মহেশখালীর পুটিবিলা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আমির হোসাইন দীর্ঘ তিন বছর প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থেকেও অবৈধভাবে বেতন উত্তোলন ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে প্রায় ৯৫ লাখ ৩৯ হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

তদন্তে জানা গেছে, আমির হোসাইন গত ১৬ বছর ধরে অবৈধভাবে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদে আসীন ছিলেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদের অনুরোধ এবং শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) একটি বিশেষ তদন্ত পরিচালনা করে। গত ২০ জুলাই কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নিয়োগ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তদন্ত কমিটি টাকা ফেরতের পাশাপাশি তার এমপিও বাতিলের সুপারিশ করেছে।

তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোহাম্মদ আমির হোসাইন ২০০৪ সালের ২০ মার্চ ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগপত্র জমা দেন এবং ২৩ আগস্ট গভর্নিং বডির সভায় তা গৃহীত হয়। কিন্তু ২০১০ সালে কোনো বৈধ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই তিনি পুনরায় অধ্যক্ষ পদে যোগ দেন। ফলে ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত কোনো বৈধ ভিত্তি ছাড়াই তিনি মোট ৭৮ লাখ ১২ হাজার ৭৫ টাকা বেতন-ভাতা বাবদ অবৈধভাবে গ্রহণ করেছেন।

তদন্তে আরও দেখা গেছে, ২০২৩ সালের ৯ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি বিনা অনুমতিতে একটানা কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। এমনকি স্থানীয় উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উপস্থিতির নির্দেশ থাকলেও তিনি তা মানেননি। এই অনুপস্থিতিকালীন সময়ে তিনি আরও ১৭ লাখ ২৭ হাজার ২০০ টাকা অবৈধভাবে উত্তোলন করেছেন, যা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ডিআইএ।

মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ মুহাম্মদ কুতুব উদ্দিন তদন্ত কর্মকর্তাদের জানান, “ক্যাশ বই, ভাউচার, ভর্তি রেজিস্টার ও ব্যাংক হিসাব বিবরণীসহ যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডপত্র তিন বছর ধরে অধ্যক্ষ কক্সবাজার শহরে তার নিজের বাসায় রেখে দিয়েছেন।” প্রতিষ্ঠানের কোনো রেকর্ডপত্র মাদ্রাসায় না থাকায় তদন্তকারী দল আর্থিক অবস্থা যাচাই করতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হয়।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে, ২০১৬ সালে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবের জন্য বরাদ্দকৃত ১৭টি কম্পিউটারের মধ্যে মাত্র ৯টি অবশিষ্ট আছে এবং সেগুলোরও অনেক যন্ত্রাংশ নিখোঁজ। এছাড়া কক্সবাজার জেলা পরিষদসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অনুদান ও উন্নয়ন বরাদ্দের টাকাও আত্মসাৎ করেছেন অধ্যক্ষ। উপাধ্যক্ষ জানান, এই অর্থ আত্মসাতের পেছনে অধ্যক্ষের একটি নিজস্ব সিন্ডিকেট রয়েছে।

তদন্তে আরও দেখা গেছে, মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষিকা জান্নাত আরা বেগমও অধ্যক্ষের ছত্রছায়ায় শিক্ষার্থীদের বেতন ও পরীক্ষার ফি আত্মসাৎ করেছেন। এ কারণে তার বেতন-ভাতা স্থগিতের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া বছরের পর বছর প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও অধ্যক্ষের অনুপস্থিতি রোধে ব্যর্থতার জন্য মাদ্রাসার বর্তমান গভর্নিং বডি বাতিল করে নতুন অ্যাডহক কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে তদন্ত কমিটি।

ডিআইএ জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটিতে বেসরকারি মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরির শর্ত বিধিমালা-১৯৭৯ ও জনবল কাঠামোর চরম লঙ্ঘন হয়েছে। প্রতিবেদনটি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে অর্থ ফেরত না দিলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আমির হোসাইনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে গত ২১ জুলাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, “দীর্ঘদিন আগে আদালত, জেলা প্রশাসন ও তৎকালীন গভর্নিং বডির সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া একটি ঘটনাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে তার বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হচ্ছে।”