১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট কোনো বড় আয়োজন ছাড়াই ব্রিটিশ কম্পিউটারবিজ্ঞানী টিম বার্নার্স-লি এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। সুইজারল্যান্ডের ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ বা সার্নে কর্মরত থাকাকালীন তিনি নিজের উদ্ভাবিত ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব (ডব্লিউডব্লিউডব্লিউ) সবার জন্য উন্মুক্ত করেন এবং প্রকাশ করেন বিশ্বের প্রথম ওয়েবসাইট। সেই ঐতিহাসিক ওয়েবসাইটটির ঠিকানা ছিল http://info.cern.ch।
১৯৫৫ সালে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করা বার্নার্স-লির বাবা-মা উভয়েই ছিলেন কম্পিউটারবিজ্ঞানী। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে পড়াশোনা শেষ করে তিনি সার্নে যোগ দেন। ১৯৮০-র দশকে সেখানে কাজ করার সময় তিনি লক্ষ্য করেন, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন সংস্থার হাজার হাজার গবেষকের প্রকল্প ও কম্পিউটার সিস্টেমের তথ্য সংগ্রহ করা অত্যন্ত জটিল। এই সমস্যার সমাধানে ১৯৮৯ সালের মার্চ মাসে তিনি সার্নের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে একটি তথ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেম তৈরির প্রস্তাব দেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন কম্পিউটারের নথি বা ডকুমেন্টগুলোকে লিঙ্ক করার জন্য হাইপারটেক্সট ব্যবহার করা। শুরুতে প্রস্তাবটি অস্পষ্ট হওয়ায় গৃহীত হয়নি। পরবর্তীতে সার্নের আরেক প্রকৌশলী রবার্ট কাইলিয়াউয়ের সঙ্গে যৌথভাবে প্রস্তাবটি পরিমার্জন করে পুনরায় জমা দেন তিনি। ১৯৯০ সালে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সুযোগ মেলে। শুরুতে এর নাম রাখা হয়েছিল 'ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট', যা পরে 'ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব' হিসেবে নামকরণ করা হয়।
১৯৯০ সালের শেষ দিকে অ্যাপলের সহপ্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবসের নকশা করা নেক্সট কম্পিউটার ব্যবহার করে বার্নার্স-লি ওয়েব পেজ তৈরির জন্য হাইপারটেক্সট মার্কআপ ল্যাঙ্গুয়েজ, ডেটা স্থানান্তরের প্রোটোকল হাইপারটেক্সট ট্রান্সফার প্রোটোকল এবং ওয়েব ঠিকানার ইউনিফর্ম রিসোর্স লোকেটর (ইউআরএল) তৈরি করেন। এর পাশাপাশি তিনি একটি ব্রাউজার এবং ওয়েব সার্ভার সফটওয়্যারও প্রস্তুত করেন।
অবশেষে ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত হয় এই সেবা। ইতিহাসের প্রথম ওয়েবসাইটটি ছিল মূলত ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব প্রজেক্ট সম্পর্কিত, যেখানে ওয়েব কী এবং এর ব্যবহার পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছিল।
নিজের এই উদ্ভাবন থেকে কোনো অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করেননি বার্নার্স-লি। এমনকি ওয়েব প্রযুক্তি পেটেন্ট করার বিষয়ে সার্নের আহ্বানও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি চেয়েছিলেন ওয়েব যেন উন্মুক্ত ও মুক্ত থাকে, যাতে এর দ্রুত প্রসার ও বিকাশ ঘটে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এই প্রযুক্তি যদি পেটেন্ট করা থাকত এবং আমার একক নিয়ন্ত্রণে থাকত, তবে এটি হয়তো এভাবে আলো দেখত না। আপনি কোনো কিছুকে একটি সর্বজনীন ক্ষেত্র হিসেবে প্রস্তাব করে সেটির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারেন না।”
১৯৯৩ সালে ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সুপারকম্পিউটিং অ্যাপ্লিকেশনের একটি দল 'মোসাইক' প্রকাশ করে, যা সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় প্রথম ওয়েব ব্রাউজার হয়ে ওঠে। এর পরবর্তী কয়েক বছরে ইয়াহু (১৯৯৪), অ্যামাজন (১৯৯৫), ইবে (১৯৯৫) এবং গুগলের (১৯৯৮) মতো প্রভাবশালী ওয়েবসাইটগুলোর যাত্রা শুরু হয়। ইন্টারনেট লাইভ স্ট্যাটসের তথ্যমতে, ২০০৪ সালে ফেসবুক আত্মপ্রকাশের সময় ততদিনে ৫১ মিলিয়নের (৫ কোটি ১০ লাখ) বেশি ওয়েবসাইট তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
১৯৯৪ সালে সার্ন ছেড়ে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে যোগ দেন বার্নার্স-লি এবং সেখানে প্রতিষ্ঠা করেন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব কনসোর্টিয়াম, যা ওয়েবের মানদণ্ড বা স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রচারবিমুখ এই বিজ্ঞানী পরবর্তীতে টাইম সাময়িকীর বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১০০ ব্যক্তির তালিকায় স্থান পান। ২০০৪ সালে যুক্তরাজ্যের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করেন। এছাড়া ২০০৯ সালে তিনি ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব ফাউন্ডেশন চালু করেন।