জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন একটি পথ তৈরির বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে ইরান ও ওমান। বর্তমানে দুই দেশ যৌথভাবে এই জলপথ পরিচালনার বিষয়টি চূড়ান্তভাবে পর্যালোচনা করছে। তবে ওমানের সঙ্গে সমঝোতা হলেও এই জলসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ও হুমকির কারণে পরিস্থিতি অনিশ্চিত হতে পারে বলে মনে করছে তেহরান।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও ওমানের এই সমঝোতার ইঙ্গিত আগেই পাওয়া গিয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উল্লেখ করেছিলেন যে, তেহরান এই বিষয়ে একটি চুক্তি করতে আগ্রহী; অন্যথায় ইরানে ব্যাপক হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছিলেন তিনি। এরই মধ্যে ওমানের সঙ্গে সমঝোতার কথা জানাল তেহরান, তবে তারা স্পষ্ট করেছে যে এই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র যুক্ত ছিল না।

সমঝোতার বিষয়টি প্রথম নিশ্চিত করেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। গতকাল বুধবার তিনি বলেন, "হরমুজে দুই দেশ যে পথ অনুসরণ করবে, তা নিয়ে সমঝোতা হয়েছে। তৃতীয় কোনো পক্ষ বাধা না দিলে শিগগিরই দুই দেশ এ নিয়ে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করবে। সেখানে রাজি হওয়া প্রধান বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে। বর্তমানে বিবৃতিটির খসড়ার চূড়ান্ত পর্যালোচনা চলছে।"

তবে ওমানের সঙ্গে এই সমঝোতা হলেও জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইসমাইল বাঘাই। তাঁর মতে, হরমুজ প্রণালিকে এখনো অনিরাপদ করে রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের নৌ অবরোধ এবং অন্যান্য আগ্রাসী ও হুমকিমূলক পদক্ষেপ এখনো অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

উল্লেখ্য, যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানির প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। তবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেহরান এই জলপথ কার্যত বন্ধ রেখেছে। ইরান চায় প্রণালির উত্তর দিক তাদের নিয়ন্ত্রিত পথে জাহাজ চলাচল করুক, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া ছিল প্রণালির দক্ষিণ দিকে ওমান উপকূল দিয়ে জাহাজ চলাচল। এই বিপরীতমুখী দাবির কারণে সম্প্রতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাতও তৈরি হয়েছিল।

হরমুজ প্রণালির উত্তর পাশে ইরান এবং দক্ষিণ পাশে ওমান অবস্থিত। গত সপ্তাহে মাসকাট তেহরানকে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল, যেখানে মালাক্কা প্রণালির আদলে নিরাপত্তা দেওয়ার বিনিময়ে সেবা ফি নেওয়ার কথা বলা হয়। এছাড়া জাহাজ চলাচলের পথগুলো ইরান ও ওমানের মধ্যে দুই ভাগে ভাগ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। ইরান সেই প্রস্তাব নাকচ করে একটি পাল্টা প্রস্তাব দেয়, যার পর থেকে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলে। গত মঙ্গলবার ইসমাইল বাঘাই ওমানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ইতিবাচক আলোচনার কথা জানান। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-ও এই আলোচনায় অগ্রগতির খবর দিয়েছিলেন।

আলোচনার পর যে সমঝোতা হয়েছে, তাতে ইরানের সুবিধাই বেশি বলে মনে করছেন দেশটির কর্মকর্তারা। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি জানিয়েছেন, সমঝোতা অনুযায়ী নতুন নৌপথের বড় অংশ ইরানের আঞ্চলিক জলসীমা দিয়ে যাবে এবং কিছু অংশ ওমানের জলসীমা অতিক্রম করবে। এই পথটি প্রাথমিকভাবে দুই থেকে চার মাস ব্যবহার করা হবে এবং পরবর্তীতে মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে।

তেহরানভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক আলী আকবর দারেইনি আল-জাজিরাকে বলেন, "হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে সমঝোতাই এই যুদ্ধে ইরানের সবচেয়ে বড় সামরিক অর্জন। তাদের লক্ষ্য এখন এই প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ স্থায়ী করা। তবে তাদের এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে সেখানে যেন শান্তি বজায় থাকে।"