গত জুলাই মাসে বাংলাদেশে ৪৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪১৬ জন নিহত এবং ৬২৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৫৭ জন নারী এবং ৪৮ জন শিশু রয়েছেন। মোট নিহতের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের বেশি (৩৩.১৭%) বা ১৩৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ‘রোড সেফটি ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৫৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩৮ জন, যা মোট প্রাণহানির ৩৩.১৭ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ছিল ৩৪.৭১ শতাংশ। এছাড়া দুর্ঘটনায় ১০৬ জন পথচারী নিহত হয়েছেন (মোট নিহতের ২৫.৪৮%)। যানবাহন চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৫১ জন (১২.২৫%)।
যানবাহনভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ১৩৮ জন (৩৩.১৭%), বাসের যাত্রী ২১ জন (৫.০৪%), ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ-ট্রলির আরোহী ১৯ জন (৪.৫৬%), মাইক্রোবাস-অ্যাম্বুলেন্সের আরোহী ৭ জন (১.৬৮%), থ্রি-হুইলারের যাত্রী ৯৪ জন (২২.৫৯%), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী ২৬ জন (৬.২৫%) এবং রিকশা-বাইসাইকেল আরোহী ৫ জন (১.২০%) নিহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনাগুলোর স্থান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৬৯টি (৩৬.৮৯%) জাতীয় মহাসড়কে, ১৫৫টি (৩৩.৮৪%) আঞ্চলিক সড়কে, ৬১টি (১৩.৩১%) গ্রামীণ সড়কে, ৬৬টি (১৪.৪১%) শহরের সড়কে এবং ৭টি (১.৫২%) অন্যান্য স্থানে ঘটেছে।
দুর্ঘটনার ধরনের মধ্যে ১২৩টি (২৬.৮৫%) মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৬৪টি (৩৫.৮০%) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ১০৮টি (২৩.৫৮%) পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়া, ৫৪টি (১১.৭৯%) যানবাহনের পেছনে আঘাত এবং ৯টি (১.৯৬%) অন্যান্য কারণে ঘটেছে।
জুলাই মাসে দুর্ঘটনায় মোট ৭১১টি যানবাহন সম্পৃক্ত ছিল। এর মধ্যে মোটরসাইকেল ১৭২টি (২৪.১৯%), ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ-ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি-ড্রাম ট্রাক-ময়লাবাহী ট্রাক ১৬০টি (২২.৫০%), থ্রি-হুইলার ১৩১টি (১৮.৪২%), যাত্রীবাহী বাস ১২৪টি (১৭.৪৪%), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন ৫২টি (৭.৩১%), রিকশা ও বাইসাইকেল ১৩টি (১.৮২%), অন্যান্য যানবাহন ২১টি (২.৯৫%) এবং অজ্ঞাত যানবাহন ৩৮টি (৫.৩৪%)।
সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে ভোরে ৭.৪২%, সকালে ২৮.৮২%, দুপুরে ১৭.২৪%, বিকালে ১৪.৮৪%, সন্ধ্যায় ১২.২২% এবং রাতে ১৯.৪৩% দুর্ঘটনা ঘটেছে।
বিভাগভিত্তিক হিসেবে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা (২৯.০৩%) ও প্রাণহানি (৩০.০৪%) ঘটেছে, যেখানে ১৩৩টি দুর্ঘটনায় ১২৫ জন নিহত হয়েছেন। চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্ঘটনা ২১.৬১% ও প্রাণহানি ১৯.২৩%, রাজশাহী বিভাগে দুর্ঘটনা ১১.৩৫% ও প্রাণহানি ১২%, রংপুর বিভাগে দুর্ঘটনা ৯.৮২% ও প্রাণহানি ১১.২৯%, খুলনা বিভাগে দুর্ঘটনা ৭.৮৬% ও প্রাণহানি ৭.৬৯%, ময়মনসিংহ বিভাগে দুর্ঘটনা ৭.৪২% ও প্রাণহানি ৭.২১%, সিলেট বিভাগে দুর্ঘটনা ৬.৭৬% ও প্রাণহানি ৬.৭৩% এবং বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে কম ২৮টি দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত হয়েছেন (দুর্ঘটনা ৬.১১%, প্রাণহানি ৫.৭৬%)। রাজধানী ঢাকায় ৩৪টি দুর্ঘটনায় ১৮ জন নিহত ও ৪৭ জন আহত হয়েছেন।
নিহতদের পেশাগত পরিচয়ে দেখা যায় পুলিশ সদস্য ১ জন, বিজিবি সদস্য ১ জন, শিক্ষক ৭ জন, সাংবাদিক ৩ জন, চিকিৎসক ২ জন, প্রকৌশলী ২ জন, আইনজীবী ৩ জন, কৃষি কর্মকর্তা ১ জন, ব্যাংক-বীমা কর্মকর্তা ও কর্মচারী ১৪ জন, এনজিও কর্মী ১৬ জন, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ২৩ জন, স্থানীয় ব্যবসায়ী ২৭ জন, ঔষধ ও পণ্য সামগ্রী বিক্রয় প্রতিনিধি ১৭ জন, মসজিদের ইমাম বা খাদেম ৩ জন, ইলেকট্রিক মিস্ত্রি ১ জন, মোটর মেকানিক ১ জন, পোশাক শ্রমিক ৫ জন, কৃষি শ্রমিক ৫ জন এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৫৩ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন সড়ক দুর্ঘটনার ১১টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে। সেগুলো হলো: ১. ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন; ২. ত্রুটিপূর্ণ সড়ক; ৩. বেপরোয়া গতি; ৪. চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা; ৫. নির্দিষ্ট বেতন ও কর্মঘণ্টা না থাকা; ৬. মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল; ৭. তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো; ৮. জনসাধারণের ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা; ৯. দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা; ১০. বিআরটিএ-র সক্ষমতার ঘাটতি; এবং ১১. গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি।
সংস্থাটি ১২ দফা সুপারিশ পেশ করেছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ১. জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন; ২. বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএ-র ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কার; ৩. মোটরযানে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা; ৪. সড়ক থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার; ৫. রাজধানীতে রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক আধুনিক বাস সার্ভিস চালু করা; ৬. বিআরটিসির বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি; ৭. দক্ষ চালক তৈরির প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বাড়ানো; ৮. স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য মহাসড়কে সার্ভিস রোড নির্মাণ; ৯. সব রেল ক্রসিংয়ে গেট-কিপার নিয়োগ; ১০. সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বাড়াতে বাজেটে অর্থ বরাদ্দ; ১১. প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে জ্ঞান বৃদ্ধি; ১২. টেকসই পরিবহন কৌশলের অধীনে সড়ক, রেল ও নৌ-পরিবহন একত্রিত করে একটি অভিন্ন ‘যোগাযোগ মন্ত্রণালয়’ গঠন।
সংস্থাটি জানায়, সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব, এবং এ ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা অতীব জরুরি।