রংপুরের মিঠাপুকুরে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের ফুটপাত দখল করে মার্কেট নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. পারভেজের বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

সোমবার (৩ আগস্ট) দুপুরে মিঠাপুকুর উপজেলা পরিষদ চত্বরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলা পরিষদের প্রধান ফটকসংলগ্ন এলাকায় মহাসড়কের পাশ ঘেঁষে ২৬টি আধাপাকা দোকানঘর নির্মাণের কাজ চলছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কোনো প্রকল্প কমিটি বা টেন্ডার ছাড়াই এক সপ্তাহ ধরে ইউএনও মো. পারভেজের নেতৃত্বে উপজেলা পরিষদের প্রাচীরসংলগ্ন ফুটপাত এলাকায় চারটি আমগাছ কেটে দোকানঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। ইউএনও মৌখিকভাবে একটি নির্মাণ কমিটির কথা দাবি করলেও সে বিষয়ে কোনো প্রজ্ঞাপন দেখাতে পারেননি। অন্যদিকে, নির্মাণ কমিটির সভাপতি হিসেবে জনস্বাস্থ্যের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আজিজুল ইসলামের নাম উল্লেখ করা হলেও, তিনি এই মার্কেট সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ২০১৯ সালে মহাসড়ক সম্প্রসারণের সময় উপজেলা পরিষদের ‘শাপলা মার্কেট’ ভেঙে দেওয়া হলে ৩১ জন ব্যবসায়ী উচ্ছেদ হন। দীর্ঘ সময় ধরে তাদের কোনো ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসন করা হয়নি। এখন সরকারি খাসজমি এড়িয়ে রাস্তার জমিতে ঝুঁকি বাড়িয়ে অপরিকল্পিতভাবে দোকান নির্মাণ করা হচ্ছে বলে তারা দাবি করেন।

উচ্ছেদ হওয়া শাপলা মার্কেটের ব্যবসায়ী ওয়াজেদ আলী বলেন, "মহাসড়ক সম্প্রসারণের সময় আমাদের মার্কেট উচ্ছেদ করা হয়েছিল। দীর্ঘ সাত বছরেও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হয়নি। এখন যে জায়গায় দোকানঘর নির্মাণ করা হচ্ছে, সেটি মহাসড়কের পাশের ফুটপাতঘেঁষা এলাকা। এতে পথচারীদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটবে এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হবে।"

আরেক ব্যবসায়ী শহিদুল অভিযোগ করেন, সিএনবি রোডের কাছে মার্কেট নির্মাণ করা হচ্ছে এবং বর্তমান দোকানদারদের কাছে ইউএনও তিন লাখ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা চেয়েছেন। তবে এই অভিযোগের সপক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি।

প্রকল্পের সভাপতি হিসেবে পরিচয় দেওয়া উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আজিজুল ইসলাম জানান, "আমি প্রকল্পের সভাপতি হিসেবে দায়িত্বে আছি। কাজ চলছে।" তবে প্রকল্পের ব্যয়, অনুমোদন বা কমিটির পূর্ণাঙ্গ তথ্যের বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কিছু বলতে পারেননি।

এই বিষয়ে রংপুর সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "যে কোনো সড়কের জায়গা দখল করা অন্যায়। সড়কের জায়গা দখল হলে আমরা ডিসি বা ইউএনওকে নোটিশ দেই উচ্ছেদের জন্য। যদি ইউএনও নিজেই দখল করে আমি কাকে নোটিশ দিবো। আমরা তো ওদের নিয়েই কাজ করি।"

রাস্তার জায়গায় আইন অনুযায়ী মার্কেট নির্মাণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "সাধারণত রাস্তার পাশে জায়গায় কাউকে বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ নেই। সড়কের জমি বরাদ্দ দিতে হলে আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।"

অভিযোগের বিষয়ে প্রথমে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে না চাইলেও পরবর্তীতে ক্ষোভ প্রকাশ করে মিঠাপুকুর ইউএনও মো. পারভেজ বলেন, "ফুটপাত দখল করে কোনো মার্কেট করা হচ্ছে না। সাসেক নির্মিত ফুটপাত ছেড়ে হলরুমের খালি জায়গায় দোকানগুলো করা হচ্ছে। সৌন্দর্যবর্ধনের স্বার্থে এসব অস্থায়ী টিনের চালা ও ইটের দেওয়াল দেওয়া হচ্ছে, স্থায়ী কোনো অবকাঠামো নয়।"

দোকান বরাদ্দের জন্য তিন থেকে চার লাখ টাকা দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, "টাকা নেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়নি, তবে কমিটি প্রস্তাব করেছে। নির্মাণকাজে প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হবে, সেই তুলনায় এক লাখ টাকা নেওয়া কি বেশি হবে। এই টাকা আগের ‘শাপলা মার্কেট’ ব্যবসায়ীদের যৌথ তহবিলেই জমা থাকবে।"

মার্কেট নির্মাণের বৈধতা ও কমিটির গঠন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, এটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয় বরং উন্মুক্ত সভায় সিদ্ধান্ত নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কর্মকর্তা, বিএডিসি কর্মকর্তা এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যকে নিয়ে গঠিত কমিটির প্রজ্ঞাপন এখনো জারি হয়নি বলে তিনি স্বীকার করেন।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের জমিতে অবকাঠামো নির্মাণ বেআইনি—এমন প্রশ্নে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি বলেন, "সড়কের জায়গায় থাকা শত শত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করে আমাদের কাজ বন্ধ রাখা ঠিক নয়। এখানে সাধারণ কিছু মানুষ কাজ করে খাবে, বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কিছু নেই।"