ফরিদপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে মধুখালীর ছাত্রলীগ কর্মী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তের মৃত্যুর ঘটনায় তৎকালীন ওসিসহ ১১ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। জেলা পুলিশের গঠিত তিন সদস্যের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই সুপারিশ সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
ফরিদপুরের পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজী বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, তদন্তে অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও চরম দায়িত্ব অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সে কারণে বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে প্রত্যেকের দায় নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
গত ২০ জুন বিকেলে মধুখালী পৌরসভার পশ্চিম গোন্ধারদিয়া এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে থেকে ইশতিয়াককে আটক করে জেলা ডিবি। হেফাজতে থাকাকালীন অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং ২১ জুন সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। নিহত ইশতিয়াক ফরিদপুর আইন কলেজের শিক্ষার্থী এবং ফরিদপুর চিনিকলের মৌসুমি শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
মৃত্যুর পরদিন ডিবির এসআই আহাদুজ্জামান বাদী হয়ে ইশতিয়াককে আসামি করে মধুখালী থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেন। পুলিশ দাবি করে, গভীর রাতে অভিযানের সময় ইশতিয়াক পালানোর চেষ্টা করেন এবং তার পকেট থেকে ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, অভিযানটি গভীর রাতে নয় বরং দিনের বেলা পরিচালিত হয়েছে এবং ইশতিয়াকের পরনে প্যান্টের বদলে লুঙ্গি ছিল। ভিডিওতে ডিবি সদস্যদের তাকে মারধর ও জোরপূর্বক তল্লাশি করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে এক সদস্য দূরে থাকা একটি বস্তু দেখিয়ে ‘এই যে এক টোপলা’ বলে চিৎকার করেন।
মাদক উদ্ধারের মামলায় সাক্ষী হিসেবে থাকা মো. আলমগীর হোসেন ও বিনয় সাহা পরবর্তীতে তদন্ত কমিটি ও গণমাধ্যমকে জানান, ঘটনার সময় তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন না; বরং প্রায় ১০০ মিটার দূরে থাকা অবস্থায় ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল।
নিহত ইশতিয়াকের মা খাদিজা আক্তার অভিযোগ করেন, ছেলেকে ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে প্রথমে ৬৫ হাজার এবং পরে আরও এক লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল। তিনি তদন্ত কমিটির কাছেও লিখিত অভিযোগ জানান যে, টাকা নিয়ে ফরিদপুরে গেলেও জীবিত ছেলের পরিবর্তে তাকে সন্তানের মরদেহ গ্রহণ করতে হয়েছে।
ঘটনার পর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ফাতেমা ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য দুই সদস্য ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. শামসুল আজম এবং জেলা স্পেশাল ব্রাঞ্চের ওসি মোশাররফ হোসেন।
পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজী জানান, অভিযানে অংশ নেওয়া প্রত্যেক সদস্য কোনো না কোনোভাবে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। কার দায় কতটুকু, তা বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তিনি তদন্ত প্রতিবেদনের নির্দিষ্ট অসংগতি, যেমন—অভিযান পরিচালনার সময়, মাদক উদ্ধারের দাবি, ভুয়া সাক্ষী কিংবা অর্থ দাবির অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ঘটনার সময় ফরিদপুর ডিবির ওসির দায়িত্বে ছিলেন মো. আলমগীর হোসেন। অভিযানে অংশ নেওয়া অন্য সদস্যরা হলেন এসআই আহাদুজ্জামান, মোতাহার আলী, এএসআই হাজিকুল ইসলাম, কনস্টেবল আবু সুফিয়ান, রাকিব মোল্লা, মনিরুজ্জামান, রাকিবুল ইসলাম, ফরহাদ হোসেন মিয়া, চম্পা হালদার ও গাড়িচালক সবুজ মোল্লা। এই ঘটনার পর ওসিসহ সংশ্লিষ্ট ১১ পুলিশ সদস্যকেই ফরিদপুর পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত (ক্লোজড) করা হয়।