ক্যাডেট কলেজের প্রস্তুতি এক বা দুই সপ্তাহে তাড়াহুড়া করে নেওয়া পড়াশোনায় হয় না। এ প্রস্তুতির জন্য অন্তত ছয় মাস থেকে এক বছরের একটি ধারাবাহিক, নিয়মতান্ত্রিক ও পরিকল্পিত প্রস্তুতি দরকার। দীর্ঘ এই সময়কে চাইলে তিনটি ধাপে ভাগ করে একটি কার্যকর রুটিন দাঁড় করানো যেতে পারে।
প্রথম ধাপ (প্রথম ৩ মাস)—বেসিক বা ভিত্তি শক্ত করা: এ পর্যায়ে লক্ষ্য থাকবে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড নির্ধারিত ষষ্ঠ শ্রেণির মূল বইগুলোর (বিশেষ করে গণিত, বাংলা ও ইংরেজি) প্রতিটি অধ্যায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে শেষ করা। কোনো অধ্যায় বাদ না দিয়ে খুঁটিনাটি নিয়ম ও সূত্র বুঝে আয়ত্ত করার ওপর জোর দিতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপ (পরবর্তী ৩ মাস)—অ্যাডভান্সড প্রস্তুতি ও বিশ্লেষণ: মূল বইগুলো শেষ হওয়ার পর ক্যাডেট গাইড বা বিভিন্ন সহায়কমূলক বইয়ের সহায়তা নিতে হবে। এ সময় বিগত বছরের প্রশ্নগুলো বিশ্লেষণ করতে হবে। পাশাপাশি ইংরেজিতে ফ্রি-হ্যান্ড রাইটিং, কঠিন ব্যাকরণ এবং সাধারণ জ্ঞানের পরিধি বাড়ানোর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
তৃতীয় ধাপ (শেষ ২ মাস)—মডেল টেস্ট ও রিভিশন: প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে নতুন করে কিছু শেখার চেয়ে রিভিশনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। প্রতিদিন ঘড়ি ধরে পূর্ণাঙ্গ মডেল টেস্ট দিতে হবে। এরপর পরীক্ষার পর নিজের ভুলগুলো চিহ্নিত করে শিক্ষকের সহায়তায় বা নিজে নিজে সংশোধন করে নিতে হবে।
বিশেষ পরামর্শ: ক্যাডেট ভর্তি পরীক্ষায় সফল হতে হলে প্রতিদিন অন্তত পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা মনোযোগ দিয়ে পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। দৈনিক রুটিনে গণিত সমাধান ও ইংরেজি চর্চার জন্য নির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত সময় বরাদ্দ রাখার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া লিখিত পরীক্ষায় ভালো করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিগত বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণের কথাও এসেছে। ১০-১৫ বছরের ক্যাডেট কলেজ ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সমাধান করা বাধ্যতামূলক—এতে প্রশ্নের ধরন ও প্যাটার্ন বোঝা, কোন কোন অধ্যায় থেকে প্রতিবছর প্রশ্ন আসে তা চিহ্নিত করা এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরীক্ষা শেষ করার বাস্তবসম্মত ধারণা পাওয়া যায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরীক্ষার হলে প্রস্তুতি ভালো থাকা সত্ত্বেও অনেকের পারফরম্যান্স খারাপ হওয়ার পেছনে সঠিক কৌশলের অভাব দায়ী হতে পারে। কৌশল হিসেবে হস্তাক্ষর ও পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ক্যাডেট কলেজের খাতা যাঁরা মূল্যায়ন করেন, তাঁরা অত্যন্ত পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করেন। হাতের লেখা সুন্দর করার চেয়ে বেশি জরুরি তা যেন স্পষ্ট ও পঠনযোগ্য হয়। কাটাকাটি যথাসম্ভব বর্জন করতে হবে। ভুল হলে দাগ দিয়ে কেটে পাশে পরিষ্কারভাবে লেখার পরামর্শ আছে।
সময় ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। ৩০০ নম্বরের জন্য সাধারণত ৩ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়—অর্থাৎ প্রতি ১ নম্বরের জন্য সময় পাবে ৩৬ সেকেন্ড। বড় প্রশ্নের পেছনে বেশি সময় নষ্ট না করে আগে সহজ ও ছোট প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন ভালোভাবে পড়ার বিষয়েও সতর্ক করে বলা হয়েছে। বিশেষ করে প্রশ্নের শেষে ‘নয়’ বা ‘কোনটি অসত্য’ লেখা থাকলে তাড়াহুড়ায় তা খেয়াল না করে উত্তর ভুল হয়ে যেতে পারে। প্রশ্ন অন্তত দুবার মনোযোগ দিয়ে পড়ে উত্তর লেখা শুরু করার কথা বলা হয়েছে। নেগেটিভ মার্কিং থাকলে নিশ্চিত না হয়ে আন্দাজে কোনো উত্তর দাগানো বা লেখার ক্ষেত্রে সতর্কতার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
আত্মবিশ্বাস ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষার হলে নার্ভাস না হয়ে কঠিন প্রশ্ন দেখলে ঘাবড়ে না গিয়ে শান্ত মাথায় চিন্তা করার কথা বলা হয়। মনে রাখতে হবে, প্রশ্ন কঠিন হলে তা সবার জন্যই কঠিন।
মানসিক প্রস্তুতি ও অভিভাবকদের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য কেবল মেধাবী হওয়াই যথেষ্ট নয়—শিক্ষার্থীকে মানসিকভাবে দৃঢ় ও শারীরিকভাবে ফিট হতে হবে। পরীক্ষার আগে রাত জেগে পড়ালেখা করে শরীর খারাপ করার মতো কাজ না করে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার এবং পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অভিভাবকদের ক্ষেত্রেও করণীয় হিসেবে বলা হয়েছে—সন্তানকে অতিরিক্ত মানসিক চাপে রাখা যাবে না। ‘তোমাকে চান্স পেতেই হবে’—এমন চাপ দিলে শিশু পরীক্ষার হলে জানা জিনিসও ভুল করে আসতে পারে। তাই শিশুকে উৎসাহিত করা এবং তার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করার কথা বলা হয়েছে।
সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম, নিয়মিত অনুশীলন ও নিজের ওপর অবিচল আত্মবিশ্বাস থাকলে এই লিখিত পরীক্ষায় শীর্ষ স্থান অর্জন করা অসম্ভব কিছু নয়—এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করা হয়েছে। প্রতিদিনের ছোট ছোট প্রস্তুতিই পরীক্ষার দিনে একটি বড় সাফল্যে রূপ নিতে পারে বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষক।
ইকবাল খান, প্রভাষক
বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ, ঢাকা