একটি স্বাধীন পরীক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নের সময় সৃষ্ট ত্রুটির কারণে মেটার একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেল ইন্টারনেটে সংযুক্ত হয়ে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করে সেটি হ্যাক করেছে। মেটা কর্তৃপক্ষ নিজেই এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এমন এক সময়ে মেটার এই ঘোষণা এল, যখন একের পর এক এআই মডেলের মাধ্যমে নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের এআই মডেলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।
মেটার এক মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, ‘মিসকনফিগারেশন’ বা ত্রুটিপূর্ণ বিন্যাসের কারণে ঘটে যাওয়া এই হ্যাকিংয়ের এ ঘটনা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, এই ঘটনাটি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে আগে প্রকাশিত অনুরূপ ঘটনার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
মেটা জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরীক্ষাগুলো পরিচালনা করেছে ‘ইরেগুলার’ নামের একটি এআই নিরাপত্তাপ্রতিষ্ঠান। এর আগে একই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের এআই মডেলের ওপরও পরীক্ষা চালিয়েছিল, যেখানে অ্যানথ্রপিকের মডেলটি তিনটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিল।
ইরেগুলারের এক মুখপাত্র বলেন, ‘মেটার ঘটনাটি মূলত মূল্যায়ন পরিবেশ সংক্রান্ত ঠিক সেই একই ধরনের সমস্যা, যার কথা অ্যানথ্রপিক গত সপ্তাহেই প্রকাশ করেছিল।’ তিনি বিবিসিকে আরও জানান, এআই এজেন্টকে অন্তর্ভুক্ত করে সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষা কীভাবে নিরাপদভাবে পরিচালনা করা যায়—ইরেগুলার বর্তমানে এমন একটি প্রতিবেদন তৈরির কাজ করছে।
মেটা জানিয়েছে, ঘটনাটি সম্পর্কে সব তথ্য-উপাত্ত হাতে পাওয়ার পর তারা বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করবে।
গত দুই সপ্তাহে এআই খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকও জানিয়েছে, পরীক্ষার সময় তাদের এআই মডেলগুলো অন্য প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করতে বা হ্যাক করতে সক্ষম হয়েছিল। চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআই একাধিক ঘোষণায় জানিয়েছে, তাদের এআই এজেন্টগুলো হাগিং ফেসসহ বিভিন্ন উন্মুক্ত অনলাইন সেবার ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল। উল্লেখ্য, হাগিং ফেস হলো এআই টুল ও মডেলের একটি জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম।
এদিকে যুক্তরাজ্যের এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট (এআইএসআই) এ সপ্তাহে জানিয়েছে, ‘তাদের পরীক্ষায় দেখা গেছে, কিছু এআই মডেল সাইবার আক্রমণ চালানোর চেষ্টা করেছে। এ জন্য এআই মডেল ভুয়া মানব পরিচয় তৈরি করে মানুষকে প্রতারণার মাধ্যমে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল।’
এআইএসআই আরও জানিয়েছে, সবচেয়ে গুরুতর ঘটনা ঘটিয়েছে অ্যানথ্রপিকের এআই মডেল মিথোস। এটি একটি সেবায় প্রবেশাধিকার পেতে বাস্তব ব্যক্তিদের পরিচয় অনুকরণ করে তৈরি করা ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ব্যক্তিগত বার্তা পাঠিয়েছিল। তবে অ্যানথ্রপিক দাবি করেছে, এআইএসআই-এর পরীক্ষায় ব্যবহৃত মডেলগুলো তাদের বাস্তবে ব্যবহৃত কোনো মডেলের প্রতিনিধিত্ব করে না। একইভাবে ওপেনএআই-ও জানিয়েছে, এআইএসআই-এর মূল্যায়নগুলো সাধারণ বা বাস্তব ব্যবহার পরিস্থিতির প্রতিফলন করে না।
ওপেনএআই-এর তথ্য প্রকাশের পর অ্যানথ্রপিক নিজস্ব তদন্ত চালিয়ে জানতে পারে, ‘মিসকনফিগারেশন’-এর কারণে ইন্টারনেটে প্রবেশাধিকার পাওয়ার পর তাদের ‘ক্লড’ এআই মডেল কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে একই ধরনের আক্রমণ চালিয়েছিল।
এই ধারাবাহিক ঘটনায় গবেষক ও বিভিন্ন দেশের সরকার সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও কঠোর করার এবং ব্যাপক পরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন। তবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন এআই উন্নয়নের আধিপত্য লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন কেন তারা এসব তথ্য প্রকাশ করল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা। উল্লেখ্য, ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক বর্তমানে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের তালিকাভুক্তির (আইপিও) প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বাজারমূল্য প্রায় এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার (এক লাখ কোটি মার্কিন ডলার) হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।