গেছে। বাংলাদেশে তারেক রহমানের মন্ত্রিসভা পাঁচ মাস পার করেছে। শ্রীলঙ্কায় অনূঢ়া কুমার দিশানায়েকে অবশ্য প্রায় দুই বছর পার করে ফেলেছেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে।

অগ্রগামী গণ–অভ্যুত্থানকারী হিসেবে চাওয়া-পাওয়ার হিসাব বেশি হচ্ছে শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশে। স্পষ্টত অর্থনৈতিক অগ্রগতি বেশি লঙ্কায়। তবে পদ্ধতিগতভাবে সংস্কারের বেপরোয়া আয়োজন দেখা যাচ্ছে নেপালে নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে। ভারতেও আন্দোলনের নৈতিক ও আদর্শিক জোর এবং পাশাপাশি পুলিশি দৌরাত্ম্য প্রতিবাদের প্রতিধ্বনি আগামীর দিকে বহুদূর নিয়ে গেছে। তবে নয়াদিল্লি শান্ত হওয়ামাত্র রাষ্ট্রবিদ্যার ভাবুকেরা নতুন করে ভাবতে বসেছেন—তারুণ্যের নবতর এই রুদ্ররূপ দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে আদৌ কিছু পরিবর্তন ঘটাতে পারছে কি না?

.

গণ–অভ্যুত্থানের মুহূর্তে অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে দুর্দশায় ছিল শ্রীলঙ্কা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপর বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দেউলিয়া অবস্থা থেকে অর্থনীতির উত্তরণ। রনিল বিক্রমা সিংহের সরকার সেটা পেরেছিল। অনূঢ়াদের জনতা বিমুক্তি পেরামুনার নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারও অর্থনৈতিক বিষয়ে যত্নের সঙ্গে কাজ করছে। ফল হিসেবে সম্প্রতি দেশটি বিশ্বব্যাংক থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি পেল। গত বছর তাদের জিডিপি বেড়েছে ৫ শতাংশ। শ্রীলঙ্কার মতো বাংলাদেশেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অর্থনৈতিক বিপর্যয় রোধ করেছিল, বিশেষ করে ব্যাংক খাতকে প্রায় দেউলিয়া পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করে। তবে উভয় জায়গায় রাজনৈতিক সংস্কারের প্রধান প্রধান ক্ষেত্রগুলোতে অগ্রগতি আসেনি।

লঙ্কায় গণ–অভ্যুত্থানকালে সংস্কারের প্রধান প্রত্যাশা ছিল প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং তামিল এলাকার স্বায়ত্তশাসন। দুটিই এখনো অমীমাংসিত। অনূঢ়া কুমার প্রতিশ্রুতি রাখবেন বলে মানুষ এখনো বিশ্বাস করছে। তিনি দলকে সিংহলি জাতীয়তাবাদ থেকে শ্রীলঙ্কান জাতীয়তাবাদে টেনে আনছেন। তবে বহুকালের বিতর্কিত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রত্যাশিত সংস্কার না হওয়া নিয়ে স্থানীয়ভাবে অসন্তুষ্টি আছে।

.

তিন দেশের মধ্যে বাংলাদেশেই অন্তর্বর্তীকালীন আমলে রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রশ্নে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ছিল বেশি। ১১টি খাতে সংস্কারের জন্য কমিশন গঠিত হয় এবং কমিশনগুলো করণীয় হিসেবে অনেক সুপারিশও দেয়। তার অতি সামান্যই বাস্তবায়িত হয়েছে।

ভারতে ককরোচদের একাংশ শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর পুরো পরীক্ষাব্যবস্থারও রূপান্তর চাইছে এখন। আন্দোলনকারী প্রায় সবাই ‘আজাদি’র কথা বলেছে বারবার—মিছিলে, স্লোগানে। এর ব্যবহারিক ছাপ হয়তো দেখা যাবে দেশটির নিকট ভবিষ্যতের রাজনীতিতে। হয়তো তারা বুঝতে পারছে, সমস্যা কেবল একজন শিক্ষামন্ত্রী বা প্রধান বিচারপতি নয়।

সংস্কার প্রশ্নে এই চার দেশের মধ্যে কেবল বাংলাদেশেই গণভোট হয়। যদিও সেই জনরায় কাজে অনুবাদ হয়নি। নেপালে তরুণ প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহর নেতৃত্বে নতুন সরকার এসে প্রথম দিনই ১০০ দফা সংস্কার এজেন্ডা ঘোষণা করেছে। অধিকাংশ এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। অগ্রগতি অবশ্য কম। ১০০টি সংস্কার লক্ষ্যের পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে কেবল ৬টি। অন্যগুলোতে চেষ্টা চলছে।

নতুন সরকারের সংস্কার এজেন্ডার মধ্যে রয়েছে প্রেসিডেন্ট পদে সরাসরি নির্বাচন এবং প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়ানো। এ ছাড়া প্রবাসী নেপালিদের ভোটাধিকার দিতে চাইছে তারা। দেশের বর্তমান ফেডারেল ব্যবস্থা নিয়েও বালেন শাহর ভিন্ন চিন্তা আছে। তবে অন্যান্য রাজনৈতিক দল এসব উদ্যোগে শীতল প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। ইতিমধ্যে সরকার খরচ কমাতে মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা কমিয়ে ১৮–তে নিয়ে এসেছে।

.

তিন অভ্যুত্থান–পরবর্তী সংশ্লিষ্ট ছয় সরকারই যার যার সামরিক আমলাতন্ত্রের সংস্কার প্রশ্ন এড়িয়ে গেছে ও যাচ্ছে। তবে গণ–অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা—তিন দেশই বিদেশনীতিতে লক্ষণীয় বদল ঘটিয়েছে। তিন প্রধানমন্ত্রীই চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছেন। এশিয়ার দুই পরাশক্তিও অভ্যুত্থানের ধাক্কা সামলে পুরোনো প্রভাব ফিরে পেতে সৃজনশীল নানান চেষ্টায় আছে। ওয়াশিংটনও তার স্বার্থে সক্রিয়।

অভ্যুত্থানের পরপর বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিতর্কিত বাণিজ্যচুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে গেলেও শ্রীলঙ্কা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সময় নিজ সীমানায় যুক্তরাষ্ট্রের যোদ্ধাদের নামতে দেওয়ার প্রস্তাব অগ্রাহ্য করার হিম্মত দেখায়। নেপালের নতুন সরকারও সীমান্ত নিয়ে চীন-ভারত উভয় দেশের সঙ্গে সাহসী বাক্য বিনিময় করছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও প্রথম বিদেশ সফরে ভারত-চীনের বদলে তৃতীয় দেশে গিয়ে মধ্যপন্থার বার্তা দিলেন।

এসব ঘটনার মধ্যেই ভারতে নতুন চরিত্র হিসেবে ককরোচদের উত্থান। অনশন ও সমাবেশের মতো অহিংস পদ্ধতিকে তারা নিজ দেশের ভঙ্গুর গণতন্ত্র পুনর্গঠিত করার উপায় হিসেবে পছন্দ করেছে। এ রকম ভারতই হয়তো আশপাশের প্রতিবেশীদের আরাধ্য। প্রযুক্তির সূত্রে কাছাকাছি চলে আসা নতুন প্রজন্ম ক্রমে নতুন এক দক্ষিণ এশীয় গণতান্ত্রিক অক্ষশক্তি হয়ে ওঠার পথে রয়েছে বলে ইঙ্গিত মিলছে গত চার বছরে। তবে পুরোনো বন্দোবস্তে এখনো ফাটল ধরাতে পারেনি তারা, তবে সমস্যা শনাক্ত করতে পারাও চিকিৎসায় এক ধাপ অগ্রগতি।

  • আলতাফ পারভেজ: দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসবিষয়ে গবেষক