ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা জ্ঞানের ঐক্যের কথা বললেও সব জ্ঞানকে একই মর্যাদায় স্থাপন করে না। বাস্তবতার যেমন স্তরবিন্যাস রয়েছে, তেমনি তাকে জানার পথও স্তরবিন্যস্ত। দৃশ্যমান ও অদৃশ্য, ভৌত ও নৈতিক এবং সাময়িক ও চিরন্তনের যে সহাবস্থান, সেখানে জ্ঞানেরও ‘মারাতিব’ বা স্তর থাকা অনিবার্য। এই বিন্যাস ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং বিষয়, পরিসর এবং ব্যাখ্যার গভীরতার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত।
এই স্তরবিন্যাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করে ওহিগত জ্ঞান। এর শ্রেষ্ঠত্বের কারণ হলো এর আলোচ্য বিষয়। অস্তিত্বের কারণ, মানুষের উদ্দেশ্য, নৈতিকতার ভিত্তি, মৃত্যুর পরিণতি এবং আমানত ও খেলাফতের প্রকৃত তাৎপর্যের মতো প্রশ্নগুলোর উত্তর কেবল ওহির কাছেই পাওয়া যায়। ওহি প্রকৃতিপাঠের চূড়ান্ত দিগ্দর্শক হিসেবে কাজ করে; এটি কারণ ব্যাখ্যা না করে বরং উদ্দেশ্য উন্মোচন করে।
এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “বিজ্ঞান যদি উদ্দেশ্যের ভাষায় কথা বলতে শুরু করে, তবে সে নিজের সীমানা অতিক্রম করে; আবার ধর্ম যদি পরীক্ষাগারের ভাষায় প্রতিটি প্রাকৃতিক ঘটনার প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা দিতে চায়, তবে সে–ও তার নিজস্ব মারাতিব থেকে সরে যায়।”
পরবর্তী স্তরে রয়েছে ফিতরাতগত জ্ঞান, যা মানুষের অন্তরে বিদ্যমান এক স্বীকৃতিশক্তি। এর মাধ্যমেই মানুষ ন্যায়-অন্যায়, সৌন্দর্য-কুশ্রীতা এবং ভারসাম্য-বিশৃঙ্খলার প্রাথমিক বোধ লাভ করে। তবে এই জ্ঞান সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়; ওহির আলো এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এটি পরিশুদ্ধ ও পরিণত হয়। নফস, অভ্যাস ও সংস্কৃতির প্রভাবে এই অন্তরের মিজান আচ্ছন্ন হতে পারে, তাই একে জাগ্রত রাখতে ওহি ও তাজকিয়াহ অপরিহার্য।
এরপরের স্তরে আসে পর্যবেক্ষণমূলক ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান। সৃষ্টির কার্যকারণ, বিন্যাস এবং নিয়মাবলি উন্মোচনে এই জ্ঞানের ভূমিকা অপরিসীম। খেলাফতের দায়িত্ব পালনের জন্য সৃষ্টির কার্যপ্রণালি জানা আবশ্যক হলেও, সৃষ্টির উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা বিজ্ঞানের এখতিয়ারের বাইরে। জ্ঞানের এই স্তরবিন্যাসই প্রতিটি শাখার সীমারেখা স্পষ্ট করে দেয়।
তদাবতে ঐতিহাসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জ্ঞানের কথা বলা যায়। এগুলো মানুষের সম্মিলিত জীবন, অভিজ্ঞতা এবং সভ্যতার পরিবর্তনশীল হাকিকত ব্যাখ্যা করে। মানবসমাজ ও রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের সাথে সাথে এই জ্ঞানগুলোও সংশোধনযোগ্য ও বিবর্তনশীল। তবে বাস্তব সমাজে ওহিগত নীতির প্রয়োগের জন্য এই জ্ঞানের গুরুত্ব অপরিসীম।
সবশেষে রয়েছে কারিগরি ও প্রয়োগগত জ্ঞান, যেমন—চিকিৎসা, প্রকৌশল, কৃষি ও প্রশাসন। এগুলোর মূল্য তাদের প্রয়োগ বা এস্তেমালে। তবে উন্নত প্রযুক্তি মানুষের জন্য কল্যাণকর কি না, সেই নৈতিক প্রশ্নের উত্তর প্রযুক্তি নিজে দিতে পারে না।
জ্ঞানের এই স্তরবিন্যাসের উদ্দেশ্য কোনো জ্ঞানকে ছোট বা বড় করা নয়, বরং প্রতিটি জ্ঞানকে তার যথার্থ মাকামে স্থাপন করা। বিশৃঙ্খলা তখনই তৈরি হয়, যখন কোনো একটি স্তর নিজেকে একচ্ছত্র কর্তৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই বিষয়ে সতর্ক করে বলা হয়েছে, “বিজ্ঞান দর্শনের জায়গা নিতে চায়, দর্শন ওহির জায়গা নিতে চায়, আবার লোকজ অভিজ্ঞতা পরীক্ষিত জ্ঞানের বিকল্প হয়ে উঠতে চায়, তখন সমাধান আসে না, সমস্যা বাড়ে।”
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা এই ভারসাম্যহীনতাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং মনে করিয়ে দেয় যে, ইলমেরও আদব আছে। সেই আদবের প্রথম শর্ত হলো প্রতিটি জ্ঞানকে তার নিজস্ব মারাতিবে প্রতিষ্ঠিত করা। ‘মারাতিবুল ইলম’ ধারণাটি ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার একটি মৌলিক ভিত্তি। কারণ, ঐক্য মানেই সমতা নয়, বরং ঐক্য হলো সুশৃঙ্খল সামঞ্জস্য। যখন প্রতিটি ইলম তার যথার্থ মাকাম চিনে নিয়ে অন্য ইলমের সঙ্গে তাআউন (সহযোগিতা) ও তাকামুল বা পূর্ণতা বিধানের সম্পর্কে আবদ্ধ হয়, তখনই জ্ঞানের প্রকৃত নেজাম প্রতিষ্ঠিত হয়।
— লেখক: মুসা আল হাফিজ, প্রাবন্ধিক ও গবেষক এবং ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের চেয়ারম্যান।