মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। মাইক্রোসফট থেকে অবসর নেওয়ার পর গেটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরেন তিনি। সম্প্রতি লিংকডইনে ২০২৬ সালে তাঁর পড়া পছন্দের বই, অডিও বুক আর টিভি শোর কথা জানিয়েছেন বিল গেটস। পাঠকদের জন্য লেখাটি প্রকাশ করা হলো।
সিয়াটলে গ্রীষ্মকাল কাটানো বেশ কঠিন। এখানে দিন বেশ দীর্ঘ, রোদঝলমলে আর উষ্ণ হয়। সামুদ্রিক এলাকা পুগেট সাউন্ড বা কোনো হ্রদ এখান থেকে খুব বেশি দূরে নয়। এই ঋতুর পরিবেশটাই তাঁকে ভালো বই বা শো নিয়ে সময় কাটাতে উৎসাহিত করে—যদিও তিনি বলেন, বছরের অন্য যেকোনো ঋতুতেও তিনি ঠিক এমনটাই অনুভব করেন।
এই তালিকা তৈরির শুরুতেই তিনি ভাবেন, কোনো কিছু কীভাবে গ্রীষ্মের সেরা হয়ে ওঠে। তাঁর কাছে এর মানে এমন বই বা শো, যা তাঁকে টেনে রাখে—এমনভাবে মনোযোগ কেড়ে নেয় যে ছায়ায় বসে বই হাতে নেওয়ার ইচ্ছে হয়, সূর্য ডুবে যাওয়া পর্যন্ত মাথা তুলে অন্যদিকে না তাকানোর মতো।
এ বছরের তালিকায় তিনি ইদানীং যে জিনিসগুলো উপভোগ করেছেন, সেগুলোর মিশ্রণ আছে। সেখানে একটি চমৎকার উপন্যাসের পাশাপাশি বিশ্বকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করবে এমন দুটি নন-ফিকশন বই রয়েছে। পাশাপাশি এমন একটি টিভি শোও রয়েছে, যেটি দেখা থামানো তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছিল। তিনি আশা করেন, পাঠকেরাও এই লেখায় এমন কিছু খুঁজে পাবেন, যা তাঁদের মনোযোগ কেড়ে নেবে—ঠিক যেমন এগুলো তাঁর ক্ষেত্রে করেছিল।
তাঁর পছন্দের তালিকায় একটি উপন্যাসও আছে—যেখানে একটি পরিবার স্বয়ংক্রিয় গাড়িতে চেপে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় তারা এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয়। অন্য গাড়ির একজন ব্যক্তি এতে মারা যান। এর পর বড় প্রশ্ন উঠে আসে—ড্রাইভার কি দায়ী, গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান দায়ী, নাকি স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং সফটওয়য়্যারটি তৈরি করেছিল, সেই কোম্পানি দায়ী। তাঁর মতে, এই ধরনের বড় প্রশ্ন নিয়ে লেখা উপন্যাস ভারী বা বিরক্তিকরও হতে পারত। তবে হোলসিঙ্গার কাহিনির গতি থামতে দেননি। প্লটটি পরবর্তী সময়ে কোন দিকে মোড় নেবে, তা আপনি একেবারেই বুঝতে পারবেন না।
বইয়ের তালিকায় তিনি আরও একটি বইয়ের কথা বলেন। তাঁর মতে, টু বিগ টু ফেইল নামের একটি বই বেশ অসাধারণ ছিল। লেখক রস সরকিনের নতুন আরেকটি বই আগের বইটির মতোই অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ গবেষণার ফসল। তিনি বলেন, ১৯২৯ সালের শেয়ারবাজারে ধস নামার পেছনের কারণ অত্যন্ত জটিল ছিল—এবং বইটিতে জড়িত বিভিন্ন চরিত্রকে বুঝতে সত্যিই সাহায্য করা হয়েছে। তবে মূল ব্যক্তিদের নাম মনে রাখতে তাঁকে সেগুলো কাগজে লিখে রাখতে হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, আজকের ব্যাংকিং ব্যবস্থা অনেকটাই স্থিতিস্থাপক ও শক্তিশালী হলেও আগের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করতে অতীতে কী ভুল হয়েছিল, তা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, জুয়া ও বিনিয়োগের মধ্যবর্তী সীমাটি আমরা যতটা ভাবি, ততটা সুস্পষ্ট নয়। মিম স্টক, প্রেডিকশন মার্কেট এবং বিশেষ করে মার্জিন ইনভেস্টিংয়ের মতো আর্থিক প্রবণতাগুলো—তিনি ব্যাখ্যা করেন—স্পষ্ট করে দেয়, অতীত থেকে আমাদের এখনো অনেক কিছু শেখার রয়েছে।
সম্প্রতি তিনি অডিও বুকের একজন বিশাল ভক্ত হয়ে ওঠার কথাও জানান। তাঁর মতে, একা একা ছাপানো বই নিয়ে বসে পড়ার অভিজ্ঞতাও তিনি উপভোগ করেন, তবে অডিও বুক শোনা ও পড়ার অভিজ্ঞতাকে একটি যৌথ অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করা যায়। তিনি জানান, তাঁর বান্ধবী পালা ও তিনি প্রায়ই ধাঁধা মেলানোর সময় অডিও বই শুনে থাকেন। গ্রে ম্যাটার্স ইদানীং তাঁর শোনা সেরা অডিও বুকগুলোর একটি। শরৎজ মস্তিষ্কের রোগ এবং একজন নিউরোসার্জনের জীবন কেমন হয়—এ বিষয়ে ব্যাখ্যার কাজটি ভালোভাবে করেছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে এখনো অনেক কিছু অজানা—তাঁর বক্তব্যে আসে—তবে সেই পরিস্থিতির অবশেষে পরিবর্তন ঘটছে। তিনি আরও বলেন, এই ক্ষেত্রের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পেরে তিনি বেশ উপভোগ করেছেন। অডিও বুক বর্ণনাকারীদের বিষয়ে তিনি কিছুটা খুঁতখুঁতে হতে পারেন, কারণ সাধারণত তিনি অন্তত ১ দশমিক ৫ গুণ গতিতে শোনেন। তবে এই ক্ষেত্রে শন প্র্যাটের বর্ণনা অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও সহজে বোঝার মতো ছিল বলে তিনি জানান।
টিভির ক্ষেত্রে তাঁর পছন্দের তালিকায় ‘দ্য পিট’ শোটি আছে। তিনি বলেন, তিনি কেবল সিজন ২ দেখা শেষ করেছেন। শোটি একেবারে দুর্দান্ত হলেও কিছু মানুষের কাছে এটি অত্যন্ত তীব্র বা বিভৎস মনে হতে পারে—তাঁর বোঝার কথাও উঠে আসে। পিটসবার্গের একটি জরুরি চিকিৎসাকক্ষের মাত্র ১৫ ঘণ্টার একটি একক শিফটের ওপর ভিত্তি করে গল্পটি তৈরি হয়েছে বলেও তিনি জানান। একের পর এক অসম্ভব কঠিন কেস সামলে এগিয়ে যাওয়া ডাক্তার, রেসিডেন্ট ও নার্সদের এটি অনুসরণ করে।
তিনি জানান, গেটস ফাউন্ডেশনের কাজের সুবাদে চিকিৎসার বহু বিষয় ধারণার চেয়ে বেশি বুঝতে পেরেছেন। তবে তাঁর মেয়ে জেনের সঙ্গে এটি দেখা বিশেষভাবে পুরস্কৃত হওয়ার মতো অভিজ্ঞতা ছিল। জেন শিশুবিভাগে কাজ করে—এবং তিনি কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয়গুলোকে সমর্থন করেননি, ইআরয়ের মানবীয় গতিশীলতাগুলোকেও নিশ্চিত করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তাঁর ভাষায়, একটি কেয়ার টিম নিখুঁতভাবে কাজে নেমে পড়ার আনন্দ যেমন ছিল, তেমনি সিস্টেম, আমলাতন্ত্র কিংবা রোগীর নিজস্ব সিদ্ধান্তের কারণে আসা হতাশাও ফুটে উঠেছে। তিনি মনে করেন, এমন আর কোনো পেশা নেই যেখানে মানুষকে সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় প্রতিনিয়ত দেখতে হয়। তিনি বলেন, এই কাজের মধ্যে একধরনের অ্যাড্রেনালিন রাশ রয়েছে, যা মানুষকে বারবার টেনে আনে—এমনকি তারা নিজেরাই যখন ভাবে, কেন তারা এই পেশা বেছে নিয়েছিল।
ভাষান্তর: জাহিদ হোসাইন খান
সূত্র: লিংকডইন