যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনা শুরু হওয়ার দাবি জানিয়ে হামলা স্থগিতের ঘোষণা দিলেও তা সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা চলছে না এবং বৈঠকের কোনো পরিকল্পনাও নেই।

গত কয়েক মাস ধরে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলার হুমকি দিয়ে শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করার প্রবণতা দেখা গেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে। সপ্তাহান্তেও একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটে। স্থানীয় সময় রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বহনকারী বিমান ‘এয়ারফোর্স ওয়ানে’ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি কি সমঝোতা করতে চাই? অবশ্যই। আমি মানুষ হত্যা করতে চাই না।’

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘এখন আমরা আলোচনার মাধ্যমে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। আগামীকাল বিকেলে আলোচনা শুরু হবে।’ তবে এই আলোচনা কোথায় অনুষ্ঠিত হবে কিংবা কারা এতে অংশ নেবেন, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি তিনি।

ট্রাম্পের এই দাবির বিপরীতে সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই স্পষ্ট করে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বর্তমানে কোনো আলোচনা হচ্ছে না এবং বৈঠকের কোনো সময়সূচিও নির্ধারিত হয়নি। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ইরানে কোনো বিদেশি প্রতিনিধিদল আসা কিংবা তেহরানের কোনো আলোচক দলকে বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা নেই।

বাঘাই আরও জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ধর্মসংশ্লিষ্ট এক সফরে ইরাকে থাকলেও অন্য সব আলোচক বর্তমানে ইরানেই অবস্থান করছেন। তবে বর্তমানে শুধুমাত্র হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের জ্যেষ্ঠ এক সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনার সূচি এখনো নির্ধারিত হয়নি এবং চলতি সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত আরাগচির কোনো আলোচনায় অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নেই।

বিশ্লেষকদের মতে, গত পাঁচ মাস ধরে একটি নির্দিষ্ট ধারা চলে আসছে। ইসরায়েলের সঙ্গে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর পর থেকে ট্রাম্প কয়েক দফায় সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন এবং পরবর্তীতে কূটনৈতিক যোগাযোগের কথা বলে সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। অন্যদিকে, গত জুনে সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক জুলাইয়ের শুরুতে ভেঙে যাওয়ার পর থেকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা প্রকাশ্যে নাকচ করে আসছে ইরান।

যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্পের লক্ষ্য ছিল ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ভেঙে দেওয়া, আঞ্চলিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হামলার সক্ষমতা হ্রাস করা এবং দেশটির ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার পতনের পরিবেশ তৈরি করা। তবে এখন পর্যন্ত এর কোনোটিই পূরণ হয়নি। প্রতিবার যুক্তরাষ্ট্র চাপ বাড়ালে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনী, উপসাগরীয় আরব মিত্রদেশ এবং নৌপথকে লক্ষ্য করে পাল্টা চাপ সৃষ্টি করেছে, যার ফলে ট্রাম্প পিছু হটতে বাধ্য হয়েছেন।

বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের বিরোধের মূল কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা। ওয়াশিংটনের দাবি, জুনের সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী ইরানকে এই কৌশলগত নৌপথ খুলে দিতে হবে। বিপরীতে তেহরানের দাবি, সমঝোতা স্মারকে হরমুজে নৌযান চলাচলের ওপর ইরানের কর্তৃত্ব বহাল রাখার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

হরমুজ প্রণালির এক পাশে ইরান এবং অন্য পাশে ওমান থাকায় ইরান ওমানের সঙ্গে মিলে প্রণালি ব্যবস্থাপনার নতুন নিয়ম তৈরি করতে চাইছে। বিশ্লেষকদের মতে, এমনটি হলে তা ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হবে। নানা চাপ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে পারেনি, যার প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের ওপর।

এদিকে হরমুজ প্রণালির সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, একটি জাহাজের ক্যাপ্টেন জাহাজের কাছে পানিতে বিস্ফোরণের খবর দিয়েছেন, তবে এতে কেউ হতাহত হননি।