বিজেপি শিবিরের একাংশের দাবি, দলের সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন নাকি চেয়েছিলেন ভোটের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে একবার বাঁকিপুরে নিয়ে যেতে। তবে প্রধানমন্ত্রী রাজি হননি।

সাধারণভাবে প্রধানমন্ত্রী কোনো উপনির্বাচনে প্রচারে যান না। যেতে হয়ও না—এমনটাই ধরা হয়। ক্ষমতাসীন দল সাধারণত উপনির্বাচনে জয় পায়। তার ওপর বিহার বিধানসভার বাঁকিপুর এমন একটি আসন, যেখানে ৪০ বছর ধরে বিজেপি হারেনি। লোকসভা সদস্য রবিশঙ্কর প্রসাদ ভোটের তিন সপ্তাহ আগে বলেছিলেন, বাঁকিপুরে বিজেপি কুকুর–বিড়ালকে দাঁড় করালেও নাকি জিতে যাবে।

ওই বক্তব্যে দাম্ভিকতার ছাপ থাকলেও প্রকাশ্যভাবে কারও বড় আপত্তি দেখা যায়নি। এই আসনে বিজেপি কখনো ৫৪ শতাংশের কম ভোট পায়নি। সবচেয়ে বেশি ভোটে জেতার হার ছিল ৮২ শতাংশ। ফলে নিতিন নবীন যে আসন ছেড়ে রাজ্যসভায় গেলেন, সেখানে বিজেপি ড্যাং ড্যাং করে জিতবে—এ বিষয়ে কারও বড় সংশয় ছিল না।

তবে নিতিন নবীন প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে আগ্রহী হলেন কেন—এটাই মোদিকে ভাবিয়েছে। বিজেপির এক সূত্রের কথায়, জন সুরাজ পার্টির হয়ে প্রশান্ত কিশোর বিরোধী প্রার্থী হলেও তখনো কিন্তু ২০ জুলাইয়ের যন্তর মন্তর হয়নি। বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতির ওই আবদার নাকি মোদিকে বুঝিয়েছিল, বাঁকিপুরে সবকিছু হয়তো ঠিকঠাক নেই। কিন্তু বিজেপি হেরে যাবে—এমনটা মোদি ভাবেননি।

মোদি এমন ভাবার কারণও ছিল না। মাত্র আট মাস আগে বিজেপি–জেডিইউয়ের এনডিএ জোট বিহারে ক্ষমতায় আসে। ২৪৩ আসনের মধ্যে বিজেপি একাই জিতেছিল ৮৯ আসন। জোটের আসন ছিল ২০০ পার। চার মাস আগে নীতীশ কুমারকে সরিয়ে মুখ্যমন্ত্রিত্ব আদায় করেছে বিজেপি—প্রথমবারের মতো।

এই সময়ের মধ্যে পরিবর্তনের ক্ষেত্র হিসেবে দুটি বিষয়কে ধরা হচ্ছে—এক, প্রশান্ত কিশোরের প্রার্থী হওয়া; দুই, দিল্লিতে আরশোলা আন্দোলনে পুলিশি অত্যাচার এবং তার ঢেউ বিহারে আছড়ে পড়া। এসব সত্ত্বেও বিজেপি মনে করেছিল, বিরোধী ভোটে ভাগ বসাবে আরজেডি প্রার্থী রেখা কুমারীও। ফলে বিজেপির নীরজ কুমার সিনহা জয়কে অনেকেই সময়ের প্রতীক্ষা হিসেবেই দেখেছেন।

তবে কথায় আছে, পচা শামুকেও পা কাটে। বাঁকিপুর বিধানসভা আসনে বিজেপির পা–কাটা শামুক যদিও পচা নয়, রীতিমতো টাটকা বলে বলা হচ্ছে। একটি নয়, দুটি—প্রশান্ত কিশোর ও জেন–জি। বিজেপি তাই রক্তাক্ত হয়েছে। আট মাস আগে যে আসন নিতিন নবীন জিতেছিলেন ৫২ হাজার ভোটের ব্যবধানে, প্রশান্ত কিশোর তা জিতলেন ১৯ হাজার ৩২৪ ভোটে।

এ হিসাব অনুযায়ী, আট মাসের মধ্যে ৭২ হাজার ভোট বাড়তি পেয়েছেন সেই ব্যক্তি, যাঁর দল জন সুরাজ পার্টি বিধানসভা ভোটে সব আসনে প্রার্থী দিয়ে একটিতেও জেতেনি; প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল সাড়ে ৩ শতাংশেরও কম। প্রশান্ত কিশোর এবার পেয়েছেন প্রায় ৫০ শতাংশ ভোট, বিজেপি ৩৪ শতাংশ।

বিজেপি মনে করছে জাতপাতের নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে—উচ্চবর্ণের মুখ ফেরানো হচ্ছে। তবে এই ব্যাখ্যাকে অতি সরলীকৃত বলেও মনে করা হচ্ছে। কারণ, শুধু বাঁকিপুর নয়—বিশ্লেষণে আনতে হবে গুজরাটের মঞ্জলপুরকেও, যে আসনটি এবার বিজেপির মুখ ও মান রক্ষা করেছে। পাশাপাশি নিতিন নবীন যে কেন্দ্রের ভোটারদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন, সেই বিষয়টিও বিবেচনায় আনা দরকার বলে বলা হচ্ছে। দাতিয়া আসনকেও ধরা হচ্ছে, যেখানে দলীয় কোন্দলে দীর্ণ কংগ্রেস জয় পেয়েছে।

মঞ্জলপুরে বিজেপি প্রার্থী সতীশ প্যাটেলের বিপক্ষে ছিলেন কংগ্রেসের ভিখাভাই রাবারি। সতীশ জিতেছেন ৩০ হাজার ভোটের ব্যবধানে। নরেন্দ্র মোদির খাসতালুক গুজরাটের এই আসনটি বিজেপি আগের ভোটে জিতেছিল ১ লাখ ২ হাজার ভোটের ব্যবধানে। আড়াই দশক ধরে মোদি–শাহর গুজরাটে কংগ্রেসের হাল কেমন তা বিধানসভায় জেতা আসনের সংখ্যা, এমনকি জয়ের ব্যবধানও বলে দিচ্ছে—এমন পর্যবেক্ষণও এসেছে।

বিধানসভা আসনে লক্ষাধিক ভোটে জেতা চাট্টিখানি কথা নয়। মঞ্জলপুরে সেটাই ঘটেছে। অথচ এবার সেখানে বিজেপি ৭২ হাজার ভোট কম পেয়েছে। অন্যভাবে বলা হচ্ছে—কংগ্রেস প্রার্থী জয়ের ব্যবধান কমিয়ে দিয়েছেন ৭২ হাজার। তা কীভাবে সম্ভব হলো—এই প্রশ্ন উঠছে। বিহারের মতো গুজরাট তো সেভাবে জাতভিত্তিক নয়।

একইভাবে মধ্যপ্রদেশের দাতিয়াকে নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আসনটি কংগ্রেসের দখলে থাকলেও সব রাজ্যের মতো মধ্যপ্রদেশেরও প্রার্থী বাছাই নিয়ে কংগ্রেসে দেখা দিয়েছিল বিরাট অসন্তোষ। আগের ভোটে কংগ্রেসের জয়ী প্রার্থী সদস্যপদ হারান দুর্নীতি মামলায় তিন বছরের সাজা পাওয়ায়। দলবিরোধী কাজের জন্য কংগ্রেস তাঁকে ভোট গণনার আগের দিন সাময়িক বহিষ্কারও করে।

টিকিট পাওয়া ঘনশ্যাম সিংকে মোকাবিলা করতে হয় দলের বিক্ষুব্ধদেরও। তবুও তিনি ৬ হাজার ভোটে জিতে যান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে—বিজেপির সাবেক প্রার্থী নরোত্তম মিশ্রর বিদ্রোহ এবং জেন–জি সমর্থন।

যন্তর মন্তরে পুলিশি অত্যাচারের ঠিক ১০ দিনের মাথায় ছিল তিন রাজ্যের তিন বিধানসভা আসনের উপনির্বাচন। তেলাপোকা আন্দোলনের রেশ ছিল তীব্র। রাজ্যে রাজ্যে জেন–জি শিক্ষার্থী সমাজের কণ্ঠে বিজেপি–বিরোধী স্লোগানও উচ্চকিত ছিল বলে বলা হচ্ছে।

ভয়কে জয় করে তারা মোদি–শাহর বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা আদায় করে অমিত শাহকে টার্গেট করেছে বলে দাবি উঠেছে। সরাসরি দাবি জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমা চাইতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোদি–নীতির সমালোচনাও করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বেকারত্ব, প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতি, আর্থিক হাহাকারের প্রসঙ্গ টেনে মোদি সরকারকে কাঠগড়ায় তুলেছে বলেও বলা হয়েছে।

রাজনৈতিক দলের শরিক না হয়েও ভোট রাজনীতিতে বিজেপি বিরোধিতার জন্য জেন–জিরা বেছে নিয়েছে সেই প্রার্থীদের, যারা বিজেপিকে হারানোর ক্ষমতা রাখে। এই তিন উপনির্বাচনে অন্যান্য সমীকরণের পাশাপাশি তাদের ‘ফোর্স মাল্টিপ্লায়ারের’ ভূমিকা পালনের কথা বলা হচ্ছে। সেই যুক্তিতে বলা হচ্ছে—নইলে বাঁকিপুরে ৫২ হাজারের ঘাটতি পুষিয়ে প্রশান্ত কিশোর ২০ হাজার ভোটে বিজেপিকে হারাতে পারতেন না।

একই দৃষ্টিতে বলা হচ্ছে—বিজেপি–শাসিত মধ্যপ্রদেশের দাতিয়ায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মোকাবিলা করে কংগ্রেসের ঘনশ্যাম সিং ৬ হাজার ভোটে জিততে পারতেন না। মোদি–রাজ্য গুজরাটের মঞ্জলপুরে বিজেপির ৭২ হাজার ভোট কমতেও পারতো না বলে মন্তব্য করা হয়েছে।

তেলাপোকাদের সমর্থন এই উপনির্বাচনে বিজেপি পায়নি—এ কথা অস্বীকারের কোনো উপায় মোদি–শাহর নেই বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁরা তা বুঝেছেন বলেই জেন–জির মন জিততে মাঝরাতে মোদি ইনস্টাগ্রামে বার্তা পাঠাচ্ছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আরএসএস সংঘচালক মোহন ভাগবত জেন–জিকে বুঝতে সচেষ্ট হচ্ছেন বলেও বলা হচ্ছে।

এদিকে আরেকটি বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। দাতিয়ায় টিকিট না পেয়ে নরোত্তম মিশ্র প্রকাশ্যে যে বিদ্রোহ করেছেন, মোদি–শাহর বিজেপিতে ১২ বছর তা দেখা যায়নি বলেও উল্লেখ আছে। ভোটের আগে মিটমাটে রাজি হলেও দলীয় প্রার্থীর পরাজয়ে নরোত্তমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

এ ধরনের সাহস মধ্যপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী শিবনাথ সিং চৌহান দেখাতে পারেননি, রাজস্থানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়া দেখাতে পারেননি, হরিয়ানার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মনোহরলাল খাট্টারও দেখাতে পারেননি—এমন উল্লেখ রয়েছে।

তেলাপোকারা নড়েচড়ে বসার পর নরোত্তম মিশ্রর বাগী হওয়া কি তাহলে সংগঠনে মোদি–শাহর মুঠো আলগা হওয়ার লক্ষণ—এ প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

জেন–জির চাপ ও বিরোধীদের দাবির মুখে অমিত শাহ সংসদমুখো হচ্ছেন না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এনডিএ শরিকেরাও বিরোধীদের সমালোচনায় সেভাবে মুখর হচ্ছে না বলে বলা হচ্ছে। বিরোধীরা জোর গলায় দাবি জানাতে শুরু করেছে—এই উপনির্বাচন থেকেই বিজেপির শেষের শুরুর ঘণ্টা বেজে গেছে।

শেষ প্রশ্ন হিসেবে বলা হচ্ছে—তেলাপোকারা জাগরণ ও বিরোধীদের গা–ঝাড়া মোদি–শাসনের ‘পলিটিক্যাল ফ্যাটিগ’ বা একঘেয়েমি রাজনৈতিক ন্যারেটিভের ক্লান্তি কাটাতে পারবে কি না। নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহর চ্যালেঞ্জও এটাই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ১২টা বছর কম সময় তো নয় বলে যুক্তিও এসেছে।